সন্ত্রাসবাদ গোটা পৃথিবীতেই প্রত্যাখ্যাত। সন্ত্রাসবাদী নেই, জঙ্গি নেই, তা নয়। কিন্তু আগের মতো দম নেই। এখানে–‌ওখানে হানা, জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি, তবে শক্তি হারিয়েছে। আরও হারাবে। মাওবাদী হোক বা মৌলবাদী, যে–‌কোনও ধরনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, সজাগ থাকতে হবে, কমছে বলে উপেক্ষা করা অনুচিত। সন্ত্রাসবাদের কোনও ধর্ম নেই। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলা করে যারা বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, তারা অপরাধী। শ্রীলঙ্কায় গির্জায় হানা দিয়ে যারা বহু মানুষকে হত্যা করেছে, তারা অপরাধী, এরা প্রত্যেকেই সমাজবিরোধী। আন্দাজ করা যায়, উল্টো দিকের ভয়ঙ্কর শক্তি ওদের একটু বঁাচিয়ে রাখতে চায়, যাতে উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদের ফসল তোলা যায়।
মুর্শিদাবাদে, এর্নাকুলামে একই দিনে ৯ জন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে এনআইএ। ‘‌সন্দেহ’‌ যদি সত্য হয়, তথ্য–‌প্রমাণ দিয়ে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হোক। সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার আগেই যদি তদন্তকারী সংস্থা গপ্পো ছড়াতে থাকে, সাধারণ মানুষ শুধু বিভ্রান্ত হন না, হয়তো গোটা ব্যপারটাকেই হালকা ভাবে নেন। যথা, মুর্শিদাবাদে একজনের বাড়িতে সুড়ঙ্গ। সবাই জানেন, সুড়ঙ্গের দুটো দিক হয়। মুর্শিদাবাদে ‘‌আবিষ্কৃত’‌ সুড়ঙ্গের একটা মুখ। একটু জায়গা, যেখানে সাধারণ কিছু রাখা যায়। রাখা হয়। ‘‌সুড়ঙ্গ’‌ বৃত্তান্ত দঁাড়াচ্ছে কি?‌ ছবি দেখলাম, এনআইএ উদ্ধার করেছে ‘‌বিস্ফোরক’‌। কী?‌ কয়েকটা চকোলেট বোমা। দেখেই বলে দেওয়া হল, ভেতরে ভয়ঙ্কর আইইডি আছে। থাকতে পারে নয়, আছে!‌ এক ধৃতের পাকা বাড়ি নিয়ে বিশাল গপ্পো। একতলা সাধারণ বাড়ি। তিন ভাই কাজ করে কেরলে। কোনওরকমে থেকে, মাসে ২০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে, প্রতি মাসে। কিছু জমতে পারে না?‌ জানা গেল পাকা বাড়িটা করতে জমিও বিক্রি করতে হয়েছে। এমন হাস্যকর অভিযোগ ছড়ানোর সময় তদন্তকারীরা যেন মনে রাখেন, সুবিধা হবে তাদের, যারা নিশ্চিতভাবে জঙ্গি। বিশ্বাসযোগ্যতা রাখার চেষ্টাও থাকলে ভাল হয় না?‌
খবরটা প্রকাশিত, প্রচারিত এবং ‘‌বিকশিত’‌ হওয়ার পরেই উদ্ভট মন্তব্য করলেন ঘাপটি মেরে–‌থাকা দিলীপ ঘোষ। কী?‌ ভারত–‌বাংলাদেশ সীমান্তে কঁাটাতারের বেড়া দেওয়া হয়নি ১০০০ কিলোমিটারে। বক্তব্য, ইচ্ছাকৃতভাবে সীমান্ত অরক্ষিত রাখছে চোখের বালি মমতা সরকার। আরে, মিথ্যা বলার আগে একটু তো জেনে নিন। জানলে, হাস্যাস্পদ হবেন না। সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিএসএফ–‌এর। কেন্দ্রের। কঁাটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বরাদ্দ আছে সিবিডব্লিউডি–‌রোডস–‌এর। সবই কেন্দ্রের। বরং প্রশ্ন ওঠে, কেন্দ্র উদাসীন কেন?‌ প্রয়োজনীয় কাজটা করছে না কেন?‌ সীমান্ত অরক্ষিত রাখছে কেন?‌
একটা তথ্য দেখা যাক। ২০১৯ সালে জঙ্গি সন্দেহে রাজ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ২১ জন। ৭ জনকে ধরেছে এনআইএ। বাকি ১৪ জনকে রাজ্য ও কলকাতা পুলিশ। তথ্যটা হজম করতে পারছেন কি দিলীপ ঘোষ ও তঁার সাঙ্গোপাঙ্গরা?‌ রাজ্য সরকার প্রয়োজনে কঠোর হয় না, এই প্রচারটা এক পায়েও দঁাড়াচ্ছে কি?‌
দেশের যেখানেই নাশকতার সঙ্গে যুক্তরা আছে (‌সাধ্বী প্রজ্ঞা ঠাকুর–‌সহ!‌),‌ কঠোর ব্যবস্থা নিক সরকার। এনআইএ তৈরি হয়েছে কেন?‌ মনে হয়, প্রধানত জঙ্গি ছাপ দিয়ে কিছু লোককে (‌যাদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী থাকতেই পারে)‌ গ্রেপ্তার করে, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ইন্ধন জোগানোই প্রধান উদ্দেশ্য। যারা সত্যিই জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদী, তাদের ধরুন, শাস্তির ব্যবস্থা করুন। কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় একটি সম্প্রদায়কে অপরাধী প্রমাণ করার কুৎসিত চেষ্টা, সুস্থ–‌সচেতন মানুষদের তো প্রতিবাদ করতেই হবে। দিল্লি দাঙ্গা যারা বাধাল, তাদের স্পর্শই করল না কেন্দ্রের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশ। যঁারা দাঙ্গার বিরুদ্ধে বলেছেন, সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, তঁাদেরই অভিযুক্ত করা হচ্ছে। অনুরাগ ঠাকুর থেকে কপিল মিশ্র, বিজেপি–‌র যে–‌নেতারা প্রকাশ্যে প্ররোচনা জোগালেন (‌গোলি মারো শালেঁাকো)‌, যারা জামিয়া মিলিয়া ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা করল, তারা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুর্শিদাবাদ এবং এর্নাকুলাম প্রসঙ্গে ফিরি। মুর্শিদাবাদ, এর্নাকুলাম। বাংলা, কেরল। নির্বাচন আসন্ন। কেরলেও কয়েক বছর ধরে জমি পাওয়ার চেষ্টা করছে মোদির দল। বাংলায় তো লোকসভায় কিছু আসন পেয়ে মাথাই কিনে নিয়েছে!‌ এনআইএ (মাথায় অমিত শাহ)‌ এই দুই রাজ্যকে বেছে নিয়েছে সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত প্রচারকে উস্‌কে দেওয়ার জন্য। এই ভয়ঙ্কর রাজনীতিকে পরাস্ত করা বাংলার মানুষের মানবিক কর্তব্য। চক্রান্ত স্পষ্ট, আমাদের লড়াইটাও স্পষ্ট। তীব্র।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top