তাপস গঙ্গোপাধ্যায়- স্বয়ং মা–‌ও দুধ দেয় না শিশু না কাঁদলে। কারণ মা জানবেন কী করে শিশুর খিদে পেয়েছে কিনা?‌ তাই মডেল থেকে অভিনেতায় পরিণত বা রূপান্তরিত পায়েল রোহতগি যখন তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পেজে আধুনিক ভারতের (‌শুধু বাংলার নয়)‌ জন্মদাতা রাজা রামমোহন রায়কে বলেন ‘‌ব্রিটিশের ‌ল্যাকি’‌ (‌সাদা বাংলায় ‘‌চামচা’‌)‌ এবং তিনি নাকি ব্রিটিশদের তুষ্ট করার জন্যই সতীদাহ রদ করতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, তখন ওই মডেল–‌অভিনেতাকে নয় আমাদের ধিক্কার দিতে হয় নিজেদের। কারণ গান্ধী–‌নেহরু–‌প্যাটেল বা সম্প্রতি নেতাজি নিয়ে গত ১০০ বছর যে ইন্টেলেকচুয়াল আলোড়ন হয়েছে এ দেশে তার শত ভাগের এক ভাগও হয়নি আধুনিক ভারতের জন্মদাতা রামমোহনকে নিয়ে। আমাদের স্কুল পাঠ্য বইগুলিতেও তাঁর উল্লেখ অতি সামান্য, যেন সতীদাহ–‌র মতো একটি নিষ্ঠুর অন্যায়–‌অত্যাচার–‌অবিচার রদ করার সলতে পাকানোই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ।
ভাবতেও অবাক লাগে তাঁর মৃত্যুর (‌১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ২৫ মিনিটে)‌ ৫০ বছরের মধ্যে না তাঁর কোনও জীবনী গ্রন্থ, না তাঁর রচনাবলী প্রকাশের কোনও চেষ্টা কোনও ভারতীয় করেছেন। একটা প্রবাদ আছে ভারতীয়রা, বিশেষত বাঙালিরা তখনই কোনও স্বদেশবাসীর মহত্ত্ব বুঝতে পারে যখন কোনও বিদেশি তাঁর সার্টিফিকেট লেখেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে বিদ্যাসাগরের নাতি সুরেশ সমাজপতি থেকে বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বছরভর ঠাকুরের নিন্দামন্দ করাই তাঁদের জীবনের ব্রত করেছিলেন। সত্যজিতের পথের পাঁচালীর স্বীকৃতি আসে নিউ ইয়র্কের MOMA‌ থেকে। রবিশঙ্কর ও আলি আকবর বিদেশে পসার জমাতে না পারলে এবং প্রথম জন ‘‌বিটল’‌ জন লেননের গুরুপদ গ্রহণ না করলে আজ তাঁদের কে চিনত?‌ সত্যেন বসুর স্বীকৃতির পথ প্রশস্ত করেছিলেন স্বয়ং আইনস্টাইন। ঠিক একইভাবে রাজা রামমোহনকে আমরা প্রথম চিনি মেরি কার্পেন্টারের বই ‘‌লাস্ট ডেজ অফ রামমোহন রায়’‌ পড়ে। বইটি বেরোয় ১৮৬৬–‌তে, রাজার মৃত্যুর ৩৩ বছর পরে। আর দ্বিতীয় যে বইটি রামমোহন কেন আধুনিক ভারতের প্রথম অগ্রদূত সম্পর্কে আমাদের চোখ ধুইয়ে পরিষ্কার করে সেটি হল ‘‌লাইফ অ্যান্ড লেটারস অফ রামমোহন রায়’‌।‌ লেখিকা সোফিয়া ডবসন কলেট। ১৯০০ সালে রাজার মৃত্যুর ৭৭ বছর পরে বইটি প্রকাশিত হয়।
রামমোহনের মৃত্যুর ৫ মাস পরে সে সংবাদ কলকাতায় পৌঁছলে টাউন হলে ৫ এপ্রিল, ১৮৩৪ একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন তখনকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি স্যার জন গ্র‌্যান্ট। রাজার স্মৃতি রক্ষার জন্য সেখানেই একটি কমিটি হয় এবং চাঁদা ওঠে আট হাজার টাকা। তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল বেন্টিঙ্ক, যিনি রাজার প্রণোদনায় সতীদাহ বন্ধ করেন। হিন্দু কলেজে তাঁর নামে একটি অধ্যাপক পদ সৃষ্টির জন্য এককালীন পাঁচশো টাকা দেন, পরে আরও দেবেন বলেন। না সেই অধ্যাপক পদ হয়নি। কোনও স্মৃতিস্তম্ভও নয়। ওই টাকার আর কোনও হদিশ মেলেনি।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর ‘‌বাঙ্গালার ইতিহাসে’‌ লেখেন ‘‌রামমোহন রায় একজন অসাধারণ মনুষ্য ছিলেন, সন্দেহ নাই।’‌ কিন্তু কোথায় তাঁর অসাধারণত্ব তার কোনও বিশ্লেষণ করেননি।‌ আর বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, ‘‌মহাত্মা রামগোপাল ঘোষ ও হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বাঙ্গালা দেশ বাৎসল্যের প্রথম নেতা বলা যাইতে পারে। ঈশ্বরগুপ্তের দেশ বাৎসল্য তাঁহাদিগেরও কিঞ্চিৎ পূর্বগামী।’‌ মরেও রেহাই পাননি রামমোহন। তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষে ১৯৩৩ সালে শনিবারের চিঠি এবং তার প্রধান রচয়িতা সজনীকান্ত দাস, মোহিতলাল মজুমদার, ড.‌ সুশীল কুমার দে প্রমুখ কোমর বেঁধে নামলেন তাঁকে হেয় করতে। তবে এবার নিন্দুকরা সহজে রেহাই পাননি। প্রভাতচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়, যোগানন্দ দাস, রমাপ্রসাদ চন্দ, অমল হোম এবং আরও অনেকে শনিবারের চিঠির মোরগের ঝুঁটি ধরে নাড়া দেন পাল্টা প্রবন্ধের বন্যায়।
এদেশের কমিউনিস্টরা চিরদিনই দেশবরেণ্য নেতাদের অপমান করায় অভ্যস্ত। ১৯৪৮‌ থেকে ১৯৫১ এদেরই বিভিন্ন পত্র–‌পত্রিকায় রবীন্দ্র গুপ্ত ছদ্মনামের আড়ালে ভবানী সেন রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ কাউকে রেহাই দেননি। বুর্জোয়া, ‘‌শাসকদের ‌তল্পিবাহক’‌ এই ছিল ওই অসামান্য পণ্ডিত কমিউনিস্টের লেখার মূল উপজীব্য। কালের স্রোতে ভবানী সেনরা আজ কোথায়?‌ তাঁদের তাত্ত্বিক বংশধরদের মূল আশ্রয় ওই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথরাই।
ভবানী সেনদের চিন্তাধারার ফসল আমরা দেখেছি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৪–‌এর মধ্যে যখন নকশালরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা রাস্তার মোড়ে জাতির যুগন্ধর পুরুষদের মূর্তি ভাঙা উৎসবে মেতে ওঠে। সেই ট্র‌্যাডিশন যে শেষ হয়নি, তার সর্বশেষ প্রমাণ আমরা কলকাতার বুকেই দেখেছি, ২১ মে কলকাতায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর রোড শো–‌এর চূড়ান্ত পর্যায়ে আবার বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভাঙার মধ্য দিয়েই।
তাই মডেল থেকে অভিনেতা পায়েল রোহতগিকে যদি বলি রাজপুতনার ‘‌জহর’‌ ব্রত বা অগ্নিকুণ্ডে রাজপুত রমণীদের ঝাঁপ দেওয়ার মধ্যে উনি যে সতীত্ব খুঁজে পেয়েছেন তার ছিটেফোঁটাও ছিল না পরবর্তী পর্বে সতীদাহের মধ্যে। রামমোহন নিজের বড়দা জগমোহনের মৃত্যুর পর পরই দেখেছেন কীভাবে অন্য আত্মীয়রা তাঁর বিধবা বৌদিকে মেরে ধরে, বাঁশপেটা করে সহমরণের চিতায় যেতে বাধ্য করে। রাজা তখন কলকাতায়। এই শহরে দুটি বাড়ি ছাড়াও ছিল তার বাগানবাড়ি। কলকাতা তখন ব্রিটিশ ‌ভারতের রাজধানী। অসহায় সদ্য বিধবাদের সম্পত্তির অধিকার বঞ্চিত করার জন্যই পুরুষ আত্মীয়রা একের পর এক সতীদাহের আয়োজন করতেন। রাজার পরামর্শে গভর্নর জেনারেল উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক‌ সতীদাহ বন্ধ করার আইন পাশ করার আগে, খোদ কলকাতা, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া প্রভৃতি কলকাতার আশপাশের বিভিন্ন জেলায় বছরে কত সতীদাহ হয় তার রিপোর্ট নেন। কেন হয় তার কারণও নেন সাহেব কালেক্টরদের ওইসব রিপোর্ট থেকে। সর্বোপরি রামমোহনের পরামর্শ। পায়েল সম্ভবত জানেন না, গভর্নর জেনারেল বেন্টিঙ্কের দূত রামমোহনের বাড়িতে গিয়ে ১৯২৮ সালে যখন বলেন, গভর্নর জেনারেল তাঁকে তলব করেছেন, তখন রামমোহন তাঁকে বলেন, ১৪ বছর আগে সরকারি কাজে ইস্তফা দিয়েছি, তাই আর কোনও সরকারি কাজে নিজেকে জড়াব না।
দূত ফিরে গিয়ে বেন্টিঙ্ককে সে কথা বললে, গভর্নর জেনারেল তাঁকে বলেন, তুমি আবার যাও এবং গিয়ে বলো সতীদাহের মতো জরুরি বিষয়ে তাঁর মতামত আমি চাই। দূত দ্বিতীয়বার এসে একথা জানালে রামমোহন সম্মত হন, এবং নির্দিষ্ট সময়ে লর্ড ওয়েলেসলির বানানো কলকাতার বর্তমান রাজভবনে গিয়ে দেখা করেন বেন্টিঙ্কের সঙ্গে। তারপর তো ইতিহাস। না জেনে, রোহতগিরা যার সম্বন্ধে এসব কথা বলছেন, তিনি আজ জীবিত থাকলে নিশ্চয় বলতেন, ‘‌ঈশ্বর এদের মার্জনা করুন।’‌‌‌‌

রাজা রামমোহন রায়

জনপ্রিয়

Back To Top