বাংলাকে গুজরাট বানাতে চায় বিজেপি। দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘‌হ্যাঁ, বলছি তো, বাংলাকে গুজরাট বানাতে চাই।’‌ পেরে উঠবেন না, তবু একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক, বাংলাকে কোন রাজ্যের মতো বানাতে চান ওঁরা।
ব্যবসা–‌বাণিজ্যে এগিয়ে। অনস্বীকার্য, নানা ক্ষেত্রে বাংলা সামনে থাকলেও, এই দিকটায় গুজরাটিরা বহুকালই এগিয়ে। ব্যবসা–‌মনস্ক। বাঙালির টান চাকরির দিকে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মদিনে, ২ আগস্ট ১৯৯৯, নবজাগরণ সংগঠন তৈরিই হয়েছিল এই বার্তা দিয়ে যে, বাঙালিকে ব্যবসাও করতে হবে। কথাটা এখনও সত্যি। বেশ কয়েকজন বাঙালি শিল্পোদ্যোগীকে আমরা পেয়েছি। আরও অনেক পথ হাঁটতে হবে। দৌড়তে গিয়ে হোঁচট খেয়ে লাভ নেই, দৃঢ় পদক্ষেপে হাঁটতে হবে। ব্যবসা–‌বাণিজ্যে কী সুবিধা বহু বছর ধরেই পেয়েছে গুজরাট, সেটাও উল্লেখযোগ্য। বাংলার তুলনায় অনেক কম ঘনবসতি ওখানে। জমি অঢেল। টাটাদের রাতারাতি দেড় হাজার একর ভাল জমি গুজরাট দিতে পেরেছিল। তা–‌ও অনেক নিয়ম অগ্রাহ্য করে, মানবিক দিকটা উপেক্ষা করে। ন্যানো দঁাড়ায়নি, সে তো জানাই আছে। গুজরাট ছঁুলেই সোনা, এই মিথটাও চুরমার হয়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে ক্রেডিট–‌ডিপোজিট রেশিও দেখুন। বুঝবেন, কতটা আদর–‌‌যত্ন পেয়েছে গুজরাট। ১০০ টাকা আমানতে বাংলায় ব্যবসায়ীরা ঋণ পান ৪৯ টাকা। গুজরাট?‌ ৮০ টাকা! বৈষম্য প্রচুর। গুজরাটে বন্দরের সংখ্যা ১৮। কলকাতা, হলদিয়ার পর আরেকটি বন্দর পেতে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে আমাদের। ৯ বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী সমুদ্রবন্দর চাইছেন, কথা হচ্ছিল তাজপুরে কেন্দ্র–‌রাজ্য উদ্যোগে, ওরা করেনি। এখন রাজ্যই করতে চলেছে।‌
তবু, বাংলার সাম্প্রতিক সাফল্য দেখার মতো। তথ্য ও প্রযুক্তিতে আমরা এগোচ্ছি। এক বছরে বৃদ্ধি ১৩৩ শতাংশ। সম্প্রতি সিলিকন হাব–‌এ আরও অনেক লগ্নি ও কর্মসংস্থানের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী, যা অবিলম্বে রূপায়িত হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বাংলার অগ্রগতি দেশের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল। বাংলাকে পিছিয়ে থাকতে হয়েছিল মাশুল সমীকরণ নীতির জন্যও। সুবিধা পেয়েছে পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারত। সব বাধা কাটিয়ে আমরা এগোচ্ছি। দ্রুত।
মানবোন্নয়ন সূচকে ‘‌মডেল’‌ গুজরাটের অবস্থান কোথায়?‌ প্রাথমিক শিক্ষায় নীচের দিকে। অপুষ্টির বিরুদ্ধে অভিযানে নীচের দিকে। প্রসবকালীন মৃত্যু ঢের বেশি, উন্নয়ন সূচকে নীচের দিকে। সব ক্ষেত্রেই অনেক অনেক এগিয়ে বাংলা, যে–‌বাংলাকে গুজরাট বানাতে চায় বিজেপি। কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে দেশে এক নম্বর বাংলা, প্রথম পঁাচে নেই গুজরাট। এমন ‘‌মডেল’‌ কি আমরা চাইতে পারি?‌ দুর্গতি ডেকে আনতে পারি?‌
জনকল্যাণের দিকে, জনমুখী প্রকল্পের দিকে একবার তাকাবেন নাকি?‌ তাকালে, ওঁদের ঢাক–‌ঢোল পেটানো মডেলটাকে অগ্রাহ্য করবেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ৬৪টি এমন প্রকল্প এনেছেন এবং বাস্তবায়িত করেছেন, যার সমকক্ষ ভূভারতে নেই। কন্যাশ্রী। রাষ্ট্রপুঞ্জে পুরস্কৃত। কমেছে স্কুলছুটের সংখ্যা। কমেছে কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। গেরুয়া নেতারা বলতে থাকেন, আছে তো কেন্দ্রের ‘‌‌বেটি বচাও বেটি পড়াও’।‌ গোটা দেশের জন্য যা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র, শুধু বাংলাই কন্যাশ্রীতে খরচ করেছে তার চেয়ে বেশি। অনেক বেশি। একটা ভান, একটা ভাল। রূপশ্রী, ঐক্যশ্রী, সবুজ সাথী, জয় জোহার, এমন আরও অনেক প্রকল্প আমাদের রাজ্যে, তুলনীয় কিছু কতটা আছে ওই মডেল রাজ্যে?‌ কার্যত নেই। একদিকে ৬৪, অন্যদিকে টেনেটুনে ১০। অন্য দিকটাকে ডেকে আনবেন?‌ প্রধানমন্ত্রী ও তঁার সঙ্গীসাথীরা বলেন, দারুণ প্রকল্প ‘‌আয়ুষ্মান ভারত’‌। তাই নাকি?‌ কিছু মানুষের জন্য এঁরা করেছেন। বাংলায় স্বাস্থ্যসাথী শুধু আগে হয়নি, এখন সব রাজ্যবাসীই ৫ লক্ষ টাকা চিকিৎসা খাতে পেতে পারছেন। ১০ কোটি মানুষই। সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা, দেশের আর কোনও রাজ্যে নেই। স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে ১৫০০ বেসরকারি হাসপাতালেও, খরচ রাজ্য সরকারের।
এত প্রকল্পের রূপায়ণ করে মমতা কি আত্মসন্তুষ্ট?‌ না। রূপায়ণে ফঁাকি থাকতেও পারে, সব মানুষের কাছে সুবিধা পৌঁছতে না–‌ও পারে, তাই এবার ‘‌দুয়ারে সরকার’।‌ সরাসরি কথা শুনছে, বিহিত করছে রাজ্য সরকার। ২০ হাজার শিবির!‌ এটাও, বলতে হচ্ছে, ভারতের আর কোনও রাজ্যে নেই। অভিযোগ সব রাজ্যে, প্রতিকারের ব্যবস্থা শুধু বাংলায়। এই বাংলাকে উল্টো পথে ঠেলে দিতে চাইবেন?‌
এবং ২০০২। সেই গণহত্যা। হাজার হাজার মানুষ ঘর হারিয়েছেন, আগুন, ধ্বংস, লুঠ। সংখ্যালঘু নিধন। ‘‌দাঙ্গা’‌ নয়, ‘‌গণহত্যা’‌। যতই চেষ্টা করুক, যতই বিষাক্ত প্রচার করুক, যতই টাকা ছড়াক, বাংলায় হবে না। করা যাবে না। করতে দেবেন না মমতা। হতে দেব না আমরা।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top