ব্রিগেডে মোদির সভা ঘিরে আগ্রহ কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলে কথা। এত বড় নেতা বলে কথা। ৩ এপ্রিল দুপুরে শিলিগুড়ি সেরে বিকেলে ব্রিগেড। বলে গেলেন, গরিবদের কথা ভাবেন না, উন্নয়নের ক্ষেত্রে মমতা ‘‌স্পিডব্রেকার’‌!‌ তৃণমূল নেত্রীর শত্রুরাও আড়ালে মানেন, উন্নয়ন হয়েছে বটে বাংলায়। কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সবুজসাথী, খাদ্যসাথী, সমব্যথী, কৃষকবন্ধু— প্রকল্পগুলোর নাম শোনেননি মহিমহিম মোদিজি?‌ রাস্তা নির্মাণ, পানীয় জলের ক্ষেত্রে কী দারুণ কাজ হয়েছে জানেন না?‌ ও হ্যাঁ, জানলেও উল্টো বলতে হয়। ১০০ দিনের কাজে দেশে এক নম্বর বাংলা, যে–‌বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি, এ তো কেন্দ্রীয় তথ্য। বেমালুম অস্বীকার?‌ উল্টে ‘‌স্পিডব্রেকার’‌ বলে দেওয়া?‌ ভোট বাজারে পচা প্রচার নয়?‌ কর্মসংস্থানে কোথায় আমাদের রাজ্য?‌ দেশের মধ্যে সবার আগে। কৃষকদের আয় কোন রাজ্যে বেড়েছে সবচেয়ে বেশি?‌ মোদিজি, রাজ্যটার নাম বাংলা, মুখ্যমন্ত্রীর নাম মমতা ব্যানার্জি। ‘‌দিদি.‌.‌.‌ই’‌ বলে যতই আসর জমানোর চেষ্টা করুন, নির্ভেজাল তথ্য উড়িয়ে দেওয়া কি সহজ?‌ এই তথ্য ও সত্য তো বিমান হানা বা প্রচার হানা চালিয়ে মুছে দেওয়া যাবে না।
ব্রিগেডে অনেকটা সময় দিয়েছেন, কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে। করতেই পারেন, বিরোধী দল। মজার ব্যাপার হল, উত্তরবঙ্গে নয়, কলকাতার ব্রিগেডে বিষয় কংগ্রেস। ‘দক্ষিণবঙ্গে কোথায় আমরা আছি’‌‌— যখন খুঁজে বেড়াচ্ছে কংগ্রেসই। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অশনি সঙ্কেত আসছে বলেই কি একটু গুলিয়ে ফেলছেন ভাষণবীর?‌ শিলিগুড়ির সভায় একটা কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচন কমিশনের আত্মমর্যাদা থাকলে যার জন্য কঠোর ভর্ৎসনা প্রাপ্য ছিল। বললেন, ‘‌শুধু আমাদের প্রার্থীকে জেতাতে ভোট দেবেন না, শুধু মোদিকে জেতাতে ভোট দেবেন না, সেনাবাহিনীকে জেতাতে বিজেপি–‌কে ভোট দিন!’‌‌ দেশের সুরক্ষার জন্য যাঁরা নিজেদের প্রাণ বাজি রাখছেন, তাঁদের দেশবাসী সব সময় জিতিয়ে চলেন, সম্মান করেন। বিজেপি–‌র সঙ্গে সেনা–‌আধাসেনা জুড়ে গেল কী করে?‌
যে–‌রাজ্যে প্রচারে আসছেন, সে–‌রাজ্যে বিরোধী দল ক্ষমতায় থাকলে সরকারের তীব্র সমালোচনা করবেন, স্বাভাবিক। প্রধান প্রতিপক্ষকে তীক্ষ্ণভাবে বিদ্ধ করতে চাইবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু সমানভাবে স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত, নিজের কেন্দ্রীয় সরকারের কথাও বলবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, সেদিকে যাবেনই না?‌ যত অভিযোগ তাঁর ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে, অন্তত সংক্ষিপ্ত জবাব দেবেন না?‌ প্রধানমন্ত্রী, বলার কথা তো থাকা উচিত। নোটবন্দি। বোঝানোর চেষ্টা করতে পারতেন, কেন ও কীভাবে নোটবন্দি সফল। কী কী উপকার হয়েছে, বিরোধীদের সমালোচনার কেন ভিত্তি নেই, দু–‌একটা লাইনও বলবেন না ৫৬ ইঞ্চি?‌ জিএসটি। অপ্রস্তুত অবস্থায় চালু করার ফলে বিপর্যস্ত ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা, সোচ্চার অভিযোগ। জবাব কোথায়?‌ তিনি না বললে কে বলবেন?‌ রাফাল। আসলে তিনি নির্দোষ, তাঁর দপ্তরের কোনও সম্পর্কই ছিল না প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটিকে পাশ কাটিয়ে চুক্তি, অনিল আম্বানির সদ্যোজাত কোম্পানিকে ৩০ হাজার কোটি পাইয়ে দেওয়ার কথাটা ঠিক নয়, একটু বুঝিয়ে বলবেন না?‌ সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিদেশে গচ্ছিত ‘‌কালা ধন’‌ উদ্ধার করে। এক টাকাও এল না কেন?‌ কিছু তো বলুন!‌ বছরে ২ কোটি চাকরি দেবেন বলেছিলেন, ৫ বছরে ১০ কোটি। উল্টে ১ কোটি ৮৭ লক্ষ মানুষের কাজ চলে গেল কেন, একটা সরল ব্যাখ্যাও না দিলে হবে?‌ কৃষকদের দুর্গতি কেন চরমে পৌঁছল, কেন বিজেপি–‌শাসিত রাজ্যগুলোয় ১২ হাজার কৃষককে আত্মহত্যা করতে হল, প্রশ্নটার জবাব কে দেবে?‌ সব প্রশ্ন গিলে ফেলবেন ‘‌যুদ্ধ’‌ দিয়ে, উগ্র প্রচার দিয়ে, আবদারটা বড্ড বেশি হয়ে গেল না?‌
ব্রিগেডে বক্তৃতায় মজার উপাদান একেবারেই ছিল না, তা নয়। রাজ্য সভাপতি তো বলেই রেখেছিলেন, জার্মান হ্যাঙার দেখতেও অনেকে আসবেন। তা ভাল। প্রধানমন্ত্রী বলে কথা, তাঁর কথা শুনতেও অনেকে আসবেন। বিজেপি নাকি বাড়ছে, তাঁরা ব্রিগেড ভাসিয়ে দেবেন, বটেই তো। ছবি তো উল্টো কথা বলছে। হ্যাঙারে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ বসতে পারেন না, তা–‌ও সুরক্ষার জন্য কিছুটা ছেড়ে রাখতে হল, হাইটেক ছাউনির বাইরে লোক নেই। মোদিজি বললেন, এত ভরা ব্রিগেড আর কখনও হয়নি!‌ ব্রিগেড সম্পর্কে, ব্রিগেডে সভার ইতিহাস সম্পর্কে সত্যিই ভরপুর জ্ঞান!‌ বামফ্রন্ট লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ অনেক করেছে। দুর্দিনেও এর চেয়ে বেশি মানুষ আনতে পেরেছে। মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই জনজোয়ার এনেছেন ব্রিগেডে, এবার ১৯ জানুয়ারিতেও, আরে, কাগজে ও টেলিভিশনে ছবিও কি দেখেননি প্রধানমন্ত্রী বাহাদুর?‌ এই না–‌ভিড়ের ব্রিগেড দেখেই মুগ্ধ?‌ সত্যি, বড় অভিনেতা বটে।‌ কত কোটি টাকা খরচ হল, প্রশ্ন করে লাভ নেই, টাকা আছে ওদের। গরম থেকে মানুষকে রেহাই দিতে, পরে কখনও ব্রিগেডে সভা করার দুঃসাহস দেখালে, এসি–‌র ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। কিন্তু মানুষ?‌ কোথায় পাবেন। ফাঁকা ব্রিগেড, ফাঁকা ভাষণ। সব ফাঁকা।

জনপ্রিয়

Back To Top