অসমে ‘‌রাষ্ট্রহীন’‌ হলেন ১৯ লক্ষ ৬ হাজার মানুষ। হাহাকার। বিজেপি–‌র অপকীর্তি। তবু ওরা ক্ষুব্ধ কেন?‌ অসমের বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলছেন, ‘‌আমাদের ধারণা রাজ্যে অন্তত ১ কোটি অ–‌নাগরিক আছে। সংখ্যাটা ১৯ লাখে নেমে আসা মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। সরকার ভাবছে, কী করা যায়।’‌ বিজেপি–‌র সমস্যা, প্রাথমিক টার্গেট ছিলেন মুসলিমরা, কিন্তু যা দাঁড়িয়েছে, ওদের বিপাকে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট।
১৯ লক্ষের মধ্যে প্রায় ১ লক্ষ গোর্খা। কোনও পরিবারের সদস্য সেনাকর্মী, অনেকে চা–‌বাগানের দক্ষ কর্মী। বহু বহু বছর ধরে অসমবাসী। বিমল গুরুং পর্যন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছেন, মানা যায় না। কিন্তু গাঁটছড়া, অসংখ্য অপরাধ থেকে বাঁচার একমাত্র তাবিজ বিজেপি নেতাদের আশীর্বাদ। কিন্তু সাধারণ পাহাড়বাসী?‌ তাঁরা কি বুঝছেন, জাতিসত্তার আবেগে যাঁরা ভোট নিয়ে গেলেন, তাঁরা গোর্খাদেরও শত্রু?‌ ১৯ লক্ষের মধ্যে কয়েক হাজার বিহার ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা। সাড়ে ১৭ লক্ষের বেশি বাঙালি। ৯০ শতাংশের বেশি। হিন্দু হতে পারেন, মুসলিম হতে পারেন, বাদ পড়ার কারণ, গেরুয়া চক্রান্তের ভিত্তি, ওঁরা বঙ্গভাষী। ভাষিক সংখ্যালঘু। ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে তো বাঙালিরাই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন, শুধু একটা অপরাধে, তাঁরা বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবিতে অটল ছিলেন। বাঙালিদের, বাংলাভাষীদের ভেতরে–‌ভেতরে শত্রু মনে করে বিজেপি, তার সঙ্গে সঙ্কীর্ণ প্রাদেশিকতা মিশেছে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের পরিবার ‘‌বিদেশি’‌!‌ তাহলে কি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ‘‌বিদেশি’‌ ছিলেন?‌ কারগিল–‌যোদ্ধা ক্যাপ্টেন সানাউল্লা বাদ। তিনি ‘‌বিদেশি’‌? অমিত শাহর ভাষায় ঘৃণ্য ‘‌উইপোকা’‌?‌‌‌
অসম বিজেপি–‌র অনেক নেতা সমালোচনায় মুখর, কারণ, মূল টার্গেট ছিলেন সংখ্যালঘুরা। হিসেব কী বলছে?‌ যে সাড়ে ১৭ লক্ষ বঙ্গভাষী বাদ পড়লেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫৪ শতাংশ হিন্দু। আমরা হিন্দু–‌মুসলিম ভেদাভেদ করি না। কিন্তু, বিজেপি–‌র হিন্দু–‌প্রচারের মুখোশটাও তো খোলা দরকার।
তালিকা অতি দীর্ঘ। আমরা কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরছি। গোঁসাইগাঁও। কোচবিহার থেকে ‌বন্দনা সেনগুপ্ত অনেক বছর আগে যান অসমে, বিয়ের সূত্রে, সেই পরিবার বহু বহু বছর ধরে অসমবাসী। নথি স্পষ্ট। তবু বন্দনা বাদ। ধুবড়ির পোদ্দার পরিবার। ৫২ বছর আগের জমির দলিল আছে। বসবাস তারও আগে থেকে। পরিবারের অধিকাংশই বাদ। গুয়াহাটি। ব্যবসায়ী স্বপন সোম তালিকায়, কিন্তু মা ‘‌বিদেশি’‌। বিপিন মণ্ডল তালিকায়। স্ত্রী ‘‌বিদেশি’‌। নথি?‌ পরিষ্কার। তবু বাদ। এআইইউডিএফ বিধায়ক অনন্ত মালোরের পরিবার যে অসমে আছেন, ১৯৬৪ থেকেই অসমবাসী, নথি আছে। বাদ। রাধাকৃষ্ণ সরস্বতী। ব্রিটিশ আমলে অসম থেকে তসর, মুগা সিল্ক রপ্তানি করেছেন। সমাজসেবা করেছিলেন, স্কুল গড়েছিলেন। তাঁর পরিবার ‘‌রাষ্ট্রহীন’‌। শিলচর। নমিতা দত্তর স্বামী প্রীতিভূষণ ডিটেনশন সেন্টারে মারা গেছেন। ৫১ বছর অসমে, স্বামীহারা নমিতারও নাম নেই। গুয়াহাটি। গোকুলচন্দ্র সাহা। তাঁর ছেলে তালিকায়। তিনি বাদ। হাইলাকান্দি। সাবিত্রী রায়ের পরিবারের দু’‌জন আছেন, তিনি ও কয়েকজন বাদ। বোন আছেন, ভাই নয়, ভাই আছেন, বোন নয়, এমন উদাহরণও বহু। রায়বাহাদুর কালীচরণ সেন, দুটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাদ। গুয়াহাটি। শম্ভু মজুমদার প্রায় ৫০ বছর ধরে অসমে থাকেন। বাদ। গুয়াহাটিতেই দে–‌পরিবারের ১৫ সদস্য, ৯ জন বাদ। পাঠক, আপনি কি দীর্ঘ তালিকা পড়ে বিরক্ত ও ক্লান্ত?‌ হতে পারে, তাই মাত্র কয়েকটা নাম দিলাম। যে–‌সাড়ে ১৭ লক্ষ বঙ্গবাসী ‘‌রাষ্ট্রহীন’‌ হলেন, তাঁদের অবস্থাটা ভাবুন। হ্যাঁ, বাংলার কথাও ভাবুন।
এনআরসি–‌সন্ত্রাসে আত্মঘাতী হয়েছেন এ পর্যন্ত ৭২ জন বাঙালি। যে–‌বিজেপি নোটবন্দির পর লাইনে দাঁড়িয়ে ১০৪ জনের মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছে, তাদের কিছু বলার নেই। ওরা এরকমই। পাঠক ও পাঠিকা, বাঙালি, ভাববেন তো?‌ অমিত শাহ থেকে দিলীপ ঘোষ, এমনকী কুচো নেতারাও বলে যাচ্ছেন, বাংলায় এনআরসি হবে। কত আত্মহত্যা?‌ যে সব নথিপত্র চাওয়া হল অসমে, যথা জন্মনথি, সবার কাছে থাকে?‌ ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড— সব দিয়েও অনেক বাঁচবেন না। অসমে নথি জমা দিয়েও বাদ, কারণ, কর্তৃপক্ষের মতে তা গ্রহণযোগ্য নয়। অসংখ্য নথি সবার কাছে থাকা সম্ভব?‌ তাড়া করছে আতঙ্ক। প্রাথমিক তালিকায় নাম না থাকলে দৌড়তে হবে নানা কেন্দ্রে কর্তৃপক্ষের কাছে। সব কাজ ফেলে, অনেক খরচ করে, পৌঁছতে পারবেন গরিব মানুষ?‌ মধ্যবিত্ত বাঙালিও ভাবুন, আপনার পরিবারের দু’‌জন অক্ষত, তিনজন ‘‌রাষ্ট্রহীন’‌, মানতে পারবেন?‌
গোর্খাদের ভোট মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেনেছে বিজেপি। আর, দক্ষিণবঙ্গে, বনগাঁ, ও রানাঘাট লোকসভায় জিতেছে মতুয়াদের এই ভুল বুঝিয়ে, যে, সর্বনাশ হবে মুসলিমদের, হিন্দুরা নিরাপদ, আরও ভাল থাকবেন। অসমের অভিজ্ঞতা কী বলছে?‌ দেশের আসল শত্রুদের কাছে সব মানুষ শত্রু। মুসলিমরা, হিন্দুরাও। নির্বিকার থাকবেন বঙ্গবাসী, বঙ্গভাষী?‌ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার একটি লাইন:‌ ‘‌নিরপেক্ষ থেকে আর চিত্তে নেই সুখ।’ চিত্তে সুখ নিয়ে বসে থাকবেন?‌ এখনও ভাববেন না, ‘‌নিরপেক্ষ’‌ থাকা যাবে না?‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top