সুচিক্কণ দাস- রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প নিয়ে আলোচনা উঠলেই, এই কথাটা প্রায় সবার মুখেই শোনা যায়— সরকার কেন ব্যবসা করবে? যেন ব্যবসা করাটা শুধু পুঁজি মালিকদের একচ্ছত্র অধিকার। তাঁরা কারখানা করবেন, মাল বেচে লাভ করবেন। তাঁদের সস্তায় জমি, বিদ্যুৎ, পরিকাঠামো দেবে রাষ্ট্র। ব্যবসা থেকে লাভের টাকায় তাঁরা আরও কারখানা করবেন। মাল বিক্রি না হলে সরকারকে চাপ দিয়ে স্টিমুলাস প্যাকেজ আদায় করবেন। পুঁজি মালিকদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হবে জনগণের করের টাকায়।  কিন্তু জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্র জনস্বার্থে কারখানা চালাতে পারবে না।  শিল্প মালিকেরা সঙ্কটে পড়লে জনগণের করের টাকা থেকে ভর্তুকি নেবেন। অথচ বিদ্যুৎ, গ্যাস, পেট্রোল, কেরোসিনে জনগণ ভর্তুকি চাইলেই কিছু লোক খেঁকিয়ে উঠবেন।
ব্যবসা বা কারখানা যেই করুক, মূল কথা হল লাভ বা মুনাফা। রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বা ব্যবসা যদি লাভ করতে পারে, তাহলে কি রাষ্ট্র প্রতিরক্ষা, সার, পরিবহণ, প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের উৎপাদন নিজের হাতে রাখবে না? যাঁরা রাষ্ট্রের ব্যবসা করার বিরোধী, তাঁরা এই প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। 
সোভিয়েতের পতনের পর রাশিয়ায় সব রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ বিলুপ্ত হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছিল। তখন থেকেই কথাটা বেশি চালু হয় যে রাষ্ট্র কারখানা করবে না, কারণ সেই কারখানা শুধুই ভর্তুকি দিয়ে চালাতে হয়। এভাবেই ব্যর্থতার সব দায় সমাজতন্ত্রের ঘাড়ে চাপানো হয়। অথচ, ইদানীংকালে রাষ্ট্রের উদ্যোগে ও মদতে ব্যবসা সফল হওয়ার বড় উদাহরণ চীন।
মাও সে তুঙের মৃত্যুর পর দেং শিয়াও পিং আমলের শুরু থেকেই দেশি–বিদেশি ব্যক্তিগত পুঁজিকে ব্যবসা করার অনুমতি দেয় চীনের কমিউনিস্ট সরকার। এখন চীনের অর্থনীতির বড় অংশেই বেসরকারি পুঁজির রমরমা। তার মানে এই নয় যে চীন দেশি–বিদেশি পুঁজির অবাধ লীলাক্ষেত্র। চীনে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র রয়েছে। এবং সেটা ভালরকমই লাভজনক।
ধরা যাক, চীনের ইস্পাত শিল্পের কথা। ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে  ইস্পাত উৎপাদনে সারা বিশ্বে প্রথম স্থান দখল করে নেয় চীন। এই ৯ বছরে চীনের ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৩৪৬ শতাংশ, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য। (যাঁরা মাও আমলে গ্রেট লিপ ফরওয়ার্ডের যুগে চীনে কৃষিক্ষেত্রের পিছনে চুল্লি জ্বেলে দেশি কায়দায় ইস্পাত উৎপাদনের ইতিহাস জানেন, তাঁদের কাছেও সংখ্যাটা বিস্ময়কর)। ওই একই সময়ে বাকি বিশ্বে ইস্পাত উৎপাদন কমে ১০ শতাংশ। ১৯৯৭ সালে চীন উৎপাদন করত বিশ্বের মোট ইস্পাতের ৪ শতাংশ। ২০১৮ সালে এসে দেখা গেছে চীন উৎপাদন করেছে বিশ্বের মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি, ৯২৩ মোট্রিক টন।  ইস্পাত উৎপাদনে আমেরিকা ও জাপানকে বহু আগেই ছাপিয়ে গেছে চীন। 
কীভাবে ইস্পাত উৎপাদনে এত বিপুল সাফল্য এল?
চীনের ইস্পাত শিল্পের এই বিপুল সাফল্যের পিছনে রয়েছে সেদেশের সরকারের ভূমিকা। ২০০৯ সালের শেষে চীনের ১০টি সর্ববৃহৎ ইস্পাত গোষ্ঠীর মধ্যে ৮টিই ছিল ১০০ শতাংশ সরকারি মালিকানাধীন। আবার যদি সেদেশের সর্ববৃহৎ ২০টি ইস্পাত গোষ্ঠীকে ধরা যায়, তাহলে তার মধ্যে ১৬টির ১০০ শতাংশ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ছিল চীন সরকারের হাতে। ইস্পাতই যেহেতু ভারী শিল্পের ভিত্তি, তাই চীনের ইস্পাত শিল্প এখনও রয়েছে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। নানা রকম আর্থিক সুবিধে দিয়ে ইস্পাত শিল্পকে লাভজনক রেখেছে চীনের সরকার।  আবার বিদেশি সংস্থার প্রতিযোগিতা ঠেকাতে ইস্পাত শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগও নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। সরকার ইস্পাত শিল্পকে যেসব সুবিধে দেয় তার মধ্যে রয়েছে নগদে সহায়তা বা ক্যাশ গ্র্যান্টস। এতে কাঁচা মাল ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচ সামাল দিতে পারে ইস্পাত উৎপাদক সংস্থাগুলি। চীন সরকার বাজার দামের চেয়ে কম দামে জমি দেয় ইস্পাত সংস্থাগুলিকে। চীনের সরকারি ব্যাঙ্ক অনেক কম সুদে ইস্পাত ক্ষেত্রকে কোটি কোটি ডলার ঋণ দেয়। আবার দরকারে বিপুল পরিমাণ ঋণ মকুবও করে। এর পাশাপাশি কর ছাড়ের সুবিধে তো আছেই। আমদানি করা লৌহ আকরের দামও বেঁধে রাখতে ব্যবস্থা নেয় সরকার। 
সরকার এই ধরনের সুবিধা দেওয়ার ফলে চীনের ইস্পাত হয়ে ওঠে বিশ্ববাজারে দামে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু সস্তা। সস্তা অথচ গুণমানে উৎকৃষ্ট চীনা ইস্পাত এখন বিশ্ববাজারে আধিপত্য করছে। এখন আমেরিকায় এমন কোনও নির্মাণ কাজ হয় না যেখানে চীনা ইস্পাত কাজে লাগে না। এসবের মানে এই নয় যে চীনে অন্যান্য দেশের অলাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কারখানাকে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়। কোনও কারখানা লাভজনক না হলে তাকে অন্যের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সেই কারখানার শ্রমিকদের চাকরি যায় এবং তাঁদের অন্য উদ্যোগের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এককথায় দক্ষতা দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারলেই কোনও প্রতিষ্ঠান পাবে সরকারি সহায়তা। অনন্তকাল ভর্তুকি দিয়ে টেকানো হবে না। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে শ্রমিক ও পরিচালকদের সবরকম সহায়তা দেবে সরকার। এই নীতিতেই অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বিশ্ববাজার দখল করেছে চীনের ইস্পাত উৎপাদন শিল্প। 
এখনকার সময়ের কথাও ধরা যাক। আমেরিকা ও ইয়োরোপকে পিছনে ফেলে বিশ্বের মোবাইল ফোনের বাজারে এখন এক নম্বরে চীন। একটা হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ নাগাদ চীনে ৫জি কানেকশনের সংখ্যা দাঁড়াবে ৪৬ কোটি। ৫জি মোবাইলই এখন আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় টেলিফোনের ভবিষ্যৎ। চীনের তরফে ৫জি প্রযুক্তির বিশ্ববাজার দখলে এখন এগিেয় হুয়ায়ে কোম্পানি। এরা চিপের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে গোয়েন্দাগিরি চালাচ্ছে, এই অজুহাত তুলে পশ্চিম ইয়োরোপের ও আমেরিকার বাজার থেকে হুয়ায়েকে হঠাতে চাইছেন ট্রাম্প। এটা তাঁর বাণিজ্য যুদ্ধের অংশ। হুয়ায়ে বেসরকারি চীনা কোম্পানি। তবে একেবারে গোড়া থেকেই এই সংস্থার সঙ্গে ভাল বোঝাপড়া রয়েছে চীন সরকারের। অনুমান, ৫জি প্রযুক্তিতে হুয়ায়ে যাতে আমেরিকা ও পশ্চিমী দেশগুলিকে টেক্কা দিতে পারে, সেজন্য নানা ভাবে এই কোম্পানিতে সরকারি প্রতিষ্ঠান চায়না ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক বিনিয়োগ করেছে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কোম্পানির মালিক রেন  ঝেংফেই স্বীকার করেছেন, বিদেশি সংস্থার প্রতিযোগিতার হাত থেকে হুয়ায়েকে বাঁচানোর পথে যদি না হাঁটত চীনের সরকার, তাহলে হুয়ায়ের অস্তিত্বই বিপন্ন হত। একেবারে গোড়ায় হুয়ায়েকে ৮.৫ মিলিয়ন ডলার ধার দিয়েছিল চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। এরপর শি জিনপিং হুয়ায়েকে জুড়ে নিয়েছিলেন মেড ইন চায়না ২০২৫ প্রকল্পে। সেখান থেকেই বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে ৫জি প্রযুক্তি করায়ত্ত করে হুয়ায়ে এবং পিছনে ফেলে দেয় মার্কিন কোম্পানিগুলিকে।  সামনে বেসরকারি হুয়ায়ে এবং পিছনে চীন সরকারের মদত, এ দুইয়ের যোগ্য সঙ্গতেই আজ ৫জি প্রযুক্তিতে আমেরিকাকে হারিয়ে দিয়েছে চীন। সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের এই হাত ধরাধরিকেই চীনারা বলে পরিকল্পিত বাজার অর্থনীতি। আমেরিকানরা বেসরকারি বাজার অর্থনীতি বোঝে, কিংবা সমাজতন্ত্রের পরিকল্পিত অর্থনীতি বোঝে। ফলে ডব্লুটিও–‌তে অন্তর্ভুক্তির জন্য মার্কিন বিশেষজ্ঞরা যখন চীনের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন, তাঁরা তখন পরিকল্পিত বাজার অর্থনীতির মতো নতুন বিষয়টাকে বুঝতেই পারেননি। তাঁরা চীনকে ডব্লুটিও–‌তে নিয়ে নিয়েছিলেন এই আশায় যে, এরপর চীন পুরোপুরি পুঁজিবাদী হয়ে যাবে। কিন্তু শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র কাজে লাগিয়ে চীন যে পুঁজিবাদী দুনিয়া থেকে ভিন্নরকম একটা অর্থনীতি গড়েছে এবং তার কাছে আমেরিকা যে হারছে, সেটা বুঝেই চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধে নেমেছেন ট্রাম্প।
এভাবে যদি আমরা চীনা অর্থনীতির নানা ক্ষেত্র, যেমন শক্তি উৎপাদন, পরিবহণ, প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেল ও বিমান পরিবহণের মতো ক্ষেত্রগুলিতে নজর দিই তাহলে দেখতে পাব, চীনের সাফল্যের ভাগীদার শুধু এককভাবে বেসরকারি পুঁজি নয়। সর্বত্র বেসরকারি পুঁজির সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেছে সরকারি পুঁজি, বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে তালমিল ঘটিয়ে চলছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা।
আবার, আমরা যদি সোভিয়েত–উত্তর রাশিয়ার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, সেদেশের অর্থনীতিতে এখনও রাষ্ট্রীয় পুঁজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রেলপথ, প্রতিরক্ষা, মহাকাশ গবেষণা, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিমান পরিবহণের মতো ক্ষেত্রগুলিতে কোথাও জোরালোভাবে, কোথাও আংশিকভাবে  ফিরে এসেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানা। কৃষিজমির বাণিজ্যিকীকরণ পুরোপুরি হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ে জোরালো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ রয়েছে। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক।
রাশিয়ার সবচেয়ে বড় ২০০টা কোম্পানির মধ্যে এই র‌্যাঙ্ক দেওয়া হয়েছে। তথ্য সংকলন করেছে এক্সপার্ট রেটিং এজেন্সি। ওপরের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্যাঙ্ক, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিকম, বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যেগুলি রুশ অর্থনীতির ভিত, সেখানে বেশ শক্তিশালী একটা রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ রয়েছে। কোথাও কোথাও তা ৮৪ বা ৭৭ শতাংশের মতো ।
৯০–এর অভ্যুত্থানে সবকিছু ভেঙেচুরে যাওয়ার পর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল রুশ অর্থনীতি। এরপর ধাপে ধাপে শক্তিশালী রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের হাত ধরেই পুতিনের রাশিয়া বিশ্ব পরিসরে তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। বেসরকারি পুঁজি প্রাধান্য পেলেও, পুতিনের রাশিয়া কিন্তু আমেরিকা, ফ্রান্স বা জার্মানির চেয়ে আলাদা। রাশিয়া কপিবুক পুঁজিবাদ হতে পারেনি বলেই তাকে তাড়ানো হয়েছে জিএইট থেকে। জিএইট এখন তাই জিসেভেন। এরকম উদাহরণ আরও পাওয়া  যাবে।
চীন ও রাশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার ভূমিকা পুরোপুরি খর্ব করাটা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। বরং শক্তিশালী ও জোরালো রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র দেশের বেসরকারি ক্ষেত্রকে শক্তি জোগাতে পারে। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কেন মোদি সরকার ভারতে একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, এমনকী লাভজনক সংস্থাও বিক্রি করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে? এটা নেহাতই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, নাকি অর্থনীতি পরিচালনার মতাদর্শগত বিষয়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে আরও অনেক বিষয় স্পষ্ট হবে।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top