রাজ্যের বিরোধীদের প্রিয় শব্দ— ব্যর্থ। গত সাড়ে পঁাচ মাসে দিলীপ ঘোষ সতেরো বার বলেছেন, রাজ্য সরকার ব্যর্থ। আমরা একটু দেখি, সত্যিই কি ‘‌ব্যর্থ’‌?‌
ভয়াল ভাইরাস হানার পর, কয়েকদিনের মধ্যেই যেভাবে প্রস্তুতিকে ক্রমশ নিখঁুত জায়গায় নিয়ে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, তা অভাবনীয়। অনেক টেস্ট সেন্টার। অনেক কোভিড হাসপাতাল। এত ঘনবসতি সত্ত্বেও বাংলা অপেক্ষাকৃত ভাল জায়গায়। দেশে সুস্থতার হার ৭৭ শতাংশ। কতটা পিছিয়ে রাজ্য?‌ পিছিয়ে!‌‌ তথ্য, কেন্দ্রেরও তথ্য, বাংলায় সুস্থতার হার ৮৬ শতাংশ। ‘‌ব্যর্থ’‌?‌
দেশে কোভিড–‌এ মৃত্যুর হার ১.‌৮ শতাংশ। বাংলা খুব বেশি পিছিয়ে?‌ তথ্য, ১.‌৯ শতাংশ। এবং ক্রমশ তা কমছে। এক সপ্তাহ লেগেছে গোটা ব্যবস্থা গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। প্রথম দিকে টেস্ট হচ্ছিল দিনে ৫–‌৬ হাজার। বিরোধীরা বলেছেন, অন্তত ২০ হাজার হওয়া উচিত। রাজ্য সরকার কতটা পারল না, কতটা ‘‌ব্যর্থ’‌, দেখা যাক। দিনে ৪৫ হাজারের বেশি টেস্ট হচ্ছে, ক্রমশ ৫০ হাজারের দিকে যাচ্ছে। নির্ভেজাল তথ্য কি অদ্ভুত বিরোধীদের চুপ করিয়ে দেবে?‌ আরে না। তথ্যের দিকে তাকাতে মানা ওঁদের। মুখে লেগে শব্দটা— ‘‌ব্যর্থ’‌।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী দেশে লকডাউন ঘোষণা করার আগেই সে কাজ করেছে রাজ্য সরকার। মোদি বলেছিলেন, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছিল ১৮ দিনে, এবারের যুদ্ধ শেষ হবে ২১ দিনে। ২১ দিন!‌ ১৭২ দিন হয়ে গেছে। মমতা কিন্তু শুরুতেই বুঝেছেন এবং বলেছেন যে, লড়াইটা লম্বা। মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, দূরত্ব বিধির কথা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিয়েছেন, অন্যরা সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার আগেই। মাস্ক কেন চাই, কীভাবে বাড়িতেই তৈরি করা যায়, দেখিয়েছেন। বুঝিয়েছেন। কীভাবে কতক্ষণ কতখানি হাত ধুতে হবে, নিজের হাত দিয়ে দেখিয়েছেন। দূরত্ব বিধি বোঝাতে, রাস্তায় গোল দাগ দিয়ে বুঝিয়েছেন। আজ বোধহয় মানুষ বুঝছেন, বিশেষজ্ঞদের, সংবাদমাধ্যেমের প্রচারের আগেই ব্যাপারটা একেবারে সামনে এনেছেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। এক্ষেত্রেও কি, দিলীপ ঘোষরা বলবেন— ‘‌ব্যর্থ’‌?‌ বলুন। বলতে ট্যাক্স লাগে না।
তখন সবে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে দেশে, রাজ্যে। দিলীপ ঘোষরা চেঁচালেন, হাজার হাজার (‌ নাকি লক্ষ লক্ষ! ‌)‌ মানুষ মরে যাচ্ছেন, ধাপার মাঠে লুকিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। দাহ ধাপায় হয়, সবাই জানেন। হাজার হাজার মানুষ মরলেন আর তঁাদের বাড়ির লোক জানবেন না?‌ চিৎকারটা শুধু চ্যানেলে নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো হল। মিথ্যা বেশিদিন দঁাড়াতে পারে না। সত্য স্পষ্ট হল। চিৎকার থামল এবং নতুন নতুন মিথ্যাচার চলতে থাকল। ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে এল এক প্রৌঢ়ের আর্তনাদ, ‘‌খেতে পাচ্ছি না, মরে যাচ্ছি, মুখ্যমন্ত্রী কিছু তো করুন!‌’‌ চ্যানেলেও স্থান পেল। দিন তিনেক পরেই ওই প্রৌঢ় জানালেন, তিনি যাত্রাশিল্পী, কিছু স্থানীয় বিজেপি কর্মীর কথাতেই ‘‌অভিনয়’‌ করে দেখিয়েছিলেন। এটা গেল, তবে নতুন নতুন এল।
বারাসতের অশ্বিনীপল্লীতে ৩০ জন কোভিডে মৃত, শয়ে শয়ে আক্রান্ত, গেরুয়া গুণধররা ছড়ালেন। স্বাভাবিক আতঙ্ক। এলাকায় অনেকে গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন। কর্মস্থলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন আতঙ্কিত লোকজন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ওখানে কেউ মারা যাননি, আক্রান্ত ২ জন। আসন্ন পুজো নিয়ে কী ছড়ানো হল?‌ রাজ্য সরকার নাকি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সন্ধে থেকেই কার্ফু, কেউ বেরোতে পারবেন না। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, গ্রেপ্তার করা হোক অপপ্রচারকারীকে। ৩ দিনের মধ্যে ৬ জন ধরা পড়ল, সংখ্যাটা বাড়বে। এই অপপ্রচার এত ছড়াতে পারত না, যদি সংগঠিত উদ্যোগ না থাকত। এরা যে দাঙ্গা বাধাতে ওস্তাদ, সন্দেহ নেই। ওদের একটাই সমস্যা, মমতা ব্যানার্জি সজাগ, সক্রিয়।
সবাই দেখছেন, এই কঠিন সময়ে লড়ছে অক্লান্ত পুলিশ বাহিনী। যে–‌কোনও সুস্থ সচেতন মানুষ মনোবল বাড়াবেন। দিলীপ ঘোষ রোজ যত গেলাস জল খান, ততবার পুলিশকে আক্রমণ করেন কুৎসিত ভাষায়। সম্প্রতি বলেছেন, ‘‌এমন হাল করে দেব, যাতে পুলিশের লোকেরা নিজেদের বউ–‌বাচ্চার মুখও দেখতে পাবে না। কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের বেঙ্গালুরুতে পড়াতে পাঠান, সব বন্ধ করে দেব, ওদের পরিযায়ী শ্রমিক করে ছাড়ব!‌’‌
কুকথার স্রোত। মিথ্যার জাহাজ। মুখে ‘‌ব্যর্থ’‌ মন্ত্র জপ। আর মুখ্যমন্ত্রী কী করছেন?‌ দিনরাত এক করে কাজ করছেন, প্রশাসনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নততর করে যাচ্ছেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তঁাকে বলেছেন ‘‌বাঘিনি’‌। দিলীপ ঘোষরা নোংরামি করছেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা জননেত্রী কী করছেন?‌ এক কথায়— লড়ছেন।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top