উদ্দালক ভট্টাচার্য

ওদের বয়স খুব কম। বাচ্চা ছেলেমেয়ে। স্কুলে পড়ে। ‘‌সুবোধ’ বালক–বালিকা। পড়াশোনা করে মন দিয়ে। মায়ের কথা মেনে চলে। স্কুলে পড়া না পারলে মাস্টারের হাতে মার খায়। লুকিয়ে প্রেমপত্র পাঠায়, ধরা পড়ে গেলে বাড়িতে কানমোলা, মা স্কেল ভাঙেন পিঠে। বিকেলে ওরা আঁকা শিখতেও যায় হয়তো। খুব সাধারণ ওরা। 
কই, না তো!‌ সাধারণ তো নয়।
ওরা সাধারণ যে নয়, তাঁর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল প্রথম দিনই। কেউ জানে না কোথায় এর শুরু। তবে বাঙালির ফেসবুক নিউজ ফিডে ফিরে ফিরে আসছিল একটা রক্তাক্ত স্কুল জুতোর ছবি। মনটা হুহু করে উঠবে যে–‌ছবি দেখলে। ‘‌সামান্য’‌ এক পথ–‌দুর্ঘটনা, ছাত্র–‌মৃত্যু। ‘এ আবার এমন কী, এ তো রোজই হয়!‌’‌ হয়তো হয়, কিন্তু তা বলে তো তা হতে দেওয়া যায় না!‌ ঢাকা না গেলেও যে–‌কেউ বলে দেবে সে–‌শহরের রাস্তাঘাট খিচুড়ি–‌পাকানো। পথ–‌নিরাপত্তা, সিগন্যালিং সিস্টেম, এ–‌সব ঢাকায় স্বর্গে উঠে বসে থাকে দিন–‌রাত। থিকথিকে ভিড়ে রাজধানীর এই প্রাণ যায়–‌যায় অবস্থা অনেক দিনের। তাই ছুটকোছাটকা দুর্ঘটনাও মাঝেমধ্যে হয়। খবরের কাগজে এক কলম স্থান পায় সেই মৃত্যুসংবাদ। কেউ কিচ্ছু বলে না। মা–বাবা কাঁদেন। বাকিরা চুপ।
২৯ জুলাই, রবিবার। একটি দুর্ঘটনায় কুর্মিটোলায় শহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। তার পর থেকেই উত্তাল হয় ঢাকার রাস্তা। না উত্তাল নয়, যেন প্রাণ ফিরে পায়। শুধু এই ঘটনাই নয়, বিক্ষোভে উঠে আসে গত এপ্রিলে দুই বাসের রেষারেষিতে প্রথমে হাত ও পরে প্রাণ–‌হারানো কলেজ–ছাত্র মহম্মদ রাজীব হোসেনের নামও। শুরু হয় বিক্ষোভ, মিটিং, মিছিল। প্ল্যাকার্ড হাতে নেমে পড়ে ছাত্ররা। তার পরেই ছাত্র আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবীরা। একের পর এক ফেসবুক পোস্টে একাধিক শিল্পী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের এই স্কুলপড়ুয়াদের সমর্থন করেন। প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি— সকলেই বার বার অনুরোধ করেছেন আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার। কিন্তু ছাত্ররা তা শোনেনি। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষার্থীদের দাবি, বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমে পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। পরিবহণ মন্ত্রীও জানিয়েছেন, ছাত্রদের সমস্ত দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। তবু, চলছেই আন্দোলন। অভিযোগ উঠেছে ছাত্র সংগঠন ছাত্রলিগের বিরুদ্ধে। স্কুলছাত্রদের আন্দোলনে তাঁরা নাকি লাঠি হতে চড়াও হয়েছে। অনেকটা বামফ্রন্ট আমলের চটি পুলিসের কায়দায় ছাত্রদের বেধড়ক মার মেরেছে। রটেছে পুলিসের গুলিচালনার কথাও। যদিও সরকার পক্ষ সেটিকে উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ফেসবুকে একাধিক স্কুলপড়ুয়ার রক্তাক্ত ছবি অবাক করার মতো। এক সপ্তাহ পরেও যে এই অন্দোলনের আঁচ একটুও কমেনি, তাঁর প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে শেষ রবিবারের মিছিলে। সেখানে লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া অংশ নিয়েছে, এমনকী অভিভাবকেরাও প্ল্যাকার্ড হাতে অংশ নিয়েছেন মিছিলে। অন্য দিকে পথ–‌নিরাপত্তা নিয়ে ছাত্রদের বিক্ষোভ আন্দোলনকে সমর্থন করে ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করার অপরাধে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট চিত্রসাংবাদিক শহিদুল আলমকে। রবিবার গভীর রাতে ধানমন্ডির বাসা থেকে কোনওরকম অভিযোগপত্র ছাড়াই গোয়েন্দা পুলিসের কয়েকজন প্রতিনিধি তাঁকে আটক করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের লোকেরা। যেন জরুরি অবস্থা চলছে। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে একাধিক স্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। তবু, সোমবারও যে ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা গিয়েছে, তাতে স্পষ্ট ছাত্রদের রাগ একটুও কমেনি। প্রায় সব দাবি মেনে নিলেও এখনও তাঁরা ভরসা করতে পারছে না প্রশাসনকে। রাস্তায় মিছিল দেখলে স্কুল–‌বাস দাঁড় করিয়ে সেখান থেকে ছুটে নেমে আসছে পড়ুয়ারা। পিঠে ব্যাগ নিয়ে মিশে যাচ্ছে মিছিলের।
নন পার্টিজান আন্দোলন নতুন কিছু না। আরব বসন্ত হয়ে বাংলাদেশের শাহবাগ, নন পার্টিজান গণ–আন্দোলনের একটা ধাঁচা তৈরিই আছে। বাংলাদেশের ছাত্র–‌মৃত্যুর প্রতিবাদে হওয়া আন্দোলন সেই ধাঁচাতেই পড়বে হয়তো। তবু এই আন্দোলন নতুন। 
প্রথমত, আন্দোলনকারীদের বয়স। এই বিপুল আন্দোলনে যাঁরা অংশ নিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই স্কুলপড়ুয়া। মানে ভোটাধিকার তাদের নেই। রাজনীতির ময়দানে নামার আইনি বৈধতাও হয়তো তাদের দেয় না রাষ্ট্রযন্ত্র। কিন্তু তারাও যে বিক্ষুব্ধ!‌ তাদের স্বর যে অন্য পাঁচটা স্বরের থেকে আলাদা, আপসহীন, বেয়াড়া, সেটা বোঝা রাষ্ট্রের প্রয়োজন ছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় কথা, এই স্কুলছাত্ররা সমাজের এমন নানা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেছে, যাদের কথা শোনার মতো লোক নেই। কিন্তু সেই সব চাপা–‌পড়ে–‌যাওয়া স্বর ঐক্যবদ্ধ হলে যে গোলমাল পাকতে পারে, সেটা মনে করিয়ে দিয়ে গেল এরা। 
এ ছাড়া, আরেকটা বড় দিক এই আন্দোলনের রয়েছে। কলকাতার ছাত্র আন্দোলনে ‘‌হোক কলরব’‌ বলে একটা স্লোগান উঠতে পারে, এ কথা আগে কেউ ভাবেনি। কলকাতার বামপন্থী, দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি সম্ভবত ২০১৫ সালের পর থেকেই তাই ভাবতে শুরু করেছে, এ যুগের স্লোগান ঠিক কী হবে?‌ মানে একই স্লোগানে, একই ফর্মের আন্দোলন যে আর গণজোয়ার তুলতে পারবে না, শুধু লিটল ম্যাগাজিনের ল্যাদলেদে ভাষা, লিফলেটের ভোঁতা মন্তব্যে যে চিঁড়ে ভিজবে না, সেটা কলকাতার বাজারে চাউর হয়ে যায় তখন থেকেই। ছাত্রনেতারাও সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেন। বাংলাদেশের শাহবাগ বা এই ‘‌বাস‌ চাপা’‌র বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনে তারই আরও একটু চরমপন্থী রূপ দেখা গেল। অহিংস, ধর্না, হরতাল, চাক্কা জ্যাম— সবই হচ্ছে। কিন্তু স্লোগানে, গানে প্রতিবাদের চেহারাটা একেবারে অন্য। কেমন?‌ একটি ছবি ফেসবুকে জনপ্রিয় হয়েছে, যেখানে লেখা আছে, ‘‌আমরা ন’‌টাকায় এক জিবি ডেটা চাই না, পথ–‌নিরাপত্তা চাই।’‌ হলফ করে বলতে পারি, এমন পোস্টার অধুনা বাংলাদেশের বড় কোনও রাজনীতিকের মাথা থেকে বেরোবে না। এ ছাড়াও স্ট্রিট আর্ট বা রাস্তায় লেখা পোস্টারে যে–‌বয়ান পড়ুয়ারা লিখেছে, তা দেখলে শালীনতার প্রশ্ন অনেকেই হয়তো তুলবেন, কিন্তু তাতে রাগটা পাল্টে যাবে না। শালীনতা আসলে একটা পুতুলের মতো। রাষ্ট্রসমাজ তাকে যেভাবে নাচায়, সে সেভাবেই নাচে। যা নিষিদ্ধ, তার ছাপ্পা তৈরি করা রাষ্ট্রেরই। তাই কোনও রাগের বহিঃপ্রকাশই শালীন হতে পারে না। কারণ, যেদিন সব সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, সেদিনই মানুষ রাগ করে। ভীষণ রাগ। আর সেই অসভ্য ঘটনার প্রতিবাদে শালীনতার বিচার করতে আসা শিক্ষকদের চুপ করিয়ে দেয়। যেমন ওরা করিয়েছে। ভাষা যে বড় অস্ত্র।‌ বলা যায়, সবচেয়ে বড় অস্ত্র।‌‌‌‌‌
ছবি: এএফপি

জনপ্রিয়

Back To Top