শুভময় মৈত্র: বিজেপির নেতা সুব্রহ্মনিয়ম স্বামী সত্যিই অবাক করে দেন!‌ তাঁর কাছে লেনিন বিদেশি জঙ্গি। সেক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা কাজ নিয়ে কেন যে এত হইচই হচ্ছে! লেনিনের মূর্তি ভাঙা তো সকালবেলার দাঁতমাজা, দুপুরের মাছের ঝোল–ভাত, বিকেলের বেগুনি, কিংবা রাতে শোয়ার সময় মাথার নিচে বালিশ গোছানো। হাতের কাছে চুরমার করার মতো বিশ্বনেতার মূর্তি না থাক, মুঠোফোনে আন্তর্জাল তো আছে। একটু আঙুল বোলালেই খুঁজে পাবেন লেনিনের মূর্তি ঠিক কতগুলো ভাঙা হয়েছে। সম্ভবত লেনিনের মূর্তি ভাঙার রেকর্ড ইউক্রেনের দখলে। নব্বইয়ের দশক থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে প্রায় চার হাজার স্মৃতিসৌধ উল্লম্ব থেকে ভূমির সমান্তরালে নামিয়ে আনা হয়েছে। দেশে–বিদেশে লেনিনের মূর্তি ভাঙা নিয়ে হাজারো গল্প, তার মুন্ডু নিয়ে ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী বিশ্ব ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে। ঠিকই বলেছেন ত্রিপুরার কোনও এক মাঝারি মাপের বিজেপি নেতা। তাঁর বর্ণনায় বিজয়–মিছিল চলছিল বিলোনিয়াতে। সেখানে কয়েকশো মানুষের আনন্দযজ্ঞে কোনওভাবে পথ হারিয়ে ফেলে বুলডোজার। অযান্ত্রিক তখন কোন দিকে যাবে? গ্রাম ছাড়া এক রাঙামাটির পথ পেরিয়ে সে লেনিনের মুখোমুখি। তারপর একটু বাঁদিক–ডানদিক করতেই লেনিনের সঙ্গে বুলডোজারের কোলাকুলি হয়ে গেল। আর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লেনিন চিৎপাত। ত্রিপুরায় এবারের সংসদের পরীক্ষায় ত্রিকোণমিতির অঙ্ক আসবে এরকম— কুড়ি ফুট লম্বা একটি লেনিনের মূর্তির গলা এবং হাঁটুর মধ্যে ঠিক কোন জায়গায় ভাঙলে মাথাটা মাটির সঙ্গে ষাট ডিগ্রি কোণ করে ঠেকে থাকবে?
তথাগত রায় তুলনায় অনেক বড় মানুষ। ট্যুইটারের পাতায় লেখা আছে তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয়। ডানপন্থী হিন্দু, সমাজতত্ত্ব এবং রাজনীতির এক চিন্তাবিদ এবং লেখক। একই সঙ্গে তিনি বাস্তু প্রযুক্তিবিদ, আর ফেলে আসা দিনের রাজনীতিবিদ এবং অধ্যাপক। বর্তমানে ত্রিপুরার রাজ্যপাল। কোনও এক লেখক আনন্দ রঙ্গনাথন ত্রিপুরায় লেনিনের মূর্তি ভাঙা নিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। ট্যুইটারে তার উত্তরে তথাগতবাবু জানিয়েছেন, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার যা যা করতে পারে, তারপর সেই একই পদ্ধতিতে নির্বাচিত অন্য কোনও সরকার ব্যাপারটা উল্টে দিতে পারে। আইনগতভাবে সে কথায় কোনও ভুল নেই। আবার আইনের আরও সূক্ষ্ম বিচারে ভুল আছেও বটে। কারণ, তাঁর এই মন্তব্যের সময় সরকারিভাবে রাজ্য সরকার কিন্তু বদলায়নি। সে কথা থাক। পঁচিশ বছর ক্ষমতায় থাকা ত্রিপুরায় যদি সিপিএম নেতৃত্ব কিছু লেনিনের মূর্তি বসান, তা হলে সেই মূর্তিগুলো ভেঙে এগারো হাজার নীরব মোদির মূর্তি বিজেপি শাসিত ত্রিপুরা সরকার বসাতেই পারে, যদি গড়ে তার প্রত্যেকটার দাম হয় এক কোটি টাকা। সেক্ষেত্রে নীতির অঙ্ক ভুল হলেও দুর্নীতির গুণফলটা তো মোটামুটি ঠিকই থাকবে। একই যুক্তিতে পুরনো সরকারের আমল থেকে বাজার দাপিয়ে বেড়ানো স্থিতিশীল কিছু নোট চট করে বিদায় করে কোনও সরকার নতুন গাদা গাদা নোট ছাপাতেই পারে। সেটা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকারের জনগণতান্ত্রিক অধিকার। সরকার বদলেছে, সঙ্গে বদলে গেল নোট। গান্ধীর বদলে তাতে গডসের ছবি সাঁটলেই বা ক্ষতি কী? 
জিতে গেলে হেরে যাওয়া দলের পতাকা পোড়ানো, তাদের দলীয় অফিস ভেঙে দেওয়া, বেধড়ক ঠ্যাঙানি, এ সবের যুক্তিও খুব পরিষ্কার। সেই ছোটবেলার গল্পের মতো। যেখানে হরিণ বা ছাগলের পূর্বপুরুষ নদীর জল এঁটো করেছিল বলে বাঘ বা সিংহ তাকে কপাৎ করে গিলে ফেলে। অর্থাৎ জিতলেই বাঘ আর হারলেই হরিণ। এটা সাধারণত গোঁড়া কমিউনিস্ট বা তীব্র ফ্যাসিস্ট রাজনীতিতে একটা ভাল সমাধান। অবাক করার মতো বিষয় হল ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাতেও এখন ব্যাপারটা খাচ্ছে ভাল। সবশেষে ভোট, দল, রাজনীতি— এ সবের ঊর্ধ্বে প্রশাসন বলে একটা বিষয় থাকে। সেখানকার শীর্ষ আধিকারিকরা সাধারণত ভোট পরবর্তী গোলমালের সময় সংবাদমাধ্যমে সবকিছু শান্ত করার জন্যে বিবৃতি দেন। তাতে কাজ কতটা হয় সে কথা বলা কঠিন, তবে এমনই চলে আসছে। তথাগতবাবুর ট্যুইটার যদি অন্য কেউ এর মধ্যে হাতিয়ে না থাকে, তা হলে রাজ্যপাল হিসেবে তিনি প্রশাসনিক প্রধানের মতো ঢাকাচাপা দিয়ে কিছু বলেননি। সোজা বাংলায় বুঝিয়ে দিয়েছেন যে গণতন্ত্রে গণেশ উল্টোলে লেনিনও ওল্টাবে। এতে যদি তাঁর ফেলে আসা দলের সমর্থকরা অত্যুৎসাহী হয়ে আরও বেশি গোলমাল পাকান, তবে তার দায় ঘুরে–ফিরে হেরে যাওয়া সিপিএমের ঘাড়েই পড়বে। এমতাবস্থায় গদি ওল্টানোর পরে বিজেপির শীর্ষপদপ্রার্থী প্রাক্তন হতে চলা মুখ্যমন্ত্রীকে প্রণাম করলে তার থেকে লোকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা নেবে। পরিস্থিতি কিছুটা ঠান্ডা থাকবে। কিন্তু সে কথা ট্যুইটারে লিখলেও মন তা চাইছে না। তাই বোধহয় ডান হাত প্রসারিত লেনিন মূর্তি ডিগবাজি খাওয়ার পর রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান সেই উনুনে ঘুঁটে গুঁজে জোরে হাওয়া দিচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানের নিয়মে আগুন যাতে আরও ছড়ায়। 
তবে এই আলোচনা শুধু আজকের ত্রিপুরার প্রেক্ষিতে করলেই তো চলবে না। সেখানে লেনিনেরও কিছু বক্তব্য থাকতে পারে। যার মূর্তি ভাঙা হচ্ছে, তাকে তো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। গত অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সবেমাত্র বলশেভিক বিপ্লবের শতবর্ষ গেল। নেহাত লেনিনের ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট নেই। তা হলে সেখানে বামপন্থী চিন্তাবিদ, আইনজ্ঞ, লেখক এবং রাজনৈতিক নেতা— এরকম অনেক কিছুই হয়তো লেখা থাকত। বেশ কয়েক বছর তিনি যে সোবিয়েত দেশের রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, সেটাও ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তাঁর চিন্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে কাজকর্ম হয়েছে অনেক। তাঁর মত সঙ্গে নিয়ে দেশে–বিদেশে ক্ষমতায় এসেছেন অনেকে, কেউ গণতান্ত্রিক পথে, কেউ বা লড়াইয়ের রাস্তায়। তাদের সমস্ত ঠিক–ভুল কাজের দায় লেনিনের একার পক্ষে নেওয়া মুশকিল। বিজেপির ‘‌একটু মার তো খেতেই হবে’‌ হুঙ্কার দেওয়া নেতাদের বোঝা দরকার লেনিন মানেই কিন্তু সিপিএম নয়। সুকান্ত ভটাচার্য যখন লিখছেন, ‘‌বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন’‌, অথবা রবীন্দ্রনাথ যখন বলছেন,‌ ‘‌আমি ডায়েলেক্টিক প্রসেস মানি। লেনিন এরই একটা নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন…’‌, তখন সেই বিদেশির চিন্তাশীলতার মর্যাদা দিতেই হবে। মাথা না খাটিয়ে কিছু উগ্র বিজেপি সমর্থক তাৎক্ষণিক স্বতঃস্ফূর্ততায় লেনিনের মূর্তি ভেঙে ফেলতেই পারেন। কিন্তু ডান বা বাম, যে কোনও চিন্তাবিদ সেটাকে ঘোলা জলে সমর্থন করতে বসলে যুক্তিবাদের যুক্তিটুকুই বাদ হয়ে যায়।
ত্রিপুরায় বিজেপির এই বাড়াবাড়ি নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। ঠিক একই সময়কালে দেশের নামজাদা আধুনিক ধর্মগুরুরা অনুমান করছেন রামমন্দির না মিটলে ভারত নাকি সিরিয়া হয়ে যাবে। এই কারণেই বোধহয় বঙ্গ-বামপন্থীদের বেশির ভাগ অংশ বিপদ বুঝলে কেন্দ্রে কংগ্রেস আর রাজ্যে তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকবেন। ২০১১ সালে গদি ওল্টালেও বাংলার সিপিএমরা এখনও ধর্মতলায় লেনিন মূর্তির পাদদেশে সভা করতে পারেন। ত্রিপুরায় কি সে অনুমতি মিলবে? আর মিললেও ততদিনে উত্তর– পূর্বাঞ্চলের এই ছোট্ট রাজ্যে আর কোনও লেনিন মূর্তি সোজা থাকবে কি? এই লেখা শেষ করার আগেই শুনতে পাচ্ছি আরও একটা লেনিন মূর্তি নাকি এর মধ্যেই বুঁদির কেল্লা হয়ে গেছে। অন্যদিকে কলকাতায় শ্যামাপ্রসাদের মুখে লেপা হয়েছে কালি, ভেলোরে ভেঙেছে পেরিয়ারের মূর্তি। অতি বাম কিংবা অতি ডানের চাপে এই লেখা ছাপা হতে হতে অসহিষ্ণুতার সংখ্যাগুলো আরও বাড়বে কি? 
লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, মতামত ব্যক্তিগত।
 

জনপ্রিয়

Back To Top