বৃষ্টির দাপট। দুর্গোৎসবের মধ্যেও বিক্ষিপ্ত বর্ষণ। এদিকে, টালা ব্রিজ কার্যত বন্ধ। বন্ধ মাঝেরহাট সেতুও। জনারণ্য। কয়েক কোটি মানুষ পথে, মণ্ডপে। মেট্রো রেলেই তিনদিনে যাত্রী ৬২ লক্ষ!‌ অনেক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মসৃণভাবে চলতে পারল সব কিছু। মানুষের উৎসাহ, সংগঠকদের পরিশ্রম, পুলিশের চমকপ্রদ ব্যবস্থাপনা। ওদের কেটেছে বিনিদ্র রজনী। প্রশাসন সতর্ক, সজাগ। এবং বিনিদ্র বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। প্রতি মিনিটে খবর নিয়েছেন, নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ, প্রশাসন, সংগঠক ও দর্শনার্থীদের শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মমতা। এবং আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাঁকে। অবশ্য, তাঁর অপেক্ষায় থাকেন না তিনি। মনে করেন, কর্তব্য, দায়িত্ব, ধন্যবাদের কী আছে!‌
পুজোর কয়েকটা দিন, তার পরেও কয়েকটা দিন সাধারণত‌ কোনও দল রাজনৈতিক কর্মসূচি রাখে না। বিরতি। মানুষ উৎসবে বিভোর, তার মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই, কুকথার বর্ষণ বন্ধ থাকে। পরম্পরা। বাংলার ঐতিহ্য।
কিন্তু, যাঁরা অষ্টপ্রহর ঐতিহ্যের কথা বলেন, তাঁরা ঐতিহ্যের বা সৌজন্যের ধার ধারেন না। শুরুটা হল মহালয়ার দিন থেকেই। বিজেপি–‌র কার্যনির্বাহী সভাপতি জেপি নাড্ডা কলকাতায় হাজির। গঙ্গায় ‘‌তর্পণ’‌। ফটো–‌স্নান। এবং বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক কুকথা। ওঁদের ডক্টরেট এই বিষয়েই। তৃণমূল নেতাদের মধ্যে অনেকে পুজোর সংগঠক। বাকিরা উৎসবের সক্রিয় সঙ্গী, সজাগ। বামপন্থীরা বইয়ের স্টল দেন বেশ কিছু পুজো মণ্ডপে, বহু বছর ধরে। কেউ বাধা দেয়নি, এ রাজ্যে সে সব হয় না। আর, নবোত্থিত বিজেপি কী করল?‌
প্রথম থেকেই নেতারা উঠেপড়ে লেগেছিলেন, কলকাতায় কয়েকটা বড় পুজো দখল করে পেশি প্রদর্শন করবেন। প্রধান দায়িত্ব সায়ন্তন বসুর। সঙ্ঘশ্রীর সভাপতি হওয়ার পথ প্রায় পাকা। স্থানীয়রা হতে দিলেন না। অনেক মন্ত্রী অনেক পুজোয় দীর্ঘদিন, কেউ রাজনীতির সূত্রে নয়, সেই জোরে নয়। টাকার ঝুলি ও বিষের থলি নিয়ে হাজির বিজেপি। না, হল না। কোনও উল্লেখযোগ্য পুজো পাওয়া গেল না, যেখানে এসে উদ্বোধন করবেন দলের সভাপতি অমিত শাহ। ‘‌সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল’‌।‌ বিধাননগরে বিজে ব্লকে পাওয়া গেল একটা। তা–‌ও স্থানীয় মানুষ বললেন, বিজেপি নেতা হিসেবে নয়, বড়জোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে থাকতে পারেন অমিত শাহ। পরিষ্কার বলে দেওয়া হল, মঞ্চে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া কোনও বিজেপি নেতা উঠবেন না। সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়া প্রতিশ্রুতির মতো, এ ক্ষেত্রেও পদপিষ্ট করা হল ভদ্রলোকের সমঝোতাকে। মঞ্চে এক দঙ্গল বিজেপি নেতা। তা, দুর্গোৎসব সম্পর্কে কী বললেন অমিতজি?‌ ধর্ম ভাঙিয়ে ভোটের পেট ভরান, দুর্গোৎসব নিয়ে নিশ্চয় কিছু বলবেন?‌ হায়। করলেন সাম্প্রদায়িক প্রচার। এনআরসি–‌র চোখ–‌রাঙানি।
মহালয়ায় দিন ‘‌উদ্বোধন’‌ করে গিয়েছিলেন নাড্ডা, কুকথা, সেই বিষ আরও ছড়ালেন আমাদের ভারতবর্ষের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ভোটের কথায় খই ফুটল মুখে। একটা মজার কথা বললেন। ‘‌আমরা যখন ক্ষমতায় আসব (‌কোথায় স্যর?‌)‌, দুর্গাপুজো করতে অসুবিধা হবে না!‌’‌ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, নিজে না জানলেও, সাঙ্গোপাঙ্গরা এটুকুও জানিয়ে দেননি, যে, বাংলায় ৩৩ হাজার দুর্গাপুজো হয়। প্রত্যেকটি পুজোয় রাজ্য সরকার অনুদান দেয় ২৫ হাজার টাকা। মুখ্যমন্ত্রী নিজের আনন্দের কথা না ভেবে, দুর্গোৎসবকে মসৃণ রাখার জন্য কার্যত অভুক্ত, বিনিদ্র থাকেন। এত মিথ্যা বলতে হয়, অমিতজি?‌ এত বিষ বাঙালির হজম হবে?‌ এলেন এবং গেলেন, ছড়িয়ে গেলেন বিষ, যথাসাধ্য। সেই বিষ ঝেড়ে ফেলে বাঙালি মাতল উৎসবে।
বিজেপি নেতারা মঞ্চ আলো করার জন্য পুজো খুঁজে পাননি। এত সুন্দর, মসৃণ ব্যবস্থা, ফাঁকও খুঁজে পাননি। অবশেষে, নবমীর রাতের এক শোচনীয় ঘটনায় পেলেন বিষের রসদ। দশমীতে প্রস্তুতি, একাদশী থেকে নেমে পড়লেন (‌ওঁরা ‘‌নামতে’‌ জানেন!‌)‌। জিয়াগঞ্জে প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক বন্ধুপ্রকাশ পাল নিহত, স্ত্রী–‌পুত্রও। রাজ্য সভাপতি, উপযুক্ত সভাপতি দিলীপ ঘোষ বললেন, বন্ধুপ্রকাশ তাঁদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, ছিলেন আরএসএস–‌এর কর্মী। তদন্তে দেখা গেল, পারিবারিক, ব্যক্তিগত কোনও কারণে নৃশংস খুন। উৎসবের ব্যবস্থাপনায় সব জেলার পুলিশ রাতদিন এক করে খাটছেন। এসপি থেকে কনস্টেবল। তার মধ্যে কোন বাড়ির মধ্যে কী ঘটল, জানা সম্ভব নয়, সুস্থ লোকেরা বোঝেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সক্রিয় হল পুলিশ। পেল কিছু সূত্রও। আটক ২ জন। নিকটাত্মীয় বললেন, বন্ধুপ্রকাশ কোনও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। বিজেপি–‌র কাজ বিজেপি করেছে/‌ কামড় দিয়েছে পায়/‌ তাই বলে তাকে কামড়ানো কি মানুষের শোভা পায়?‌ আমরা উপেক্ষা করছিলাম। না। তিনি আছেন। রাজ্য বিজেপি–‌র অঘোষিত প্রধান উপদেষ্টা। থাকেন রাজভবনে। রাজ্যের ‘‌সাংবিধানিক অভিভাবক’‌।‌ শ্রীযুক্ত জগদীপ ধনকড়। মাননীয় রাজ্যপাল। এসেছেন ব্রিফ নিয়ে, মমতাকে উত্ত্যক্ত করতে হবে, রাজ্য সরকারকে হেনস্থা করতে হবে, বিজেপি–‌কে মদত দিতে হবে। গোপন বৈঠক করেছেন আরএসএস–‌বিজেপি নেতাদের সঙ্গে। এত মসৃণভাবে চলল উৎসব, ধন্যবাদ জানালেন না প্রশাসনকে, মানুষকে। তিনদিন টেলিভিশনে চোখ রাখছিলেন, যদি কিছু পাওয়া যায়। একটা ‘‌ক্রাইম’–‌এর‌ খবর পেলেন। এবং ঝাঁপিয়ে পড়লেন ‘‌অভিভাবক’।‌ রাজ্য সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করলেন, বললেন, ‌বিশাল ঘটনা, ধামাচাপা দেওয়া চলবে না। এই ঘটনা রাজ্যে আইন‌শৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিফলন। ধর্মবীর নামে এক প্রাক্তন প্রচুর দুর্নাম কুড়িয়েছিলেন। অ–‌ধর্মবীর গেরুয়া নেতার ভূমিকায় প্রকাশ্যে অবতীর্ণ হলেন। তৃণমূলের মহাসচিব (‌মন্ত্রী হিসেবে নয়)‌ পার্থ চ্যাটার্জি উপযুক্ত জবাব দিলেন। 
মাননীয়, বাংলার দুর্গোৎসবে অনেক কর্মকর্তা মুসলিম। মণ্ডপ তৈরি করেন মুসলিমরাও। ভোগের বাসন দেন মুসলিমরা। মিলেমিশে থাকেন চিরকাল। ধনকড়জি, নতুন এসেছেন, একটু চিনুন রাজ্যটাকে। সবুজপত্রের সহ–‌সম্পাদক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের যখন বিয়ে স্থির হল, বাড়িতে তেমন কোনও অভিভাবক নেই। সব ব্যবস্থা করলেন এক বন্ধু, নামটা জানেন তো মাননীয়, নজরুল ইসলাম!‌ হিন্দু বাড়িতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে গিয়ে এক জনপ্রিয় সাহিত্যক, আসন চেয়ে, গীতাপাঠ করতেন, নির্ভুল, প্রায় মুখস্থ। নামটা জেনে রাখুন মাননীয়, সৈয়দ মুজতবা আলী!‌
এই বাংলায় বিষ ছড়াতে এসেছেন। বাড়াতে 
এসেছেন, নিয়োগকর্তার নির্দিষ্ট নির্দেশ নিয়ে। পেরে উঠবেন না। রাজ্যের নাম বাংলা, মানুষ সচেতন, মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি।‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top