সৌপর্ণ অধিকারী: ‘‌হিউম্যান ডিএনএ প্রোফাইলিং বিল’‌ পাশ হল লোকসভায়। সন্দেহ, যে সভার অর্ধেকের বেশি সদস্য ডিএনএ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান রাখেন না, কিন্তু তঁারাই হয়ে উঠলেন এই বিলের ভাগ্যবিধাতা।
এক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই বিল অসম্ভব ফিউচারিস্টিক। রোগ নির্ণয়, রোগের চিকিৎসা এবং রোগ ছড়ানো আটকাতে কাজে আসবে। অন্য দিকে এই বিল জেরেমি বেন্থাম বর্ণিত ‘‌প্যান অপ্টিকন’‌–এর একটা অংশ। আপনার গায়ে স্ট্যাম্প মেরে দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া। শুরু থেকেই শুরু করা যাক।
ডিএনএ কী?
যে কোনও জীবদেহ অসংখ্য কোষের সমষ্টি। আপনার শরীরে যে কোষগুলো আছে, সেগুলো কয়েকশো কোটি বছরের বিবর্তনের ফলে উদ্ভূত। আপনি আপনার ঔরস বা ডিম্বাণুর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে এই তথ্য রেখে যাবেন। বলাই বাহুল্য, প্রত্যেক প্রজন্মে এই তথ্য বিবর্তিত হতে থাকে। খুব সামান্য হলেও। কম্পিউটারের না হয় হার্ড ডিস্ক থাকে, কোষেরও তথ্যভাণ্ডারের প্রয়োজন হয়। তার পরিবেশ, তার দৈনিক (বলা ভাল প্রতি পিকোসেকেন্ডের) কার্যকলাপ সম্পন্ন করার জন্য। আমরা বিবর্তনে শারীরিকভাবে যে তথ্য আহরণ করেছি, মায়ের শরীরে নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে ভ্রুণ, তার থেকে শিশু, বয়ঃসন্ধি, গোঁফ, দাড়ি, চুলের রং, চোখের রং সারাজীবনের এই তথ্য সঞ্চিত থাকে ডিএনএ–র মধ্যে। ডিএনএ ভাবনাতীত পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। এবং কোষ বিভাজনের সময়ে রেপ্লিকেশন বা নিজের প্রতিলিপি তৈরি করে।
ডিএনএ–র রাসায়নিক চরিত্র বেশ অদ্ভুত। ডিএনএ দ্বিতন্ত্রী অণু। অর্থাৎ দুটি সুতো ঘোরানো সিঁড়ির মতো পেঁচিয়ে ডিএনএ তৈরি করে। মোটামুটি দুটি অংশ, একটি অংশ ব্যাকবোন এবং আরেকটি অংশ বেস। ব্যাকবোন অংশে থাকে ডিঅক্সিরাইবোজ শর্করা, যেটি ফসফোডাইএস্টার বন্ধনীর মাধ্যমে জুড়ে থাকে ফসফেটের (ফসফরিক অ্যাসিড) সঙ্গে। অন্যহাতে শর্করার সঙ্গে জুড়ে থাকে পিউরিন অথবা পিরিমিডিন বেস। পিউরিন বেসের দুটো ধরন হয়, যথাক্রমে অ্যাডেনাইন এবং গুয়ানাইন, এবং পিরিমিডিনের ক্ষেত্রে সাইটোসিন এবং থাইমিন (থায়ামিন নয়, থায়ামিন ভিটামিন)। শার্গফের সূত্র অনুযায়ী যে কোনও ডিএনএ দ্বিতন্ত্রীতে পিউরিন এবং পিরিমিডিনের পরিমাণ সমান হয়। অ্যাডেনাইনের সঙ্গে দুটি হাইড্রোজেন বন্ধনীর সাহায্যে অপর তন্ত্রী থেকে জুড়ে থাকে থাইমিন, গুয়ানাইনের সঙ্গে তিনটি হাইড্রোজেন বন্ধনীর সাহায্যে অপর তন্ত্রী থেকে জুড়ে থাকে সাইটোসিন।
বিজ্ঞানী জে ডি ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ দ্বিতন্ত্রীর এই গঠন আবিষ্কার করেন ১৯৫৩ সালে। সেটাই ছিল মলিকিউলার বায়োলজি, বায়োটেকনোলজি এবং বায়োকেমিস্ট্রি / বায়োফিজিক্সের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। ডিএনএ অণুর ক্রিস্ট্যাল থেকে এক্স রে–র সাহায্যে ছবি তুলেছিলেন বিজ্ঞানী রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। সহযোগী ছিলেন মরিস উইলকিন্স। সেই এক্স রে–র বিচ্ছুরিত প্যাটার্ন থেকে ডিএনএ–র গঠন বের করেন ওয়াটসন এবং ক্রিক। নোবেল প্রাইজ জুটেছিল ওয়াটসন, ক্রিক এবং উইলকিন্সের। কিন্তু নোবেল প্রাইজ নেবার আগেই মারণ রোগে মৃত্যু হয় রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের।
আমরা সাধারণত যখন উল্লেখ করি, কেবলমাত্র বেসের নাম অর্থাৎ A, G, C, T দিয়েই তন্ত্রীর সিকোয়েন্স বর্ণনা করি। কারণ একটি ডিএনএ অণু থেকে আরেকটি ডিএনএ অণুর পার্থক্য এই সিকোয়েন্সের সংখ্যা এবং ধর্মেই হয়। ডিএনএ–র পরিমাপক ইউনিট হচ্ছে বেস পেয়ার (base pair or bp)। মানবশরীরে মোটামুটি তিনশো কোটি বেস পেয়ার আছে। বিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছে। ডিএনএ দ্বিতন্ত্রী পেঁচিয়ে-জড়িয়ে তৈরি করে ক্রোমোজোম। মানব কোষে ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে ২২ জোড়া+XX (মহিলাদের)/XY (ছেলেদের)। এই Y ক্রোমোজোম ছেলেদের কান, নাকের চুল, ইত্যাদির জন্য দায়ী। এই ক্রোমোজোমের ডিএনএ–তে লিপিবদ্ধ আছে এই তথ্য। এই লিপিবদ্ধ তথ্যের একেকটি সামগ্রিক ইউনিটকেই সাধারণভাবে বলা হয় জিন। এই চুলের জিনগুলিকে বলা হয়
হোল্যান্ড্রিক জিন।
জিন সিকোয়েন্সিং ও তার গুরুত্ব
ফ্রেডরিক স্যাঙ্গারের হাত ধরে সূচনা হয় জিন সিকোয়েন্সিং–এর। নিতান্ত সাধারণ কেমিক্যাল উপায়ে সিকোয়েন্সিং করেছিলেন স্যাঙ্গার। সত্তরের দশকের শেষে শুরু হয় মানবদেহের পুরো ডিএনএ–র সিকোয়েন্স বের করার ‘‌হিউম্যান জিনোম প্রোজেক্ট’‌। এর প্রাণপুরুষদের একজন ছিলেন ফ্রান্সিস ক্রিক। ছিলেন জে ক্রেগ ভেন্টার। যিনি পরে জে ক্রেগ ভেন্টার ইনস্টিটিউট তৈরি করেন, যা এখনও পর্যন্ত এই বিজ্ঞানের পীঠস্থানগুলোর একটা। কম্পিউটার বিপ্লব, ইলেকট্রনিক্স, বায়োকেমিস্ট্রির উন্নতি সিকোয়েন্সিং হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। পুরো হিউম্যান জিনোম সিকোয়েন্স করতে খরচ হয়েছিল ১০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। আজকে সেখানে, একই কাজ করতে খরচ হয় খুব বেশি হলে ১০০০ ডলার— এটা ২০১১ সালের হিসেব। আজকের হিসেবে আরও কম। অর্থাৎ মোটামুটি সাধারণের আয়ত্তের মধ্যে চলে আসতে চলেছে ব্যাপারটা। নেক্সটজেন সিকোয়েন্সিং পদ্ধতির মাধ্যমে এবং উন্নত অ্যালাইনমেন্ট অ্যালগোরিদমের মাধ্যমে দ্রুত, অনেক নিখুঁত ফলাফল পাওয়া সম্ভব স্রেফ একটা টেক্সট ফাইলে। আপনার কোষের পুরো তথ্য চলে আসবে একটা টেক্সট ফাইলে— দু’‌মিনিট ভাবুন।
প্রতিটা মানবগোষ্ঠীর মধ্যে ডিএনএ–র পার্থক্য আছে। ককেশিয়ান, মঙ্গোলয়েড, আফ্রিকান, অস্ট্রিক প্রত্যেককে ডিএনএ–র সিকোয়েন্স দিয়ে চিহ্নিত করা যায়। এমনকী, ভারতের বিভিন্ন অংশের জনগোষ্ঠীর ডিএনএ–তেও পার্থক্য আছে। বাঙালিদের ডিএনএ সিকোয়েন্সের সঙ্গে মিল খায় অনেকটা শ্রীলঙ্কার লোকেদের ডিএনএ সিকোয়েন্স। অন্যদিকে, উত্তর, উত্তর–পশ্চিম ভারতীয়দের কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর মিল আছে। 
জিন যেমন জাতিগত তথ্য বহন করে, সেরকম বহন করে রোগের তথ্যও। মাসকিউলার ডিস্ট্রফি, স্তন এবং কোলন ক্যান্সারের মতো বেশ কিছু ক্যান্সার, কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহ করা হচ্ছে কিছু মানসিক রোগও জিন বহন করে আনে। জেনেটিক সিকোয়েন্স থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে ডেটা অ্যানালিসিসের মাধ্যমে এই জিনের উপস্থিতি বা টেন্ডেন্সি বোঝা যায়। উল্টোদিকে, কোথাও কোনও রোগ ছড়িয়ে পড়লে জিন সিকোয়েন্সের সঙ্গে তার কোরিলেশন দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে সংযুক্ত কি না।
তাহলে বিপদটা কোথায়?
আগেই বলেছি, এই বিল অত্যন্ত ফিউচারিস্টিক। ফিউচারিস্টিক নজরদারির বিল। ধরুন, আপনার জিনোম ঘেঁটে পাওয়া গেল আপনি কোনও একটি রোগ বংশগতভাবে বহন করছেন, যেটা আপনার ৬০ বছর বয়েসে গিয়ে হয়তো শুরু হয়। কিংবা আপনার মধ্যে বিশেষ একটি রোগের প্রবণতা বেশি। আজকের যুগে, চিকিৎসার বিষয়ে নিরাপত্তার বলয়ে থাকতে অনেকেই হেলথ ইনশিওরেন্স নেন। আপনার আধার বা অন্য কোনও আইডেন্টিটির সঙ্গে যদি এই তথ্য জোড়া থাকে, তাহলে ইনশিওরেন্স কোম্পানি আপনাকে হাই রিস্ক অংশে ফেলে খুব সহজেই তাদের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে দিতে পারে। যদিও, ডিএনএ–তে থাকলেই রোগটি হবে, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। ডিএনএ–র অনেক ধরনের নিয়ন্ত্রক ফ্যাক্টর আছে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগ কেবলমাত্র সুপ্ত (recessive) থেকে যায়।
অন্যদিকে স্নায়ু–মনোবিজ্ঞান যেভাবে বায়োফিজিক্স, ডেটা অ্যানালিসিস নির্ভর হয়ে পড়ছে, তাতে আপনার মানসিক প্রবণতাও হয়তো নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। ২০১৮–র ১৬ এপ্রিল নেচার পত্রিকায় একটি গবেষণা প্রবন্ধে গবেষকরা শুধুমাত্র ডিপ্রেশনের তিনটে ধরনের জন্য জিন আইডেন্টিফাই করেছেন সিকোয়েন্সের ওপর নির্ভর করে। আপনার জেনেটিক ডেটা যদি আপনার চাকরিদাতার কাছে আসে, তাহলে তার বেসিকে আপনাকে discriminate করা হবে না, এরকম গ্যারান্টি সংবিধানে থাকলেও কার্যক্ষেত্রে এখনও দেখা যায়নি। এখনও ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের রোগীকে অফিসে হেনস্থার শিকার হতে হয়, বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের রুগিকে পিএইচডি ডিগ্রির গবেষণা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এবং কোনও ক্ষেত্রেই কোনও সমাধান বেরোয় না।
ভবিষ্যতে যদি হিটলারের মতো জাতিবিদ্বেষী কোনও সরকার আসে, সে খুব সহজেই সিকোয়েন্স থেকে আপনার জাতিপরিচয় পেয়ে যাবে। ধরে নিন, অসমের এনআরসি–র মতোই আরেকটা কিছু হবে। এ ছাড়া, এই ডিএনএ ডেটা ব্যাঙ্ক যদি হ্যাক করা যায়, শত্রু দেশের বিজ্ঞানীদের পক্ষে আমাদের জনসংখ্যাকে আক্রমণ করার জন্য জৈব অস্ত্র বা বায়োলজিক্যাল ওয়েপন বানানো সোজা হয়ে যাবে। গবেষণা করতে হবে, কিন্তু আমাদের শত্রু দেশগুলোর সেই গবেষণা পরিকাঠামো আছে। এ ছাড়া হ্যাকারদের হাতে পড়লে ডিএনএ স্যাম্পল জাল করাও কঠিন নয়। কল্পবিজ্ঞানের মতো শুনতে লাগলেও এটা সত্যি, যে, ডিএনএ স্যাম্পল জাল করা যায়। শুধু হ্যাকার কেন, সরকারি সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধেও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে না, এরকম তো নয়।
আইনে কী আছে?
এইবার আইনটার অফিসিয়াল নামটা বলা যাক— The DNA Based Technology (Use and Regulation)
Bill, 2017। এটাকে সাধারণভাবে বলা হচ্ছে হিউম্যান ডিএনএ প্রোফাইলিং বিল। এই আইন অনুসারে আপাতত ডিএনএ সংগ্রহ করা যেতে পারে অপরাধে অভিযুক্ত, বিচারাধীন, সন্দেহ তালিকাভুক্ত, মৃত, অপরাধী কিংবা নিখোঁজ ব্যক্তিদের থেকে। ৭ বছরের বেশি জেল হয়ে থাকলে তার অনুমতি ছাড়াই স্যাম্পল নেওয়া যাবে শরীর থেকে। এ ছাড়া নমুনা সংগ্রহের জন্য লিখিত অনুমতির কথা বলা হয়েছে। একটি বোর্ড তৈরি হবে বিজ্ঞানী, সরকারি প্রতিনিধি এবং আইন বিশেষজ্ঞ–মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। সংগৃহীত ডিএনএ–র সিকোয়েন্সড ডেটা একটি সেন্ট্রালাইজড ডেটা ব্যাঙ্কে সঞ্চিত থাকবে। সিভিল কেসের ক্ষেত্রেও ডিএনএ সংগ্রহ করা যাবে। এই সংগৃহীত ডেটা চিকিৎসা গবেষণা কিংবা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ, সেই অ্যানালাইজড ডেটা অন্য সংস্থার হাতে অন্য ফর্মেও যেতে পারে, আইনকে পাশ কাটিয়ে। সিভিল কেসে ডিএনএ কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, তার অনুমতির কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এ ছাড়া ডিএনএ পরিচয় ছাড়াও অনেক তথ্য বহন করে, যা ভুল হাতে পড়লে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
(‌লেখক বায়োকেমিস্ট, ব্লগার)‌

জনপ্রিয়

Back To Top