রাজীব ঘোষ

শাবাশ রিন্টু দাস, শাবাশ প্রণব ভৌমিক। আপনাদের ভাবনা, সৃষ্টি এক যাত্রায় অনেক ফল দিয়ে গেল। অনেক কিছু শিখিয়েও গেল। এমনিতে দিল্লির পার্টি দিনরাত বাংলার বদনাম করছে, বার বার শুনতে শুনতে অনেকেই হয়তো ভাবছেন খুন–‌জখম–‌সন্ত্রাস–‌রাহাজানি ছাড়া বাংলায় কিছু হয় না। পুরনো ছক। গোয়েবলসীয় প্রচার। একটা সময় দিল্লি গেলেই শুনতে হত, ‘‌কী দাদা, আপনাদের আড্ডা কেমন চলছে?‌’‌ মানে!‌!‌ ওঁদের বদ্ধ বিশ্বাস ছিল বাঙালি ঘুম থেকে উঠেই চায়ের দোকানে চলে যায়, তার পর চায়ের পর চা, আর আড্ডা। সাধারণ মানুষ তো বটেই, বহু শিল্পপতির মনেও এই নেতির প্রচার গেঁথে গিয়েছিল, অনেকেই আসব–‌আসব করেও শেষ পর্যন্ত আসেননি। যদিও আড্ডা মেরে, ফুটবল–‌ক্রিকেট নিয়ে তুমুল চর্চা করেই বাংলার ছেলেমেয়েরা দেশ–‌বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পে সামনের সারিতেই থেকেছে। শুধু ক্ষতি হয়েছে এই রাজ্যের। কারণ, চাইলেও তঁারা সবাই এই রাজ্যে থাকতে পারেননি।
ওই রকম অপপ্রচারের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। লাটসাহেব তো ধর্মের বিভেদ তৈরি করতেও ছাড়ছেন না!‌ লাটভবনের দরবারে দূরে দূরে, মাস্ক পরে বসলে কী মোক্ষম ছবি হবে?‌ হবে না। তাই তিনি সটান লাটভবনের সিঁড়িতে, তঁাকে ঘিরে মিছিলে বন্দুকধারী শিখের মুক্তির আর্জি নিয়ে জনা–‌কয়েক। উনি চান, এই ছবিটাই গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক, বাংলার বদনাম হোক। রিন্টু আর প্রণব ওঁদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছেন। নেট–‌দুনিয়ায় ঝড় উঠেছে বড়িশার সৃষ্টি নিয়ে। অসামান্য ওই ভাস্কর্যের ছবি দিয়ে টুইট করছেন রবিনা ট্যান্ডন, ঊর্মিলা মাতন্ডকর, টিসকা চোপড়া। সায়নী গুপ্তা চমৎকার লিখেছেন, ‘‌এই জন্যই বাংলার দুর্গাপ্রতিমা যোজনখানেক এগিয়ে থাকে। এগিয়ে থাকে সৃজন, একাত্মবোধে। এটাই শিল্প।’‌
হ্যঁা, এই অখ্যাত শিল্পীরাই বাংলার অহঙ্কার। তঁাদের আমরা লালন করি প্রতিটি বারোয়ারির মণ্ডপে, বছরের পর বছর। এক একটা অসামান্য ইনস্টলেশন আর্ট সফল করে তুলতে তিন থেকে চার মাস নাওয়া–‌খাওয়া ভুলে লেগে পড়েন ক্লাবের সদস্যরা। ক্লাব সম্পর্কে যঁারা কটূক্তির বান বইয়ে দেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, তঁারাই আবার চাপা গলায় ভিআইপি পাশ খেঁাজেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, বহু বিদেশি এই সব বারোয়ারির সমাজসেবার কাজের খেঁাজখবর নেন, ছবি তোলেন, নোট রাখেন। গ্রন্থাগার, দাতব্য চিকিৎসালয়, ব্যায়ামাগার— এসব বাংলার ঐতিহ্য। কারা বঁাচিয়ে রেখেছে?‌ ক্লাব, ক্লাব, ক্লাব। বাংলার সব ক’‌টা ক্লাব সারা বছর সমাজসেবায় কত খরচ করে, খেঁাজ নিয়েছেন কেউ?‌ কোনও গবেষণা হয়েছে?‌ না হয়ে থাকলে, হোক। ক্লাবের জলসায় কত শিল্পীর অন্নসংস্থান হয়, কেউ হিসেব কষেছেন?‌ কষে দেখুন। লকডাউনে ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় কত মানুষ পেট ভরে খেতে পেয়েছেন, কেউ হিসেব নিয়েছেন?‌ নিতে পারেন। রিন্টুকে ধন্যবাদ, খালি চালের বস্তাকে প্রতীক হিসেবে রেখেছেন।
হ্যঁা, একটু দেরি হল বিকাশ ভট্টাচার্যের প্রসঙ্গে আসতে। রিন্টুর প্রেরণা প্রয়াত শিল্পীর দুর্গা সিরিজের একটি ছবি। আটপৌরে মহিলার কপালে তৃতীয় নেত্রটি বসিয়ে তঁাদের দেবী করে তুলেছিলেন বিকাশ। সেই সিরিজের ‘‌দর্পময়ী’‌ ছবিটিই রিন্টুর রেফারেন্স। সন্তান কোলে সীমান্তে বর্ডার সিকিউরিটির হাতে ধরা–‌পড়ে–‌যাওয়া এক মায়ের ছবি। প্রায় একত্রিশ বছর আগে অঁাকা একটি ছবিতে যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল, বিকাশ–‌গণেশ–‌শ্যামলদের প্রজন্মকে একটি ট্রিবিউট বইকি!‌ বিখ্যাত সাহিত্যপত্রিকার প্রচ্ছদে, আর্ট গ্যালারিতে, চিত্র–‌সমালোচনার কলামে সীমাবদ্ধ–‌থাকা শিল্পকে সাধারণ মানুষের মুঠোর মধ্যে এনে দিয়েছেন রিন্টুদের পূর্বসূরিরা। দেখার চোখ তৈরি হয়েছে, ফর্মের ভাঙাচোরা, দুঃসাহসী কাজকর্মকে উৎসাহ দিতে পারে বাঙালি।
ভাল লাগছে বড়িশার সৃষ্টি এই স্বীকৃতি পেল বলে। সচেতন ভাবে বড়িশার সৃষ্টি লিখলাম, দু’‌বার। বিতর্ক হতেই পারে, তবে আমার জ্ঞানত প্রথম থিমপুজো করেছিল সৃষ্টি। বর্ধমানের কাঠপুতুল ছিল মূল ভাবনা, শিল্পী অমর সরকার। অসামান্য প্রতিমা করল ভবতোষ সুতার। অন্যতম উদ্যোক্তা শৈবাল বসুর (‌পুপু)‌ ডাকে হাজির হয়েছিলাম। অনেক রাত। গান ধরল ভব। একে একে হাজির নির্মল মালিক, আরও অনেক শিল্পী। সেবার বোধ হয় একটা থিম–‌গান হয়েছিল, আমাদেরই এক বন্ধু সাংবাদিকের লেখা। একটু দূরের মাঠে বড়িশা ক্লাবের পুজো। পরে দুই পুজো মিশে গেছে। বড়িশা কলকাতার অন্যতম প্রাচীন পাড়া। সেই পাড়াতেই কিন্তু থিম–‌নিরীক্ষার শুরু।
সবই ভাল বাঙালির?‌ এমন হলে ল্যাঠা চুকে যেত। একে অন্যের ভাল কাজের প্রশংসা করে বাঙালি?‌ যত প্রশংসা করে তার থেকে বেশি খুঁত কাটে। গোদের ওপর বিষফোড়া গৈরিক আইটি সেল। শুরু হয়ে গেছে বিষাক্ত প্রচার। ফ্রান্সের ঘটনাটির অনুষঙ্গ টেনে লেখা ‘‌হিন্দুর শ্রদ্ধায় আঘাত করা কত সোজা!‌ মা দুর্গা এখানে পরিযায়ী শ্রমিক। গলা কাটার ভয় পুজো–‌উদ্যোক্তাদের একদমই নেই। তবুও ভারত অসহিষ্ণু।’‌ ধর্মীয় ভাবাবেগ নিয়ে ছেলেখেলার অভিযোগ উঠছে!‌ ভাবা যায়!‌ থিমপুজোই নাকি বন্ধ করে দেওয়া উচিত। মামদোবাজি!‌ বলা যায় না, এর পর মহামহিম হয়তো এই সব আবদার ট্যাগ করে টুইট করতে থাকবেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা পৌঁছে গেল গোটা দুনিয়ায়!‌ পঁাচকান হয়ে গেল যে!‌ উফ্‌, দাদা, বড্ড লেগেছে!

জনপ্রিয়

Back To Top