দেবর্ষি ভট্টাচার্য

শুধু বিহার নয়, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মিমের উত্থান ও তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর স্থায়ী ভোট ব্যাঙ্কে ভাগ বসিয়ে আখেরে বিজেপি–র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির হাত শক্ত করার কানাঘুষো নিয়ে তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। কিন্তু মিম কি আদৌ ধর্মনিরপেক্ষ ভোট বাক্সে ভাগ বসাল, নাকি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির খুল্লামখুল্লা হাটে সুযোগসন্ধানী পসরা বিছিয়ে বসল? এ কথা সত্য, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো এতদিন পর্যন্ত যে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ককে নিজেদের আমানত বলে নিশ্চিন্তে বসেছিল, সেই মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের একটা অংশ নিশ্চিন্তিপুরের পকেট ফুঁড়ে সাম্প্রদায়িক উস্কানির হাতছানিতে মিমের দিকে ঢলে পড়েছে। তাতে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর কপাল পুড়লেও বিজেপি–র এগিয়ে চলার পথ নিশ্চিতভাবে সুগম হয়েছে। এমনভাবে চলতে থাকলে আগামিদিনে বিজেপি–র এগোনোর পথ যে আরও মসৃণ হবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিপজ্জনক অঁাচের উত্তাপ আগাম অনুমান করে কেউ কেউ মিমকে বিজেপি–র বি টিম বলতেও কসুর করছে না। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরিখে আসলে কি তাই? বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে মিমের উত্থান নিঃসন্দেহে লক্ষণীয়। তবুও, বিহারে রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে কার্যকর ভূমিকা নেওয়াই কি মিমের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল? নাকি দেশের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে অন্য কোনও ইঙ্গিতবহ সমীকরণ সংগঠিত করাই ছিল তাদের আসল লক্ষ্য?
ভারতের এখনকার ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মিমের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক দলের উত্থান বোধহয় অবশ্যম্ভাবী ছিল। অদূর ভবিষ্যতে দেশ জুড়ে মিমের উত্থানের ব্যাপ্তি যদি আরও অনেকটাই ছড়িয়ে যায়, তবে আদৌ অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে কি? কারণ মিমের এই উত্থানের সঙ্গে ভারতের ভোট সর্বস্ব ও ভোট ব্যাঙ্ক নির্ভর রাজনীতির প্রভাব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মুসলিম লিগের মতো শতাব্দী প্রাচীন সাম্প্রদায়িক দল স্বাধীন ভারতে যে কাজটা করতে ব্যর্থ হয়েছিল, কোন রসায়নে মিমের মতো একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আঞ্চলিক দল সেই কাজে এতখানি এগোতে পারল? শুধুমাত্র ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক আবহকে দায়ী করলেই কি এই রহস্যের উন্মোচন সম্ভব? নাকি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের সঙ্গে সঙ্গে বিগত দিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে মিলিয়ে দেখলে তবেই পাওয়া যেতে পারে এই বিপজ্জনক রহস্যের প্রকৃত উৎস?
দেশের সংখ্যাগুরু ভোটের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ যদি আরএসএসের মতো সাম্প্রদায়িক সামাজিক সংগঠনের রাজনৈতিক সংস্করণ বিজেপি–র দিকে মেরুকৃত হতে পারে, তবে দেশের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু ভোটাররা নিজেদের ‘কমফোর্ট জোন’ খুঁজতে সচেষ্ট হলে আশ্চর্যের কিছু নেই। এ কথা সত্যি, গত দেড় দশক ধরে চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির দাপটে দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমরা অনেকটাই কোণঠাসা। দিশেহারাও বটে। তারও আগে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর ও তাদের পরিচালিত সরকারের দ্বিচারিতায় মুসলিমরা নিজেদের সযত্নে লালিত ভোট ব্যাঙ্কের বেশি অন্য কিছু ভাবার অবকাশ পায়নি। যার নিট ফল হল, ভারতের মুসলিমদের চরম ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’। আর এই ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের’ স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্সের’ উত্থান কিন্তু অবশ্যম্ভাবী ছিল। মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্সের’ মিথের স্রোত এসে মিলতে শুরু করেছে মিমের চরম সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের উদ্দাম সমুদ্রে। ঠিক যে কারণে মুসলিমদের আশঙ্কার স্রোত এসে জমা পড়ছে মিমের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির ভোট বাক্সে। 
মুসলিমদের মানসিকতার, শিক্ষার, আর্থসামাজিক অবস্থার প্রকৃত উন্নতির লক্ষ্যে দশকের পর দশক ধরে আসলে কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। এমনকী, ৩৪ বছরের বামপন্থী সরকারেরও টনক নড়তে প্রায় ৩০ বছর লেগেছিল! ভাগ্যিস সাচার কমিটির রিপোর্ট এসেছিল! ধর্মনিরপেক্ষতার বীজমন্ত্র ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মনে গেঁথে দেওয়ারও নিরলস কোনও সৎ প্রয়াস কখনও দেখা যায়নি। বিজেপি–র উত্থানের সময়েও সেই গতানুগতিক উপাখ্যানই ভীষণভাবে অব্যাহত। 
দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো অটুট রাখার স্বার্থে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপি যতখানি বিপজ্জনক, অন্য মেরুর সাম্প্রদায়িক শক্তি মিম ততখানিই বিপজ্জনক। ভুল যা হওয়ার হয়ে গেছে। তা হলে এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্তির পথ কোথায়? বিহারের নির্বাচন হয়তো মুক্তির দাবানল হয়ে সব কিছু ওলটপালট করে দিতে পারেনি, মুক্তির স্ফুলিঙ্গ কিন্তু ফুটিয়েছে। জনসাধারণের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে যে মৌলিক ইস্যুগুলোকে সামনে রেখে রাজনৈতিক নির্বাচনে লড়া উচিত, সিপিআই (এমএল)‌ লিবারেশন–সহ অন্য বামপন্থী দলগুলো সেই ইস্যুগুলোর ওপর ভিত্তি করে ভোট চেয়ে বিহারে উল্লেখযোগ্য ফল করেছে। আমজনতার একটা অংশ কিন্তু বুঝতে পারছে, হিন্দু–মুসলমান নয়, জাতপাত নয়, মন্দির–মসজিদ নয়, মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানের লক্ষ্যে সকলের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপদ জীবনধারণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাটাই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মূল মন্ত্র। তাই প্রাণপাত করে জাতপাত, হিন্দু–মুসলমান, মন্দির–মসজিদের সাজানো লড়াইটার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ জীবনধারণের লড়াইয়ের সমীকরণের দিকে। তা হলে নিশ্চয়ই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির অশুভ চক্রব্যূহ থেকে ‘বহুজন সুখায় চ, বহুজন হিতায় চ’–এর এই মহামানবের দেশের পরিত্রাণ মিলতে পারে। অতীতের ভুলের মাশুল অনেকখানিই চোকানো হয়ে গেছে। হয়তো আরও অনেকটাই চোকাতে হবে। 
বিহারের নির্বাচনের ফলাফলের বিপজ্জনক দিকগুলোকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে সদর্থক দিকগুলোকে পাথেয় করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চিত্রনাট্য এখন থেকেই তৈরি করার ব্রতে মনোনিবেশ করা ভীষণভাবে প্রয়োজন। ভারতীয় সংবিধানকে রক্ষা এবং ভারত রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে আরও শক্তিশালী করার স্বার্থে উভয় সম্প্রদায়ের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে একজোট হয়ে বুঝে নিতে হবে ব্যবহারিক জীবনে কোনটার গুরুত্ব অগ্রাধিকার পাবে— মর্যাদাপূর্ণ বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ, নাকি মন্দির–মসজিদ তরজায় মেতে ওঠা? বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক ফলায় বিভাজনের হাত থেকে মুক্তির একমেবদ্বিতীয়ম পথের দিশা কিন্তু লুকিয়ে আছে এই সরল সত্যটা বুঝে নেওয়ার মধ্যেই।
লেখক ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড 
স্টাডিজের‌ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট‌

জনপ্রিয়

Back To Top