যাঁরা নবনীতা দেবসেনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন, নানা বয়সি, মুগ্ধ ছিলেন এবং থাকবেন তাঁর প্রাণবন্ত আচরণের জন্য, যা একটুও লোক–‌দেখানো নয়, নিখাদ, আন্তরিক। সেই মানুষটি প্রয়াত হলেন ৮১ বছর বয়সে। শেষ কয়েকটা মাস গভীর অসুস্থ ছিলেন, তবু মৃত্যুভয় তাঁকে বিচলিত করেনি। জীবনের জয়গান। রেখে গেলেন সেই জীবনের উত্তরাধিকার। আর, কীর্তি? সৃষ্টি?‌ সব দিক ভাবলে, বিস্মিত হতে হয়। বিখ্যাত দম্পতি নরেন্দ্র দেব–‌রাধারানি দেবীর কন্যা সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বহন করেছেন আজীবন। মেধাবী ছাত্রী, দুরন্ত অধ্যাপক। প্রেসিডেন্সি হয়ে পড়াশোনা করেছেন বিশ্ববিখ্যাত দুটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মাঝে, যাদবপুরে। বুদ্ধদেব বসু পত্তন করেছিলেন তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ। সেই বিভাগের উজ্জ্বল ছাত্রী। কলা বিভাগের সব বিষয়ের মধ্যে প্রথম স্থান পেয়েছেন। বিদেশের বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। চাইলেই পড়াতে পারতেন সেখানে। ফিরে এসেছেন মাটির টানে। যাদবপুরে তুলনামূলক সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে জ্ঞানের দিগন্ত খুলে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের কাছে। কবি–‌সাহিত্যিক নবনীতার প্রতিভা এতটাই প্রতিষ্ঠিত, যে, অন্য সত্তা তেমন প্রচারিত হয়নি। মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণে অমর্ত্য সেন কুর্নিশ জানিয়েছেন নবনীতার প্রতিভা, গবেষণাধর্মী মননের জন্যও। দেশ–‌বিদেশের কত বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন। অক্সফোর্ডে রাধাকৃষ্ণন বক্তৃতাতেও আমন্ত্রিত। এত কিছুর সঙ্গে এত সাহিত্য সৃষ্টি বিস্ময়কর। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‌প্রত্যয়’‌ থেকে শেষ কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত এক ভিন্ন জাতের কবি। প্রথম উপন্যাস ‘‌আমি অনুপম’‌ বাংলা সাহিত্যের এক স্মরণীয় কীর্তি। বহুমুখী প্রতিভা। ভ্রমণকাহিনিও অনবদ্য। ‘‌ট্রাকবাহনে ম্যাকমেহনে’‌ অবশ্যপাঠ্য। আর, ব্যক্তিগত গদ্যে অনতিক্রম্য। ‘‌ভালো–‌বাসার বারান্দা’‌–‌র শেষ লেখাতেও, প্রয়াণের এক মাস আগে লেখা, জীবন্ত, ও লড়াকু নবনীতা। তাঁর মৃত্যু নেই। ছিল জীবন, আছে বিপুল সৃষ্টি। শেষ প্রণাম।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top