ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম একটা দিনও বরাদ্দ রাখতে পারে না বিশুদ্ধ শোকের জন্য। একটা দিনের জন্যও ‘শত্রুতা’‌ ভুলতে পারে না। দিয়েগো মারাদোনার প্রয়াণের পরদিন একটি সংবাদপত্র :‌ ‘‌পেলের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও, পরবর্তী প্রজন্মের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার মারাদোনা চলে গেলেন।’‌ এক, পেলের সঙ্গে তুলনীয় নন। দুই, পরবর্তী প্রজন্মের, চিরকালের নয়। তিন, ‘‌জনপ্রিয়’, সেরা নয়। আমরা একেবারে প্রথম কথাটায় যেতে বাধ্য হচ্ছি। পেলের সঙ্গে ‘‌তুলনীয়’‌ নন?‌ কান্না চেপে রেখে আলোচনায় যেতে বাধ্য হচ্ছি, পেলেরও ওপরে, সর্বকালের সেরা ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনা।
মনে রাখব, সেলাম করব, চিরস্মরণীয় স্ট্রাইকার পেলে। শুটিং, হেডিং, তীক্ষ্ণ। মারাদোনা গেমমেকারও। দেশের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৩৪ গোল নিতান্তই খণ্ডচিত্র। খেলা তৈরি করতেন তিনি, মারাদোনা। চুরমার করে ভেঙে দিতেন শুধু বিপক্ষের ডিফেন্স নয়, মনোবলও। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। গোলদাতা ক্যানিজিয়া। সব বলা হয়ে গেল?‌ মাঝমাঠ থেকে বেড়া ভাঙতে ভাঙতে একেবারে মোক্ষম মুহূর্তে সাজানো পাস। ‌‌স্বয়ং ক্যানিজিয়া পরে বলেছেন, গোলটা আমার ১০%, ৯০% দিয়েগোর।
তখন ফাউল নিয়ে কড়াকড়ি হয়নি। বেধড়ক মেরেও মারাদোনাকে রোখা যায়নি, যেত না। পেলের উত্থান ১৯৫৮ বিশ্বকাপে। ১৯৬২ সালে চোট পেয়ে টুর্নামেন্টের বাইরে। বদলি আমারিল্ডো দারুণ খেলে, অনেক গোল পেলেন। ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন। ১৯৬৬। আবার কঠোর ডিফেন্ডার, পেলে বাইরে। বড় তো বটেই, কিন্তু নরম ধাতের এই দুরন্ত ফুটবলারকে ছাড়িয়ে গেছেন মারাদোনা।
ক্লাব ফুটবলে পেলে খেলেছেন দেশের সান্টোস–‌এ, শেষে আমেরিকায় কসমস ক্লাবে। কড়া ট্যাকল হজম করতে হয়নি। সবচেয়ে নিষ্ঠুর ডিফেন্স ইওরোপিয়ান লিগে, নিষ্ঠুরতম ইতালিতে। মারাদোনা গেলেন এবং খেলেন এমন ক্লাবে যারা ‘‌ছোট ক্লাব’‌। নাপোলিকে দু’‌বার চ্যাম্পিয়ন করলেন প্রায় একার প্রতিভায়, দিলেন উয়েফা কাপও। জীবন্ত কিংবদন্তির মূর্তি নেপলসে। আগে খেলেছেন স্পেনে, বার্সিলোনায়। তঁাকে রোখা যায়নি। কোথাও না। মহান পেলে, আপনি পিছিয়ে।
ব্রাজিল টিমে পেলের পাশে কারা খেলতেন?‌ কিংবদন্তিরা। ভাভা, ডিডি, গ্যারিঞ্চা। আর মারাদোনা?‌ ১৯৮৬–‌র চ্যাম্পিয়ন দলের সতীর্থ বুরুচাগা বলছেন, ‘‌আর্জেন্টিনা টিমে একজন মারাদোনা, সঙ্গে আমরা দশজন। আমরা ওর পাশে খেলার যোগ্য ছিলাম না, ও আমাদের যোগ্য করে নিয়েছিল।’‌ কথাটা শুনে দিয়েগোর প্রতিক্রিয়া:‌ না না। আমি ক্যাপ্টেন, সামনে থেকে লড়তে তো হবেই। কিন্তু ওরা না থাকলে পারতাম না। আমার টিমমেটরা জানে, কোথায় বল দেব, কখন আমাকে ফেরত দিতে হবে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের কথায় ফিরে আসি। ইংরেজদের ‘‌চরম শত্রু’‌, কিন্তু জানা ছিল, এই লোকটাকে ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে খেলাতে পারলে সব টিকিট নিমেষে উড়ে যাবে। শিশু কল্যাণ সংস্থা ধরল তঁাকে। ব্রিটিশ সাংবাদিকরা লিখতে শুরু করলেন, মারাদোনা অর্থপিশাচ, অবিশ্বাস্য অঙ্ক চাইছে। সত্যিই বিশাল অঙ্ক। ম্যাচ শেষ। সেই চেক তুলে দেওয়া হল তঁার হাতে। ফিরিয়ে দিয়ে মারাদোনা বললেন, ‘‌আপনারা ভাল কাজ করছেন, নিন, এটা আমার সামান্য সাহায্য।’‌ কত জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে যেচে সাহায্য করেছেন, দশ হাতের আঙুলেও কুলোবে না। মানুষ, মানুষ। শ্রেষ্ঠ শুধু মাঠে নয়। এই দানের কথাটা উল্লেখ করতেও ভুলে গিয়েছিল ‘‌ডেইলি মিরর’।
‘‌হ্যান্ড অফ গড’‌ গোলের কথা বলতে বলতে ওঁদের মুখে–কলমে ফেনা উঠে গেছে। কিন্তু, দ্বিতীয় গোলটা?‌ ৬৬ গজের অমর দৌড়। ৭ জনকে টপকে গোল। ফুটবলের ইতিহাসে চিরশ্রেষ্ঠ গোল। ওরা মনে রাখেনি। ইংরেজ সাংবাদিকদের স্মৃতিশক্তি প্রয়োজনে কমে‌!‌
বিদ্রোহী। বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে ছোটবেলার বস্তির কয়েকশো মানুষকে নিয়ে গেলেন চার্টার্ড ফ্লাইটে। এক অনুষ্ঠানে জর্জ বুশ, তঁার মুখে‌— ‘‌স্টপ বুশ।’‌ কখনও বলেননি যে ‘‌আমি বামপন্থী’‌।‌ কিন্তু হৃদয়ধার্য করেছেন দরদি বিদ্রোহীদের। তঁার ডান হাতে চে গুয়েভারার উল্কি, বঁা পায়ে ফিদেল কাস্ত্রোর।
নিজের নিজের ক্ষেত্রে সেরারা চিরস্মরণীয় থাকেন। অনেক দুর্ধর্ষ অভিনেতা এসেছেন। সামাজিক‌ প্রভাব বড় ব্যাপার। তাই একজনই চ্যাপলিন। একজনই মারাদোনা।

জনপ্রিয়

Back To Top