ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: সংসদে আজ বাজেট পেশ করবেন প্রাইস ওয়াটারহাউসের লন্ডন অফিসে কাজ করে আসা জেএনইউ থেকে অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ৫৯ বছর বয়সি নির্মলা সীতারামন। বৃহস্পতিবার সংসদে আর্থিক সমীক্ষা প্রকাশের সময় তিনি প্রথম দেখা দিলেন অর্থমন্ত্রী রূপে। তঁার আগে, ১৯৭০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মহিলা হিসেবে প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনিই তখন প্রধানমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রকের দায়িত্বও সে–‌বছর নিজের কাছেই রেখেছিলেন ইন্দিরা। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটেই অনুকূল ছিল না তখন। বহু ক্ষেত্রে করের হার বাড়ানোর ফলে ‘সোশ্যালিস্ট’ বা সমাজতান্ত্রিক তকমা জুটেছিল সেই বাজেটের। প্রায় অর্ধ শতক পরে দেশ যখন দ্বিতীয় মহিলার বাজেট দেখতে চলেছে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তখনও প্রতিকূল। পরপর তিনটি ত্রৈমাসিক, মানে টানা ৯ মাস ধরে কমেই চলেছে আর্থিক বৃদ্ধির হার! বড় অর্থনীতিগুলির মধ্যে দ্রুততম বৃদ্ধি ভারতেই বলে ভোটের প্রচারে যে অহঙ্কার করেছিল কেন্দ্রের শাসক দল, তা আর এখন শোনা যাচ্ছে না। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ, এই ৩ মাসে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৮%, আর চীনের ৬.৪%। আমেরিকার সঙ্গে শুল্ক–‌যুদ্ধ চলতে থাকলেও, আর্থিক বৃদ্ধির হারে আবার দ্রুততম চীন। আর ভারত? সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কৃষ্ণমূর্তি সুব্রহ্মণ্যনের তৈরি আর্থিক সমীক্ষা বলছে, বৃদ্ধির নিম্নগামী ধারা কাটিয়ে অর্থনীতি আবার চাঙ্গা হওয়ার পথে। চারটি ত্রৈমাসিক মিলিয়ে সারা বছরের হিসেব ধরলে চলতি আর্থিক বছরের শেষে বৃদ্ধির হার দঁাড়াবে ৬.৮%। আগামী অর্থ বর্ষে সেটাই পৌঁছোবে ৭ শতাংশে। আহা, তা–‌ই যেন হয়!‌ তবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে সরকারি পরিসংখ্যান আজ এক বিশাল প্রশ্নচিহ্নের মুখে দঁাড়িয়ে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকেরা কিন্তু বলছেন, খরার ভ্রুকুটি আছে, ২০১৯-‌২০ জুড়ে আর্থিক বৃদ্ধি চাপের মধ্যে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। বস্তুত, আর্থিক সমীক্ষাতেও সে ইঙ্গিত আছে। এদিকে ভোটপর্ব মিটতেই সরকারিভাবে স্বীকার করা হয়েছে, বেকারত্বের হার এখন গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদরা উদ্বিগ্ন, ৩.৪ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আর্থিক ঘাটতি বেলাগাম হওয়ার পথে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে আর যা–‌ই হোক, নির্মলা যে সমাজতান্ত্রিক পথের ছায়াও মাড়াবেন না, তা নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ নেই। বরং আশঙ্কা আছে, বেড়ে–‌চলা আর্থিক ঘাটতির দোহাই দিয়ে ফলাও বিজ্ঞাপন–‌করা সমাজকল্যাণ প্রকল্পগুলির বরাদ্দ ছঁাটাই হবে না তো?
এক দিকে রাজকোষে টাকা নেই, অন্য দিকে সরকার এখনই উদার হাতে খরচ শুরু না করলে অবস্থা আরও সঙ্গিন হয়ে উঠবে। এই ক’‌দিন আগে সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) জানাল, সরকারি আর বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই নতুন বিনিয়োগ ব্যাপক হারে কমছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল, মে, জুন— এই তিন মাসে মোট নতুন বিনিয়োগ হয়েছে ৪৩,৪০০ কোটি টাকা, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বিনিয়োগের এই অঙ্ক আগের বছরের ওই ৩ মাসের চেয়ে ৮৭% কম। আগের বছরের ওই ৩ মাসের তুলনায় ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে বা কারখানায় নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৬৮% আর সার্ভিস ক্ষেত্রে বা পরিষেবায় নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৯৮%। এর পাশাপাশি বাড়ছে স্থগিত প্রকল্পের সংখ্যাও। জুন ত্রৈমাসিকের সিএমআইই রিপোর্ট বলছে, নতুন বেসরকারি প্রকল্পের ২৬% স্থগিত হয়ে আছে। নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমা মানে যে নতুন কাজের সুযোগ কমতে থাকা, সেটা বুঝতে বিশ্বকাপজয়ী দেশের ক্রিকেট–‌কোচের মতো বুদ্ধি লাগে না। চশমা ছাড়াই স্পষ্ট দেখা যায়। বোঝা যায়, দরকার অবিলম্বে নতুন সরকারি বিনিয়োগ। আর্থিক সমীক্ষাতেও সে–‌কথা স্বীকার করা হয়েছে, তার সঙ্গে তেমন বিশ্বাসযোগ্য কারণ ছাড়াই বলা হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ কমে আসার দিন শেষ। এখন থেকে নতুন বিনিয়োগ বাড়তে থাকবে। কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রের চাকা যখন কাদায় পড়েছে, তখন তো সরকারকে এগিয়ে এসে নতুন প্রকল্পে বেশি করে বিনিয়োগ করতে হবে। তার জন্য দরকার টাকা। কিন্তু সে–‌টাকা আসবে কোত্থেকে? বেশ কিছু দিন ধরে মাসে ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি জিএসটি সংগ্রহের পর জুন মাসে জিএসটি সংগ্রহ ১ লক্ষ কোটি টাকার নীচে নেমে পৌঁছেছে ৯৯,৯৩৯ কোটি টাকায়। টাকার জোগানই যদি কমতে থাকে, নির্মলা সীতারামন করবেনটা কী? রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সংস্থা জলের দরে বেচতে চাইলেও তো খদ্দের জুটছে না!‌ এয়ার ইন্ডিয়াই তো বিক্রি হল না আজ পর্যন্ত!‌ শোনা যাচ্ছে, কর–‌হীন বন্ড ফিরিয়ে এনে পরিকাঠামো নির্মাণে নতুন বিনিয়োগের অর্থ–‌সংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
আগের মন্ত্রিসভায় নির্মলা বেশ কিছু দিন বাণিজ্য মন্ত্রকের দায়িত্বও সামলেছেন। তখন আশা করা হয়েছিল, দেশে তৈরি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে তিনি একটা সদর্থক ভূমিকা নেবেন। কিন্তু সেখানে তঁার সাফল্যের নামগন্ধও নেই। উল্টে, পূর্ববর্তী সমস্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে বসে আছেন তিনি। ভোগ্যপণ্যের দেশজ চাহিদাই হবে অর্থনীতির চালক— তঁার এই ভাবনা যদি এবার অর্থ মন্ত্রকে ফলিত হতে থাকে, তবে মহাবিপদ! অবশ্যই একটা জায়গা পর্যন্ত সেটা সুফল দিয়েছে। তবে শুধুই অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করে থাকলে যা হয়, তাও এবার দেখা যেতে শুরু করেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে যাত্রিবাহী গাড়ির বিক্রি কমেছে ১৭.১%। ২০১১ সালের পর গাড়ির চাহিদার এমন পতন আর দেখা যায়নি। তবে নিজস্ব ভাবনা–চিন্তা প্রয়োগের সুযোগ নির্মলা সীতারামন কতটা পাবেন, সে–‌সন্দেহও থাকছে। নিন্দুকেরা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নয়, তঁাকে আসলে দেওয়া হয়েছে অর্থ মন্ত্রকের মুখপাত্রের দায়িত্ব। বাজেট তৈরি থেকে শুরু করে যাবতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং নেবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। নির্মলা সীতারামনের কাজ সেগুলোকে জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং সেই সব সিদ্ধান্তের পক্ষে যথাসাধ্য ওকালতি করা। রাফাল চুক্তিতে কোনওভাবে জড়িত না থেকেও সংসদে আর সংসদের বাইরে তিনি যেভাবে ওকালতি চালিয়ে গিয়েছেন, এই তার পুরস্কার।
তবু, অচ্ছে দিন আসুক না–‌আসুক, আজ বাজেট। আর, সরাসরি সম্প্রচারের জমানায় সেই বাজেট প্রথম পেশ করবেন এক মহিলা। বাজেটে এখন পেট্রোল–‌ডিজেল, মদ–‌সিগারেটের মতো অল্প কিছু পণ্য বা পরিষেবার করের হারেই অদলবদল করা যায়। বাকি সব পণ্য আর পরিষেবায় করের হার ঠিক করে এখন জিএসটি কাউন্সিল। তা সত্ত্বেও বড় বাণিজ্য সংস্থা থেকে বঁাধা–‌আয়ের চাকরিজীবী— বাজেট নিয়ে সকলেরই কিছু রুটিন–‌প্রত্যাশা থাকে। ইনকাম ট্যাক্স কমার আশা তাতে সবচেয়ে কমন। নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করমুক্ত বলে সোচ্চারে ঘোষণা করা হলেও, প্রায় ফিসফিস করে বলা হয়েছিল যে যঁাদের আয় বছরে ৫ লক্ষ টাকার বেশি, তঁারা কিন্তু এই সুবিধে পাবেন না। পুরনো হারেই তঁাদের আয়কর দিতে হবে। তাতে একটা অসন্তোষ ছড়িয়েছিল উঁচু হারের করদাতাদের মধ্যে। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় অনেকে আশা করতে শুরু করেছেন, ওই সুবিধেটা আয়করের সমস্ত হারে প্রসারিত করে তঁাদের ধন্যবাদ জানানো হবে। যঁারা এ–‌রকম আশা করছেন, তঁারা বুঝেও বুঝতে চাইছেন না অর্থনৈতিক বাস্তব বিবেচনা করে যে ছাড়ের ব্যাপারে ভোটের আগে হাত গুটিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছিল সরকার, ভোটের পরে ধন্যবাদী দায় হিসেবে সেটা ঘাড়ে তোলার কথা ভাবাও হবে না। তাই আজ যেন সেরকম কোনও প্রত্যাশা নিয়ে বাজেট শুনতে বসবেন না। তবে সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ তাদের নিজস্ব সূত্র থেকে আগাম জানিয়েছে, এবারের বাজেটে আয়কর ছাড়ের ঊর্ধ্বসীমা বছরে ২.৫ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে হতে চলেছে ৩ লক্ষ টাকা। দেখা যাক, সামনে যখন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভোট নেই, তখন অর্থনৈতিক বাধ্যতা অস্বীকার করে সেই সান্ত্বনা পুরস্কারই বা আসে কি না।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top