তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার মাসখানেক পরে ফোনে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন?‌ প্রণববাবু বললেন, ‘‌বন্দি জীবন’‌‌!‌ প্রায় পঁাচ দশক যিনি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, রাষ্ট্রপতি ভবনের ঘোরাটোপে তঁার অস্বস্তি হওয়ারই কথা। পরে সোনিয়া গান্ধী তঁাকে বলেছিলেন, ‘‌আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আমরা ভুল করেছি। সরকারে, দলে দরকার ছিল।’‌ প্রণববাবু একটু হেসে বলেন, ‘‌আমি তো বলিনি, আপনারা পাঠালেন কেন‌?’‌‌ ইউপিএ সরকারের শেষ দুই বছরে প্রবীণ প্রশাসক ও রাজনীতিকের অভাব টের পেয়েছিল কংগ্রেস। ‘‌ক্রাইসিস’‌ ম্যানেজার তো রাষ্ট্রপতি ভবনে। 
রিপোর্টার হিসেবে অনেকে তঁার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। কেউ কেউ হয়তো বেশি ঘনিষ্ঠ। এই উটকো সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ ১৯৮৬ সালে। যখন সম্পাদক। প্রণববাবু মন্ত্রিসভায় নেই। সেই থেকে অনেকবার দেখা হয়েছে, ফোনে বহুবার। খবরের খোঁজে নয়। এক পোক্ত রাজনীতিকের সঙ্গে কথা বলে একটু জানা। তবে, দু’‌বার তঁাকে প্রথম খবর দিয়েছি। ১৯৯১। প্রণববাবু ফের কংগ্রেসে। শ্রীপেরাম্বুদুরে নিহত হলেন রাজীব গান্ধী। ফোন করলাম। সবে পিটিআই এক লাইনে দুঃসংবাদ জানিয়েছে। শুনে চমকে উঠে বললেন, সে কী!‌ এইতো এলাম কংগ্রেস অফিস থেকে!‌ ২০০৪। জঙ্গিপুর। পথে। বললাম, আপনি এর মধ্যেই ২৮ হাজারে লিড করছেন। জানতে চাইলেন, কংগ্রেস কত?‌ জানালাম, ২০০ তো হচ্ছেই। প্রণববাবু:‌ তাহলে আমরা গভর্নমেন্ট করছি।
এমন পাঠক খুব কম দেখেছি। জঙ্গিপুরে ভোট চলছে, আধ ঘণ্টা বিশ্রাম। খবর বেরোল, চেয়ারে বসে পড়ছিলেন ‘‌সুধীন্দ্রনাথ দত্তর গদ্য সংগ্রহ’‌। একবার পুজোর পর কাগজের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ছুটিতে কী পড়লেন?‌ প্রণববাবু বলেন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি।’‌ দেখা হয়েছে দিল্লিতে, অবশ্যই বেশিবার কলকাতায়। যখন গেছি, দু–‌একটা বই নিয়ে যেতাম। শেষবার যখন দেখা হয়, রাষ্ট্রপতি। রাজভবনে গেলাম তিনটে বই নিয়ে। পুটিনকে নিয়ে ‘‌দ্য নিউ জার’‌ বইটা খুলে বললেন, ‘‌এটা পড়িনি‌।’‌ মানে, বাকি দুটো পড়া আছে। আলি আকবর খঁা ও বিলায়েৎ খঁার আত্মজীবনী।
তিনি কিছু দিয়েছেন?‌ হ্যাঁ। তখন ছেড়েছেন, কিন্তু মুখে ফঁাকা পাইপটা ধরা থাকে। এই সাংবাদিকের হাতে পাইপ দেখে বললেন, ‘‌ও, ধরেছেন?‌’‌ ভেতরের ঘরে গিয়ে আনলেন একটা হলুদ–‌রঙা পাইপ। তাঞ্জানিয়ার। বোঝালেন, কীভাবে ওখানে বিশেষ হলুদ মাটি থেকে তৈরি। অন্তত ৬০০ পাইপ ছিল। ‌ছাড়তে অসুবিধে হচ্ছে না?‌ ‘‌হচ্ছে, সেজন্যই তো মুখে রেখে একটু ফিল করছি!‌’
জিজ্ঞেস করেছিলাম, কংগ্রেস ছাড়া কি ঠিক হল?‌ ‘‌আমি কংগ্রেস ছাড়িনি। বহিষ্কার করেছে। প্রবীণ নেতা কমলাপতি ত্রিপাঠী একটা কড়া চিঠি দিয়েছিলেন। রাজীবকে অনুচররা বোঝালেন, প্রণববাবু ছাড়া এত গোছানো চিঠির ড্রাফট আর কেউ করতে পারেন না। ব্যস, বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত। বিজু পটনায়েক বললেন, রাজনীতি তো করবি?‌ একটা দোকান খুলে বসে থাক!‌
কংগ্রেস পরাজিত ১৯৮৯ সালে। ফিরতে চাইছিলেন। বিশেষ করে দু’‌জন সাহায্য করেছিলেন। আবিদ হোসেন, সন্তোষ মোহন দেব। সোনিয়াও নাকি রাজীবকে বলেছিলেন। করা হল দলের মুখপাত্র। কংগ্রেস দপ্তরে একটা ছোট্ট ঘর। প্রধান মুখপাত্রের পদটাকে নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়। প্রণববাবুর বিশ্বাস, রাজীব বেঁচে থাকলে ১৯৯১ সালে তিনিই হতেন অর্থমন্ত্রী। নরসিংহ রাওয়ের ফোন এল না। পরদিন ফোন:‌ আগে ফিনান্স মিনিস্ট্রি থেকে সামলাতে, এখন প্ল্যানিং কমিশন থেকে সামলাও। কথার কথা। কিন্তু প্রণববাবু তৈরি। পরে মন্ত্রিসভায়। যাত্রাপথটা ভাবুন। ৪৬ বছর বয়সে অর্থমন্ত্রী। ইন্দিরার সরকারে নাম্বার টু। ১৯৮৪ সালে বাদ দিলেন রাজীব। সে বছর বাজেট পেশ করেছেন। আবার করলেন, ২৫ বছর পরে, ২০০৯ সালে।
অনেক সাংবাদিক বলতেন, ‘‌রুটলেস ওয়ান্ডার’‌। ভিত্তিহীন কথা নয়। তিনি মানতেন। বলতেন, ‌ঠিক, আমি তো মাস লিডার নই। যা ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন। হয়েছে মমতা। ইন্দিরাজি তো চাননি যে রাজ্যে রাজ্যে আবার বিশাল প্রভাবশালী নেতারা উঠে এসে ‌সিন্ডিকেট করুক। তবে, চাইলেও, মাস লিডার হতে পারতাম না।‌
১৯৭৭ সালে হেরেছেন। ১৯৮০ সালেও হারেন বোলপুর কেন্দ্রে। তবু, ইন্দিরা তঁাকে সরকারে নিলেন। অপরিহার্য। বেঙ্কটরামন বলেছিলেন, ‘‌রুটলেস ওয়ান্ডার’‌। ১৯৯৮। তেজি মমতাকে কোণঠাসা করা হল। তৃণমূল কংগ্রেস গড়লেন মমতা। প্রণববাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মমতাকে কোণঠাসা করাটা ভুল নয়?‌ আপনি আটকানোর চেষ্টা করলেন না কেন‌‌?‌ প্রণববাবু:‌ সীতারাম কেশরী সভাপতি, কী করব?‌ কংগ্রেসের খঁাচায় কোণঠাসা থাকতে রাজি হবে কেন মমতা?‌ ওর জনভিত্তি আছে। জিজ্ঞেস করলাম, আসন্ন লোকসভা ভোটে কী হবে?‌ প্রণববাবু:‌ ৫০–‌৫০ হবে না। একদিকে বেশি ভোট যাবে। মনে হচ্ছে মমতার দিকেই।
যোগ্যতা ছিল, তবু প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি বলে কোনও ক্ষোভ?‌ প্রবীণ নেতার জবাব ছিল:‌ চাইলেই তো ভারতবর্ষের প্রধানমন্ত্রী হওয়া যায় না‌!‌ দল চাইলে হতে পারতাম, চায়নি, হইনি। এজন্য ব্যথা আছে, ক্ষোভ নেই। কংগ্রেস আমাকে যা দিয়েছে, তা কতজন পায়?‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top