হাততালি থামান বন্ধুরা, ভাইবোনেরা, আমার লড়াকু যোদ্ধারা। কথা শুনুন। কত মামলা দিল, আমি বার্তা পাঠিয়েছি, ফিরছি, ফিরছি। ফিরলাম। এই তো চমৎকার দাঁড়িয়ে আপনাদের সামনে বলছি। আমাকে আটকে রাখার, পাহাড়ের বাইরে রাখার ক্ষমতা বেঙ্গল গভর্নমেন্টের নেই। সাজানো জিটিএ মানি না। বিনয়–‌অনীতরা বেঙ্গলের দালাল। সাত দিনে উড়িয়ে দেব। মোর্চা আমার। পাহাড় আমার। ফিরে এসেছি, এবার গোর্খাল্যান্ড এনে দেব (‌হ্যাঁ, এবার হাততালি দিন)‌।
●‌
গল্প, যদিও এরকমই ঘটবে বলে বার্তা পাঠিয়েছিলেন বিমল গুরুং, ভিডিও টেপে। রঙ্গিত নদীর ধারে যেদিন গুন্ডারা মেরে ফেলল তরুণ পুলিস অফিসার অমিতাভ মালিককে, কাছেই গুরুং ছিলেন। তারপর সিকিম। তারপর বোধহয় নেপাল। অবশেষে দিল্লিতে উদয়। দিল্লিতেই, কেন্দ্রের আশ্রয়–‌প্রশ্রয় আছে তো। সাংবাদিক সম্মেলন বা বিবৃতি পাঠ এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে, যাঁর সঙ্গে পাহাড়ের রাজনীতির যোগ আছে। এই মন্ত্রীই মামলার জেরে পলাতক রোশন গিরিদের আশ্রয় দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করিয়ে দিয়েছেন। বিমলের দিল্লিতে উদয় ষড়যন্ত্রের পর্দা সরিয়ে দিল। দিলীপ ঘোষরা পাহাড়ে গিয়ে সরাসরি গোলমাল পাকাতে গিয়ে তাড়া খেয়েছিলেন। কিন্তু এই মন্ত্রী মহোদয় পাকা খেলোয়াড়, খেলেছেন পর্দার আড়াল থেকে। তবে, পর্দার কাপড়টা খুব পাতলা, প্রায় মসলিন, সবই বোঝা গেছে।
১১ জানুয়ারি দিল্লিতে গুরুংজির সুর নরম, হুঙ্কার উধাও। ‘‌বাংলার প্রতি কোনও বিদ্বেষ নেই। অশান্তি চাই না। গোর্খাদের ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা চাই। রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চাই।’‌ একবারও ‘‌গোর্খাল্যান্ড’‌ শব্দটা ব্যবহার করলেন না পাতলেবাসের প্রাসাদবাসী একদা–‌পরাক্রান্ত নেতা।.‌.‌.‌ বাংলার প্রতি বিদ্বেষ নেই?‌ যে সব বক্তৃতা দিয়েছেন, মনে করিয়ে দেব নাকি?‌ শান্তির পথে থাকতে চান?‌ সরকারি ভবনগুলোয় আগুন লাগাল কার লোকেরা?‌ সাব–‌ইনস্পেক্টর অমিতাভ মালিককে খুন করল কারা?‌ দার্জিলিঙে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকের দিন ভয়ঙ্করভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল কারা?‌ পর্যটকদেরও আতঙ্কিত করল কারা?‌ ভাষা ও সংস্কৃতির কথা বলছেন। সেই মর্যাদা কি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী দেননি?‌ দিচ্ছেন না?‌
এবার আসল কথা। ‘‌আলোচনা চাই’‌। যখন বারবার ডাকলেন মুখ্যমন্ত্রী, তখন কে বলেছিলেন যে বাংলার সরকারের সঙ্গে কোনও বৈঠক নয়, চাই গোর্খাল্যান্ড?‌ এখন কী করে হবে বৈঠক?‌ কয়েক ডজন মামলা, খুনের অভিযোগ অনেক, ইউএপিএ, এই নেতার সঙ্গে কেনই বা কথা বলবে রাজ্য সরকার?‌ করা যায়?‌ যদি কোনও বৈঠক হয়, তাতে বিমল গুরুং কাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন?‌ জিটিএ–‌র প্রধান বিনয় তামাং, উপপ্রধান অনীত থাপা। গোর্খা মোর্চার পদেও নেই গুরুং। তাহলে কোন পরিচয় নিয়ে আসবেন বৈঠকে?‌ ডাকবে কেন রাজ্য সরকার?‌
বিমলবাবুর টানা হুঙ্কার শুনে কারও কারও মনে হয়েছে, তাঁর উগ্র সমর্থকদের মনে হয়েছে, সাত দিনের ব্যাপার, ফিরে এসে ঘুরে দাঁড়িয়ে পাহাড় তোলপাড় করে দেবেন আবার। কিন্তু স্বয়ং নেতা বুঝেছেন, সম্ভব নয়। বিনয় তামাংরা মোর্চার রাশ হাতে নিয়েছেন। জিটিএ–‌র দায়িত্বেও ওঁরা। পুরসভাগুলোতেও গুরুং–‌বিরোধীরা ক্ষমতায়। কেন্দ্র খুব সদয়, বিজেপি খুব ‘‌ভাল’‌, কিন্তু আলাদা রাজ্য দিতে পারবে না, পাহাড়ের মসনদে বসিয়ে দিতে পারবে না।
মুখ্যমন্ত্রী শুধু বিনয়–‌অনীতদের ওপর সব কিছু ছেড়ে দেননি। দায়িত্ব দিয়েছেন জিএনএলএফ নেতা মন ঘিসিংকে। বোর্ডগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এবং, খুবই বড় কথা, পাহাড়ের গোলমালে তালেগোলে তৃণমূল এখনই শক্তি বাড়াক, চাননি। দলের স্থানীয় নেতারা হয়তো একটু হতাশ, কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থকে মাথায় রেখেছেন মমতা। ইতিবাচক রাজনীতির কাছে হেরে গেছেন বিমল গুরুং।
এখন পাহাড়ে ফিরতে চান। পা রাখার একটু জায়গা চান। তারপর ধীরে ধীরে মোর্চায় নিজের দল পাকিয়ে, ঘনিষ্ঠ গুন্ডাদের গুছিয়ে নিয়ে, ফের গোলমাল পাকাতে চান। চকবাজার থেকে ফের হুঙ্কার ছড়াতে চান। তো, তিনি কী আশা করেন?‌ রাজ্য সরকার বলবে, যে, ভাই, অনেক আগুন লাগিয়েছ, প্রচুর ভাঙচুর করেছ, পুলিস অফিসারকে খুন করেছ, সব দোষ মাফ?‌ সব মামলা সাফ?‌ মামলা তুলে নিচ্ছি, গেরুয়া কার্পেট পেতে দিচ্ছি, ঘিরে এসো পাহাড়ে, তোমার আসন শূন্য আজি হে বীর পূর্ণ কর?‌ .‌.‌.‌ দুধ দিয়ে কালসাপ কেউ পোষে?‌  ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top