আর কত বলা যায়?‌ মুখ্যমন্ত্রী শুরু থেকে বলছেন, সরকারি প্রচার চলছে, ডাক্তাররা বলছেন। তবু রোগটা সারছে না। ন্যূনতম সতর্কতা বিধি না–‌মানার রোগ। মাস্ক পরুন, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখুন, বাজারে ভিড় করবেন না, আড্ডা নয়, জটলা নয়, আর কত বলতে হবে?‌ বোঝা গেল, শুধু বলে হবে না। ‘‌সচেতন‌তা’‌ কথাটা যেন অচেনা কিছু লোকের।
এঁরা কিছু জানেন না, তা হতে পারে না। জানেন, এবং মানবেন না। চোখের সামনে দেখছেন, কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। দেখছেন, ডাক্তার–‌নার্স–‌স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও লড়ছেন। নানা স্তরের সরকারি অফিসার ও কর্মীরা লড়ছেন। পুরকর্মীরা, সর্বত্র সাফাইকর্মীরা প্রাণপাত পরিশ্রম করছেন, সাহস নিয়ে। তবু, না–‌মানা যেন চলছে চলবে। সচেতনতা চাই, বলা হচ্ছে। কিন্তু ‘‌মানব না’‌ বললে কী করা যায়?‌ ‘‌সচেতনতা’‌ ট্যাবলেটের মতো জল দিয়ে গিলিয়ে দেওয়া যায় না।
অমানবিকতার দৃষ্টান্তও যথেষ্ট। উদাহরণ, বনগঁা। আক্রান্তকে রেফার করা হয়েছে মহকুমা কোভিড হাসপাতালে। অ্যাম্বুল্যান্সে তুলতে হবে প্রবীণ মাধবনারায়ণ দত্তকে। অ্যাম্বুল্যান্স চালকের গায়ে পিপিই, তবু সাহায্য করলেন না। অদূরে জটলা, ‘‌হ্যা হ্যা’‌ আড্ডা। আবেদনে কেউ সাড়া দিলেন না। স্ত্রী চেষ্টা করলেন। মাধববাবু পড়ে গেলেন। মৃত্যু। ছবি তুলে যিনি ছড়ালেন, সেই মহাত্মা ‘‌কাজে’‌ ব্যস্ত, বঁাচানোর কথা ভাবলেন না।
ডাক্তাররা সমাজের সম্পদ। সঙ্কটকালে আরও বুঝছেন মানুষ। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা লড়ছেন। এর বাইরে, তথ্য, ৩৮ শতাংশ ডাক্তার ফোন বন্ধ করে বসে আছেন। ‘‌সামাজিক দায়িত্ব’‌ পালন করছেন!‌ এঁদের মধ্যে অনেকে প্রবীণ নন। কর্তব্যবোধ!‌ সচেতনতা!‌
পুলিশ কর্মীদেরও পরিবার আছে। স্ত্রী বা সন্তান হয়তো বলছেন, আজকেও বেরোতে হবে?‌ না গেলে হয় না?‌ না, এখনও পর্যন্ত কোনও স্তরের একজন পুলিশ কর্মীকেও দেখা যায়নি, দায়িত্ব এড়িয়ে ঘরে বসে থাকতে। ওঁদেরই সামলাতে হয় পুজোর ভিড়, অন্তত ৫ দিন বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ। স্ত্রী–‌সন্তানরা ওঁদের চান, একটা দিন বেরোতে, প্রতিমা–‌মণ্ডপ–‌আলো দেখতে, উপায় নেই। উৎসবে যেমন, বিপদেও তেমন, পুলিশের বিশ্রাম নেই। কত জায়গায় দেখছি, জীবনের পরোয়া না করে ওঁরা আক্রান্তকে পৌঁছে দিচ্ছেন হাসপাতালে। কন্টেনমেন্ট এলাকায় অনেক বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন সবজি, মাছ–‌ডিম, দুধ, ওষুধ। কোনও ডাক্তারকে বাড়িতে ঢুকতে না দিলে, ওঁরা যাচ্ছেন, প্রতিবেশীদের বুঝিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করছেন। পথে নেমে দেখতে হচ্ছে, যাতে মাস্ক ছাড়া কেউ না ঘুরে বেড়ায়, কেউ যত্রতত্র থুতু না ফেলে, বিপজ্জনক আড্ডা না চলে। বোঝানো?‌ সে তো প্রথম থেকেই আছে। কলকাতার নগরপাল অনুজ শর্মা নিজে, সহকর্মীরাও, আবেদন জানাচ্ছেন, মাস্ক পরুন। সার্বিক লকডাউনের দিনেও, অনেকে দোকান খুলছেন। ক্রেতারা ভিড় করছেন। পুলিশ দোকান বন্ধ করে দিচ্ছে, ক্রেতাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু, চোর–‌পুলিশ খেলা বন্ধ হচ্ছে না। পুলিশ দেখলেই দৌড়। পুলিশ একটু দূরে গেলেই ফের জটলা। যেন বীরত্ব!‌ মাস্ক?‌ ‘‌ভুলে গেছি’‌ বা ‘‌পকেটে আছে’‌। দূরত্ববিধি?‌ ‘‌স্যর, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা না মারলে চলে?‌ আচ্ছা, বাড়ি যাচ্ছি।’‌ প্রত্যেকটা লোকের জন্য একজন করে পুলিশ রাখতে হলে কর্মীর সংখ্যা ৫০ গুণ বাড়াতে হবে। এই লোকগুলোর কি নিজেদের বঁাচানোর ইচ্ছাও নেই?‌ আছে। তবে, ‘‌কিছু হবে না’‌!‌ সপ্তাহে ৭ দিন বাজারে যেতে হবে, মাস্ক বাড়িতে ফেলে আসতে বা পকেটে রেখে দিতে হবে। এরাই আড্ডায় মুখর, কী অবস্থা দেশের, রাজ্যের, কী করা উচিত সরকারের। সোশ্যাল মিডিয়ায় অপপ্রচার ছড়ানো এদের মহান দায়িত্ব।
কী করবেন?‌ আরও বোঝাবেন?‌ অনন্তকাল বোঝাবেন?‌ সচেতন হওয়ার বার্তা প্রচার করে গলা চৌচির হয়ে যাবে?‌
রৌনক আগরওয়াল। দামি গাড়ি নিয়ে বেরোল লকডাউনের মধ্যে। দুই সঙ্গী। নেশা করে ‘‌একটু’‌ বেড়ানো। পুলিশ আটকানোর চেষ্টা করায়, স্পিড বাড়িয়ে পুলিশ কর্মীকে জখম করে পালাল। পরে ধরা পড়ল, নিশ্চয় জামিন পেয়ে গেছে। বেশ আছে!‌ সিঁথি থানার সাব–‌ ইনস্পেক্টর পথে পড়ে–‌থাকা অসহায় এবং আক্রান্ত বৃদ্ধকে (‌দেখেও দেখেননি কেউ!‌)‌ তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
২৯ জুলাইয়ের হিসেব, এ পর্যন্ত কলকাতা পুলিশের ১১০০ পুলিশ কর্মী সংক্রমিত আমাদের সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে। জেলাতেও ১২০০। প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন অফিসার, অনেক কর্মী।
পুলিশ আর কী করবে?‌ ওঁরা মাস্ক–‌ছাড়া লোকেদের ঘরে ফিরিয়ে দিচ্ছে। কয়েকটা ক্ষেত্রে কান ধরে ওঠবস। ভয়ঙ্কর কিছু অসভ্যের পিঠে মৃদু লাঠি। লাঠি বোলানো!‌ তাতেই শুনছি, অনেক সামাজিক অভিভাবক, মানবাধিকার–‌সচেতন ব্যক্তি বলছেন, এসব ঠিক নয়। চীন যা পারে, যেভাবে শৃঙ্খলা ধরে রাখে, গণতন্ত্রে সম্ভব নয়। কিন্তু, এটাই বা কেমন আবদার, একটু শাসনও করা যাবে না?‌ যারা সঙ্কটকালে হাসতে হাসতে নিয়ম ভাঙছে, ভাইরাস ছড়াচ্ছে, তাদের পিঠে মৃদু লাঠি কেন অগণতান্ত্রিক?‌ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে, সেজন্যই তো লাঠি দেওয়া আছে। অতি–‌সচেতন কিছু ব্যক্তি গালাগালি দিলে দিন, আমরা বিশেষ ক্ষেত্রে মৃদু লাঠির পক্ষে। ‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top