বাহারউদ্দিন: দ্বিধাহীন প্রেম আর সংগঠিত মুক্তচিন্তা আমাদের একান্ত আশ্রয়। ছবি আর কবিতার সঙ্গে বসবাস। স্বপ্নময়তা। কারও কারও নিরাশ্রিত, প্রতারিত ভাগ্যের দীর্ঘশ্বাস। প্রতিস্পর্ধীর দুঃসাহস। গানে গানে, ভালবাসায় ভেতরের বন্ধন খুলে দেওয়ার আগ্রহ কেন জানি জীবনকে বড্ড বেশি ছুঁয়ে আছে। এ এক অদ্ভুত সংযত আবেগ, যেখানে রুমি আমাকে খোঁজেন, আমি রুমিকে খুঁজে বেড়াই, খুঁজতে খুঁজতে হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, যাপনের অঙ্গে অঙ্গে বিবর্তনবাদী, প্রকৃতিবাদী জালুদ্দিনের শাশ্বত ভাবনার নিবিড় আলিঙ্গন অনুভব করি। চিন্তার বন্দিত্ব (‌রেজিমেন্টেশন)‌, বিশেষ কোনও রাজনীতির আকর্ষণ ধাতে নেই। অধরা সাকার কিংবা নিরাকারও ধারেকাছে আসে না। দূরত্বের সুন্দরকে পুজো করি, তার নৈর্ব্যক্তিক মাধুর্য, খিলখিল হাসি, এলিয়ে পড়া, জড়িয়ে ধরার নিষ্কাম আবরণ মুগ্ধ করে দেয়। পেশাগত আচরণে, যৎসামান্য লেখালেখির অভ্যাসেও এরকম মুগ্ধতা ও নিরাসক্ত সূক্ষ্মতাকে গুরুত্ব দিই। লেখার মুহূর্তে, সংবাদমূলত ভাষ্যে, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের নির্মোহ দৃষ্টি, শুধু একাঙ্গনের বলব কেন, যে–কোনও সত্যাশ্রয়ী সন্ধ্যানের সংশয়াতীত অবলম্বন হয়ে ওঠে। এটাই সাংবাদিকতার আর বাস্তবতাদর্শী সৃষ্টির অপরিহার্য দর্শন, চর্চিত অর্জনও।
সময়কে আমরা দেখব, গল্প বা উপন্যাসের কাহিনির মতো বানিয়ে বানিয়ে সত্য বলা নয়, বাস্তবের হাওয়া ঘেঁষে সত্যের ভেতর–বাইরের সত্যটাই বলব। যা দেখছি, মানুষ যা ভাবছে, ইতিহাসবোধ যে নির্দেশ পাঠাচ্ছে, তারই যথাসম্ভব নিখুঁত চালচিত্রের বয়ান লক্ষ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। আমাদের অর্জিত বিদ্যা, যুক্তি, বুদ্ধি ও বিবেককে সততার সঙ্গী করে তোলাই দেখা ও লেখার ধর্ম। এখানে সাহিত্য আর সাংবাদিকতার বিরোধ সুস্পষ্ট। সাহিত্যের বাণী, তার মর্মকথা সবসময় ইঙ্গিতধর্মী, রহস্যময়। সংবাদের তথ্য ও তত্ত্ব পরোক্ষ নয়, প্রত্যক্ষ। গল্পহীন, সংশয়হীন। তার ধরন ও ধারণ নির্মেদ বাঙ্ম স্তবকে জড়িয়ে হককথা বলার চেষ্টা করে। লেখার কৌশল ও ভাষা— সাহিত্যধর্মী হতে পারে, কিন্তু বিষয়, বিষয়ের বর্ণনা সরাসরি, অসাহিত্যিক।
এই ভণিতা তৈরির কারণ, রাজনৈতিক ঘূর্ণি হাওয়ায়, অতর্কিত ঘটনার অনুসন্ধান ও ব্যাখ্যায়, ভোটের আগাম হিসেবনিকেশে আমাদের কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছা বা ক্ষমতার অলিখিত আদেশে, প্রাতিষ্ঠানিক অনুশাসনকে গুরুত্ব দিয়ে বসি, রঞ্জিত সত্যরূপ, যা সত্যের ধারেকাছে থাকতে পারে, অসত্য হতে পারে, তাকেই আসন্ন বাঙ্ম স্তবতা বলে জনমতের ওপর চাপিয়ে দিই। ভোটের আগে, নিদের্শিত লেখালেখিতে প্রত্যাশিত সমীক্ষায় এই ঝোঁক কখনও কখনও প্রবল, প্রবলতর হয়ে ওঠে।
অতি নিকটের দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনের অনেক আগেই আমরা এই প্রখর প্রবণতা লক্ষ করেছি। দেশি–বিদেশি সাংবাদিকদের কেউ কেউ ভোটারের স্থিতিশীল নৈঃশব্দ্য, স্বাধীনতাপ্রীতি যাচাই না করেই বলাবলি ও জরিপ শুরু করলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট হলে আওয়ামি লিগের নৌকা এবার অতল জলে ডুবে যাবে। এই নিয়ে আমাদের সঙ্গে কারও কারও প্রবল তর্ক হয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, ঢাকার সংলগ্ন কয়েকটি জেলা এবং কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা বারকয়েক সফর করে ধারণা হয়েছিল, আওয়ামি লিগের শাসনপর্বে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধ ও সন্ত্রাস দমনের 
একাগ্রতার সমর্থনেই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নবপ্রজন্ম আর 
মহিলারা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। মুক্তিযুদ্ধের ভাবাবেগ ফিরে আসবে। 
ভোটে একধরনের গণবিস্ফোরণ ঘটবে। ভোটের ফলাফল ওই অনুমিত ধারণাকেই উঁচু করল। আমরা যা দেখেছি, বন্ধুদের অকপটে বলেছি, তাতে কোনও ভবিষ্যদ্বাণীর ছোঁয়া ছিল না, তারুণ্যের সপ্রতিভ মুখ আর সামাজিক চেতনার ছায়া দেখে বুঝতে পেরেছি, বাংলাদেশের নির্বাচনে আরেক অদ্বিতীয় বিজয়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। ভারতের সমাগত লোকসভা ভোটেও সম্ভবত এরকম প্রত্যাবর্তন ও পরিবর্তনের আভাস উড়ছে। কারা জিতবেন, আঞ্চলিক শক্তির ফেডারেল জোট, কংগ্রেস না গেরুয়া শিবিরের যৌথশক্তি, এ ব্যাপারে মন্তব্য করব না। করা উচিত নয়। শুধু এইটুকু বলতে পারি, সায়েলেন্ট মেজরিটি অবাধে তার সদিচ্ছা প্রয়োগ করবে। গণতান্ত্রিকতার স্থিতিকে, বহুত্বের বৈচিত্র‌্যকে স্বাগত জানাবে। ‘‌যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’‌, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও আক্রোশের হুঙ্কার আর অহঙ্কারকে এড়িয়ে সৌহার্দ্যের বিনাশ আর বিদ্বেষের অঙ্ককে দূরে হটিয়ে সামাজিক ন্যায়কে, ন্যায়ের অঙ্গীকারকে জয়ী করবে। ভারত যে বৃহত্তম গণতন্ত্র, মিলন আর বহুত্ববাদের তীর্থক্ষেত্র— এককথা জানিয়ে দেবে স্বর্তঃস্ফূর্ত জনরায়। বহু কঠিন পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ, জরুরি অবস্থার দমবন্ধ পরিবেশকে উড়িয়ে দিয়ে একসময় নাকচ করেছে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মতো শক্তিমান নেত্রীকে। জনতা দলের নৈরাজ্যিক আচরণ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধকামী রাজনীতিকে মানতে পারেনি। ফিরিয়ে এনেছে ইন্দিরাকে। ইন্দিরা–হত্যা আর শিখ–বিরোধী বিপর্যয়ের পরেও রাজীব গান্ধীকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা উপহার দিয়েছে। আবার কংগ্রেসের বিচ্যুতি ও একাধিপত্যের অহংকে গুঁড়িয়ে দিয়ে জনতার মিলিত শক্তি কোয়ালিশন যুগের রাস্তা প্রশস্ত করেছে। আঞ্চলিক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার ব্যাপ্তিকে বেনজির মান্যতা দিয়েছে, কিন্তু যখন টের পেয়েছে জোট–রাজনীতির সুযোগ নিয়ে মাথাচাড়া দিচ্ছে এক দেশ, এক ভাষা, এক সম্প্রদায়ের স্লোগানমুখর আধিপত্য— তখনই ফিরিয়ে এনেছে বহুত্ববাদী কংগ্রসের নেতৃত্বাধীন জোটকে। বামপন্থীদের ভুল কৌশলে জোট যখন ভেঙে গেল, তখনই উন্নয়নের স্বপ্ন 
দেখালেন নরেন্দ্র মোদি। জিতলেন বিপুল ভোটে। তাঁর পাঁচ বছরের শাসনে দুর্নীতি না সুনীতি, উন্নয়ন না দূরদৃষ্টির সুনয়ন বড় হল, তা ইতিহাস বিচার করবে। সত্যের চেহারা আমরা জানি, নিজেও জানেন তিনি, যা সরবকণ্ঠে বলব, কিন্তু ভোটের আগে নির্মীয়মাণ জনমতের ওপর অনিরপেক্ষ, বেলাগাম পক্ষপাতকে প্রশ্রয় দিতে চাই না। এতে প্রেম আর মুক্তবুদ্ধির আশ্রয় হারিয়ে যায়, স্তম্ভিত, ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মৌলানা জালাল উদ্দিনের নীতিশিক্ষা। অন্ধকার রুমির আত্মাকে গ্রাস করতে বেআদব নৃত্যের লীলা দেখায়। জালালের রুমিও হাত নাড়িয়ে ভিন্নতর আলোর খোঁজে প্রবেশ করেন দিশাহীন গলিতে, হয়তো–বা বদ্ধঘরে। প্রিয় পাঠক, এই ধরনের আচরিত অভ্যাস কি কাঙ্ক্ষিত?‌ ছলনার ছদ্মবেশে, আত্মছলনা নয়?‌ এ তো বন্ধুত্বের আর নিরপেক্ষতার অভিনয়কে প্রকাশ্যে উঁচিয়ে ধরে স্বশক্তির অপচয়। যার আরেক নাম প্রতারণা, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং পেশার প্রতি, দায়বদ্ধতার প্রতি ঘোরতর অবিচার।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top