অশোক দাশগুপ্ত: ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতা দিবস, কার্যত ‘‌পরাধীন’‌ বরাক উপত্যকায় পৌঁছনোর একঘণ্টা পরেই বুঝলাম, পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। টুটাফুটা বাংলায় ফোন, ‘‌মি.‌ দাশগুপ্ত, কতদিন থাকবেন?‌ কোথায় কোথায় যাবেন?‌ আমরা একটা বাঙালি সংগঠন করি, একদিন কথা বলতে যাব।’‌ সম্বোধনে ‘‌মি.‌ দাশগুপ্ত’‌, সন্দেহ তো হলই। এবং দু’দিনে সেই নম্বর থেকেই তিনবার মিসড কল। গতিবিধি বোঝার চেষ্টা?‌ আমরা ৬ জন কখনও একসঙ্গে বেরোইনি। ছড়িয়ে পড়েছি। বিকেলে নাগরিক সুরক্ষা কমিটির সংগঠকদের কথা শুনে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল। হিন্দু–‌মুসলমানে ভাগ করা যায়নি বরাকের বাঙালিকে। কিন্তু ওঁদের কথায় সব ছাপিয়ে উঠে এল গভীর উদ্বেগ, যা চলেছে, ভয়ঙ্কর কোনও ঘটনা ঘটতেই পারে অসমে। কোণঠাসা ও উৎখাত করার ধারাবাহিক চেষ্টা তো চলছেই, বড়সড় দুষ্কাণ্ডের ভাবনা বিচলিত করছে বাঙালি সুরক্ষার সংগঠকদের। আড়াই মাস পর এল সেই ভয়ঙ্কর দিন। তিনসুকিয়ার ধলা গ্রামে ৫ নিরীহ দরিদ্র‌ শ্রমজীবী মানুষকে বসিয়ে হত্যা করা হল। কোনরকমে লুকিয়ে বাঁচলেন সহদেব নমসূদ্র, যিনি বেঁচে না–‌থাকলে দুষ্কাণ্ডের বিবরণ পাওয়াই যেত না। মনে পড়ছে, কলকাতায় ফেরার পর হোজাই থেকে ফোন এসেছিল, কেন আমাদের এখানে এলেন না?‌ আমরা তো ঘুরেছি শুধু বরাক উপত্যকার কিছু এলাকায়।
নৃশংস হত্যার দু–‌এক ঘণ্টার মধ্যেই আসে পুলিস রটিয়ে দিল, দায়ী স্বাধীন আসাম সংগঠন। তদন্ত দূরের কথা, পরদিনও পুলিস যায়নি। হত্যাকাণ্ডের কথা থানায় জানাতে গিয়ে ফোন সুইচড অফ পাওয়া গেছে। ৪০০ মিটার দূরে থানা, কেউ আসেনি। আলফা সম্পর্কে নরম থাকার প্রশ্ন নেই। কিছু তথ্য প্রাসঙ্গিক। স্বাধীন অসমের জন্য বিপজ্জনক লড়াই আলফার। হয়তো বিদেশি শক্তির মদতও আছে। কিন্তু বিশেষ বাঙালি–‌বিদ্বেষী বলে জানা যায় না। সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে তো নেই–‌ই। আদবানির রথ যখন দেশে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, আলফা হুমকি দেয়, অসমে রথ ঢুকতে দেব না। এবং ঢোকেওনি। বিস্ফোরণ বা হত্যাকাণ্ড ঘটলে তৎক্ষণাৎ প্রচার করে আলফা, তাঁদের সাফল্য!‌ এবার কিন্তু পরদিনই বিবৃতি, ওঁরা জড়িত না। তাহলে কারা?‌ অরবিন্দ রাজখোয়াদের পাল্টা ‘‌আলফা’‌ সরকারের সঙ্গে আপস করে আরামেই আছেন। তাহলে কারা?‌
অসমে কয়েকজনের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলে মনে হল, বিজেপি–‌র যোগ আছেই। কিছু জঙ্গি দলছুট হয়ে ভাড়াটে হিসেবে শাসক দলের হয়ে কাজ করতে পারে। ভাড়াটে যোদ্ধা। মার্সিনারি। অর্থের জোগান আছে, সরকারি সুরক্ষার মদত আছে, নৃশংস খুন ওদের পেশা!‌ যোগসূত্রটা চেপে দেওয়ার জন্য শুরু থেকেই সক্রিয় অসমের বিজেপি সরকার। নাগরিক পঞ্জির নাম করে বাঙালিদের ছিন্নমূলে রাষ্ট্রহীন করার চক্রান্ত যাদের, তারা নিজেদের হাত পকেটে রেখে, মার্সিনারিদের লেলিয়ে দিয়েছে। যাতে নিজেদের হাতে রক্তের দাগ না লেগে থাকে। দাগ কিন্তু থেকেই যায়।
বরাকে গিয়ে বাঙালি সুরক্ষার সচেতন ও ধর্মনিরপেক্ষ সংগঠকদের কথায় একটা আক্ষেপের সুর শুনতে পেয়েছিলাম। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিরা নাগরিক পঞ্জির চক্রান্ত ও ভয়াবহ বাঙালি–‌বিরোধী অভিযান নিয়ে যেন নিস্পৃহ। গুয়াহাটির এক শিক্ষককে ফোন করে এমন কথাও শুনেছিলাম, যে, বেশি গলা তুললে আক্রমণ নেমে আসতে পারে। তাই যতটা সম্ভব এড়িয়ে যাওয়া। নিস্পৃহ থাকা। তিনসুকিয়ার গণহত্যা সেই চাদরটা সরিয়ে দিল। ৩ নভেম্বর অসম বন্‌ধ সর্বাত্মক। বরাক উপত্যকায় তো বটেই, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাতেও। গুয়াহাটির রাস্তাঘাট শুনশান। বাঙালিদের ক্রোধ কোথাও কোথাও পাল্টা আক্রমণের পথে যেতে চাইল। বাঙালি সংগঠনের নেতারা সজাগ, সতর্ক থাকলেন। শত্রুপক্ষের হাতে অপপ্রচারের অস্ত্র তুলে দিতে রাজি হলেন না। কিন্তু, প্রতিরোধ স্পষ্ট। চাপা আবেগ ছিটকে বেরোল। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, নাগরিক সুরক্ষা আন্দোলনের অগ্রণী যোদ্ধা তপোধীর ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‌তিনসুকিয়ার ঘটনা মর্মান্তিক। যেন এ রকম ঘটনা আর একটাও না ঘটে। কিন্তু ওই পাঁচজন শহিদ জানিয়ে দিল বাঙালিকে। পাঁচ বাঙালির নৃশংস খুনের জেরেই জেগে–‌ওঠা ভাল নয়। কিন্তু, ওঁরা শহিদ। জাগিয়ে দিয়ে গেলেন। যন্ত্রণা। তবে প্রসব যন্ত্রণা। মৃত্যুর বেদিতে পবিত্র আবেগের আবাহন। শহিদরা তো এমনই করে যান।’‌
নোংরা প্রচার তো শুধু অসমের বিজেপি নেতারা করেননি। সর্বভারতীয় সভাপতি ‘‌উইপোকা’‌ বলেছেন নাগরিক অধিকার হারাতে–‌চলা মানুষদের। বাংলাতেও নেতারা বলতে শুরু করেন, অসমের মতো এখানেও হবে। মানে, ‘‌অনুপ্রবেশকারী’‌ একথা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করা হবে। বোঝাতে চাওয়া হচ্ছিল, হিন্দুদের চিন্তা নেই, তাড়ানো হবে মুসলমানদের। অসমে ৪০ লক্ষ মানুষকে নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্তত ৮৫ শতাংশ হিন্দু। ব্যাপারটা মূলত বাঙালি উৎখাত। ৫ শহিদের নিধন সেই সত্যটাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করে গেল। তপোধীর ভট্টাচার্যর কাছে জানতে চাইলাম, বিদ্বেষটা সাম্প্রদায়িক না প্রাদেশিক?‌ বললেন, ‘‌এখন আর আলাদা করার উপায় নেই। মিলেমিশে গেছে। প্রাদেশিক সঙ্কীর্ণতার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাকে জুড়ে নিয়েছে বিজেপি।’‌
বাংলায় প্রতিক্রিয়া নেই?‌ আছে তো। আগডুম বাগডুম কথা বললেও দিলীপ ঘোষরা ভীত। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে আর্ত আবেদন, অসমে বাঙালি–‌বিদ্বেষ থামান। না হলে লোকসভা ভোটে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যাবে না। বাংলার বাঙালিদের আবেগ সুপ্ত, কিন্তু মৃত নয়। মমতা ব্যানার্জি শুরু থেকেই সঙ্গে ছিলেন। লোকসভায় প্রসঙ্গ তুলিয়েছেন। আগে শিলচর, এবার তিনসুকিয়ায় প্রতিনিধি–‌দল পাঠিয়েছেন। শহিদদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করেই কর্তব্য শেষ করা হয়নি, রাষ্ট্রপতির কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মমতা বারবার বলছেন, পাশে আছি, সঙ্গে আছে বাংলা। বাঙালির আদর্শ প্রতিনিধিত্ব করছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বড় কথা এই যে, ভোটের কথা ভেবে লড়াকু অবস্থান নেননি মমতা। লড়াইটা তাঁকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে, এর মধ্যে কোনও কৌশল নেই। আছে মানবিক আবেগ। সেই আবেগের নিশ্চিত প্রতিনিধিত্ব করছেন মমতা ব্যানার্জি। বিজেপি নেতাদের থুতু তাঁর গায়ে লাগবে না। বাংলার মানুষ সচেতন, থুতু লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে। হয়েই গেছে।

জনপ্রিয়

Back To Top