নিশ্চয় খুশি। বিজেপি যেভাবে দেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার বুকে ছুরি মারছে, ওরা হারলে খুশি। শুধু সাম্প্রদায়িক দলের সরকার নয়, ভারতবাসীকে চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে–‌দেওয়া সরকার। হিংস্র এবং ব্যর্থ। সুতরাং, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আমরা খুশি। খুশি, দিল্লিতে কুৎসিত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অপচেষ্টা ব্যর্থ। শুধু তো অনুরাগ ঠাকুর, প্রবেশ শর্মারা নন, স্বয়ং অমিত শাহ জঘন্য ভাষায়, সংখ্যালঘু ও ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের আক্রমণ করেছেন। তবু ধরাশায়ী, আমরা খুশি। এনআরসি ও ক্যা–‌র একটা নমুনা পরীক্ষা হয়ে গেল। বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়ে ভোট দিলে ৭০–‌এ ৮ হতে পারে। আমরা খুশি।
অরবিন্দ কেজরিওয়াল দিল্লি মডেলের কথা বলছেন। অবশ্যই কিছু জনমুখী প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করেছেন। করে চলুন। কিন্তু, এই ‘‌মডেল’‌ গোটা দেশে চলবে না। জনমুখী উন্নয়নের রাজনীতি চলবে না?‌ নিশ্চয় চলবে। তবু, দিল্লি ‘‌মডেল’ হতে পারে না। ১ কোটি ৮৮ লাখ মানুষের শহরকেন্দ্রিক রাজ্য। অর্ধ–‌রাজ্য। ক্ষমতা কম, দায়িত্ব কম। পুলিশ হাতে নেই, অসুবিধা। সুবিধাও, কারণ পুলিশের কোনও ভুলের জন্য কৈফিয়ত দিতে হয় না। শহরকেন্দ্রিক রাজ্য, গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন, গ্রামবাসীদের কাছে উন্নয়নের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার দায় নেই। কার্যত উদ্বৃত্ত রাজকোষ। আবগারি–‌সহ কয়েকটি ক্ষেত্রে বিপুল আয়। বিদ্যুৎ, জলে ছাড়। স্কুলের উন্নতি। সবচেয়ে বেশি প্রচারিত। উদাহরণ, বেশ কয়েকটি স্কুলে সুইমিং পুল পর্যন্ত করা হয়েছে। গোটা দেশে এটা করার মতো জায়গায় আছে দেশের অর্থনীতি?‌
আইআইটি–‌র প্রাক্তনী, আইআরএস, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সূত্রে রাজনীতিতে আবির্ভাব। বিশেষত্ব অবশ্যই। কিন্তু, কেজরিওয়াল আর কোনও রাজ্যে, বড় রাজ্য ছেড়ে দিন, মাঝারি রাজ্যে এই ‘‌মডেল’‌ দিতে পারতেন?‌ ছোট, শহরকেন্দ্রিক রাজ্য। উদ্বৃত্ত রাজকোষ। এই সুবিধা আর কোনও রাজ্যে দিতে পারতেন?‌ বড় রাজ্য, কেন্দ্রের অসহযোগিতা, চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও উন্নয়নের মূল মডেল দাঁড় করানো যায়, দেখাচ্ছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ৫৮টি দারুণ জনমুখী প্রকল্প সেই সত্যের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে। একটু পেরেছেন তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও। যদিও তাঁকে কেন্দ্রের অবিরাম অসহযোগিতার মোকাবিলা করতে হয়নি। কেজরিওয়াল ভাল কাজ করে চলুন, কিন্তু দিল্লি মডেলকে গোটা দেশের আদর্শ মডেল বলে চালানোর চেষ্টা যেন না করেন।
তাঁর মুখে তিনটি স্লোগান— ভারত মাতা কী জয়, বন্দেমাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সবই থাকল। প্যাকেজ। কিন্তু, ‘‌ভারত মাতা কী জয়’‌ স্লোগান তো এখন সাম্প্রদায়িক শক্তির স্লোগান হয়ে উঠেছে। ভারতকে ‘‌মাতা’‌ ভাবুন, কিন্তু অপব্যবহারের সূত্রে কথাটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে, অস্বীকার করতে পারেন?‌
ক্ষমতায় আসার পর ৪ বছর কেন্দ্রের সঙ্গে কার্যত সঙ্ঘাতে গিয়েছিলেন। দিল্লি পূর্ণ রাজ্য নয় জেনেই তো ভোটে নেমেছিলেন। পূর্ণ রাজ্যের দাবির কী হল?‌ কী হবে?‌ কিছুই হবে না। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী 
শুধু পথ অবরোধ করে বসে থাকেননি, অসহযোগিতার অভিযোগে ধর্না দিয়েছেন (‌উপ)‌‌ রাজভবনে এবং সঙ্গে পেয়েছেন মমতা–‌সহ তিন মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই 
লড়াইটার কী হবে?‌
শপথের পর ভাষণে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’‌ কথাটা একবারও উচ্চারণ করলেন না। বললেন, যাঁরা জঘন্য মন্তব্য করেছেন, তাঁদের ‘‌মাফ’‌ করে দিলাম!‌?‌ বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক শক্তি ও প্রচারের বিরুদ্ধে ভোট দেবে দিল্লিবাসী‌, আর মাফ করে দেওয়ার অধিকারী তিনি একা?‌ এটা নতুন 
রাজনীতি?‌ মডেল?‌
আপ সূত্রে বলা হচ্ছে, এবার নানা রাজ্যে শক্তিশালী হতে চাইছেন অরবিন্দ। বেশ। ২০১৪ সালে বারাণসীতে খোদ মোদির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, শিক্ষিত, স্বচ্ছ, ‘‌নতুন’‌ রাজনীতির সূত্রে বাজিমাত করে দেবেন। হলে খুশি হতাম, হয়নি, হওয়া সম্ভব ছিল না। তিনটি রাজ্যে বাড়তে চেয়েছে আপ। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, গোয়া। কোনও স্থানীয় নেতাকে সামনে আনেননি। গোয়াতে কিছু হয়নি। এমনকী, দিল্লির প্রতিবেশী হরিয়ানাতেও না। পাঞ্জাবে ২০১৪ লোকসভা ভোটে ৪টি আসন পেয়েছিল আপ। এখন ১। সেই একজন ভগবৎ সিং মান জনপ্রিয়, কিন্তু তাঁকেও সামনে 
রাখা হয়নি।
যে–‌কোনও পথে রাজনীতি করতে পারেন। কিন্তু অ–‌রাজনীতির কথা গ্রহণযোগ্য?‌ চাই ভাল রাজনীতি, ভাল রাজনীতিক। কেজরিওয়াল যেন রাজনীতি–‌বর্জিত ‘‌রাজনীতি’‌ চাইছেন। হয় না। বিপুল বিচিত্র ভারতবর্ষে বহুত্ব না বুঝলে মানুষের ভাল করা যায় না। কেজরিওয়াল অর্ধ–‌রাজ্যে অর্ধ–‌মডেল তৈরি করুন, কিন্তু বিশাল দেশের মানুষের চাহিদা ও যন্ত্রণার সঙ্গে থাকতে না–‌পারলে চলবে?‌ চলবে, দিল্লির মতো ছোট, উদ্বৃত্ত রাজকোষের অর্ধ–‌রাজ্যে। রাজনৈতিক অবস্থান ও সংগঠন না থাকলে কী হয়?‌ ২০১৪ ও ২০১৯ সালে 
লোকসভা ভোটে দিল্লির একটি আসনও পায়নি 
মুখ্যমন্ত্রীর দল।
ভোটে জিতেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। বেশ করেছেন। দেখা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও। বেশ। কিন্তু, নরেন্দ্র মোদির, এমন প্রধানমন্ত্রীর ‘‌আশীর্বাদ’‌ চেয়ে বসলেন?‌ কার আশীর্বাদ, যিনি এবং যাঁরা দেশটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছেন?‌ ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছেন?‌ একটু কড়া শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে, ‘‌বিশ্বাসঘাতকতা’‌ হল না দিল্লির সেই মানুষদের সঙ্গে, যাঁরা সাম্প্রদায়িক–‌মেরুকরণের বিরুদ্ধে সাহসী রায় দিয়েছেন?‌ ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top