কারা জুনিয়র ডাক্তার?‌ আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরাই তো। এঁরাই ভবিষ্যতে কত মানুষের চিকিৎসা ভালভাবে করার দায়িত্বে থাকবেন, তাঁদের শত্রু কেউ ভাবছি না। অসুখ হলে ডাক্তারদের কাছেই যাই। সিনিয়র ডাক্তাররা এক সময়ে কোনও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছাত্র ছিলেন। প্রাক্তনী হিসেবে সহমর্মিতা স্বাভাবিক। আমাদের যেমন ডাক্তারদের ছাড়া চলে না, ডাক্তারদেরও আমাদের ছাড়া চলে না। আমরা পরস্পরের শত্রু হতে পারি না। এনআরএস–‌এর যে–‌দুজন ছাত্র সঙ্ঘর্ষে আহত, তাঁদের কথা আমরা সকলেই ভাবি। তাঁদের ওপর আক্রমণ দেখে নির্বিকার থাকি না।
কিন্তু, চিকিৎসা বন্ধ করে দিলে, সমর্থন করতে পারি না। বেশ কয়েকটি হাসপাতালে, জেলায় জেলায় দেখা গেছে, কালো ব্যাজ পরে আক্রমণের প্রতিবাদে থেকেও, ডাক্তাররা বারান্দায় গাছতলায় চিকিৎসা করেছেন। তাঁদের কুর্নিশ। পাশাপাশি, চক্রান্ত, ‘‌চক্রান্ত’‌ শব্দটাই ব্যবহার করছি, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চুরমার করে দেওয়ার। রাজ্যের ৯০ শতাংশ রোগী চিকিৎসা পান সরকারি হাসপাতালেই। এই মানুষেরা কোথায় যাবেন?‌ ঘটিবাটি বেচে বেসরকারি হাসপাতালে?‌ চিকিৎসাই না পেয়ে প্রাণ হারাবেন?‌ বিরোধীরা সরকারের বিরোধিতা করবেন। কিন্তু তাঁরা কেন জুনিয়র ডাক্তারদের কাছে আবেদন করলেন না, চিকিৎসা অব্যাহত রাখুন?‌ রাজনীতি এই জায়গায় এসে দাঁড়াল?‌ 
এনআরএস–‌এ ঘটনা গভীর রাতে। এক, পুলিশ আক্রমণকারী ৫ জনকে গ্রেপ্তার করল। সরকারের অবস্থান কঠোর, জামিন হয়নি। দুই, গুরুতর আহত জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখার্জির চিকিৎসার ভার হাতে তুলে নিয়ে ইনস্টিটিউট অফ নিউরো সায়েন্সেস–‌এ ভর্তি করে দিল সরকার, যে–‌সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ববিখ্যাত নিউরো সার্জেন ডা.‌ আর পি সেনগুপ্ত। পরিবহ সুস্থ হয়ে উঠছেন। তাঁর চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন রাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব। ন্যূনতম দায়িত্ব?‌ হ্যাঁ। এবং তা পালিত। তিন, পরদিন সকাল দশটায় স্বাস্থ্য রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য গেলেন এনআরএস–‌এ। কথা বলতে চান। আলোচনা হল কি?‌ না। বিক্ষোভ। আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানের রাস্তা খুঁজতে রাজি হলেন না আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা, জুনিয়র ডাক্তাররা। চার, ভোটের সময়ে কমিশনের অধীনে থাকা বদলি পুলিশ কমিশনার হাসপাতাল থেকে পিকেট তুলেছিলেন। ব্যবস্থা যাতে দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, কথা বলতে গেলেন নগরপাল অনুজ শর্মা। ‌ পাঁচ, বিদ্যাসাগরের মূর্তি আবার বসাতে ও নতুন মূর্তি বসাতে যখন গেছেন মুখ্যমন্ত্রী, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানতে চাইলেন, প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন কিনা। ‌‘‌অবশ্যই’‌, বললেন মমতা। কথাই বললেন না জুনিয়র ডাক্তারদের নেতারা। পিজি হাসপাতালে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী, রোগীদের দুর্গতি দেখে আলোড়িত হলেন। জুনিয়র ডাক্তাররা, আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরা স্লোগানে সোচ্চার। না। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহ দেখালেন না। ‘‌গো ব্যাক’‌। রাতে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মমতা বললেন, ‘‌বাচ্চা–‌বাচ্চা ছেলেমেয়েদের কথায় রাগ করছি না। শুধু বলছি, ওরা কাজে ফিরুক।’‌ বলা হচ্ছে, কেন মুখ্যমন্ত্রী এনআরএস–‌এ গেলেন না?‌ গেলে যে প্ররোচিত করা হত না, অনভিপ্রেত কিছু ঘটত না, পিজি–‌র পরে গ্যারান্টি দিতে পারেন?‌
শুক্রবার বিকেলে পাঁচ শ্রদ্ধেয় ডাক্তার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বললেন। জুনিয়র ডাক্তারদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে মমতা প্রস্তুত, সেদিনই। স্বাস্থ্য শিক্ষা ‌অধিকর্তা সেই বার্তা নিয়ে গেলেন এনআরএস–‌এ। বিক্ষোভ!‌ পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। কেউ কথা বলতে এলেন না। পরদিন হতে পারে, জানালেন ডাঃ সুকুমার মুখার্জি, রাতের বৈঠকে ‘‌হ্যাঁ’‌ আসেনি। পরদিন সকালেও না। আলোচনাই চাওয়া হচ্ছে না?‌  
মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, একজন ডাক্তার তৈরি করতে রাজ্যের, রাজ্যবাসীর ২৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়। ঘটনা। ইতিবাচক বিনিয়োগ। সমাজের, মানুষের চাই অনেক ডাক্তার, সেই হয়ে–‌ওঠায় রাজ্যের বিনিয়োগ, যাতে মানুষ চিকিৎসা পায়। অনেকে দু–‌তিন বছর নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে বেসরকারি ক্ষেত্রে চলে যান, যেখানে গরিব মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। কেউ পাড়ি দেন বিদেশে এবং সেখানেই থেকে যান। রাজ্যের সাধারণ মানুষের হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষোভ ও খেদ তো স্বাভাবিক। তাতেও সমালোচনা?‌
যতদূর জানি, জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনে অনেকেই বামপন্থী। এই তরুণ ‘‌বাম’‌ সংগঠকরা কি জানেন না, ভয়ঙ্কর দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তি এই আন্দোলনকে ব্যবহার করতে চাইছে?‌ তাহলে রাজনীতিতেই আসি। শুনি, বিজেপি নেতারা কী বলছেন। দিলীপ ঘোষ সরাসরি বলেছেন, ‘‌যারা আক্রমণ করেছে, তারা একটি ‘‌বিশেষ সম্প্রদায়’‌–‌এর। এই বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রায় ৫০ শতাংশই সমাজবিরোধী।’‌ একটা স্পর্শকাতর বিষয়কেও সাম্প্রদায়িক প্রচারের সুযোগ হিসেবে দেখলেন এবং দেখেই যাবেন ওঁরা। প্রশ্ন, যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন কিছু ক্ষেত্রে (‌কেউ সেই হামলাকে সমর্থন করছি না)‌, তাঁদের মধ্যে কি এই ‘‌বিশেষ সম্প্রদায়’‌–‌এর ডাক্তাররাও নেই?‌ যাঁরা কুৎসিত হামলা করছেন, তাঁদের মধ্যেও কি এই ‘‌বিশেষ সম্প্রদায়’‌–‌এর বাইরের মানুষ নেই?‌ প্রশ্নটা যে সহজ এবং উত্তরও তো জানা। হ্যাঁ, আছে। এই অনভিপ্রেত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে কোনও হিন্দু–‌মুসলিম তফাত নেই। যাঁরা আক্রান্ত হন বা যাঁরা করেন আক্রমণ, তাঁদের মধ্যে হিন্দু–‌মুসলিম ভাগ করে দিয়ে বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক প্রচার চলবে, চলতে দেওয়া হবে?‌ চলতে দিতে পারি না আমরা। যাঁরা উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছেন নানা মাধ্যমে, তাঁরা কি সমস্যার সমাধান চান?‌ সংশয় প্রবল। হাওয়া গরম করা খুব সহজ। তাতে কি সমস্যার সমাধান হবে?‌ সাধারণ পরিবারের রোগীদের উপকার হবে?‌ যা চলল, তাকে দুটি শব্দে বলতে হয়—
‘‌চিকিৎসা রাজনীতি’‌।

জনপ্রিয়

Back To Top