সত্যম রায়চৌধুরী: কথায় বলে, লোহা গরম থাকতে হাতুড়ির ঘা মারাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। গত নভেম্বরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে লন্ডন সফরে গিয়ে বারবার এই কথাটাই মনে হচ্ছিল। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না করায় বহু সুযোগ হারাতে হয়, নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি বহুবার। মমতা ব্যানার্জি কিন্তু সেই গোত্রের প্রশাসক যিনি সময় নির্বাচনের ব্যাপারে যথেষ্ট বিচক্ষণ। ভগিনী নিবেদিতার ১৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান সেরেই উইম্বলডন ছেড়ে তিনি বেরিয়ে পড়লেন রাজ্যের জন্য বিনিয়োগ টানতে। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গী হলাম। সেই দলে মন্ত্রী, আমলা, শিল্পোদ্যোগী, সাংবাদিক অনেকেই ছিলেন। সেই সফরে তিনি নিজে বলেছেন কম, সুযোগ দিয়েছেন আমাদের বলার। রাজ্যে ব্যবসা করতে গিয়ে কী অভিজ্ঞতা, সম্ভাবনার কোন কোন দরজা খোলা, সরকার কতখানি সহযোগিতা করে, এসব খোলাখুলি বিদেশিদের জানাবার দায়িত্ব ছিল আমাদেরই।
এবার বলি, সঠিক সময় নির্বাচনের ব্যাপারটা। ২০১৭–‌তেই তাঁর নেদারল্যান্ডস সফরেও সঙ্গী হয়েছিলাম। কন্যাশ্রীর সাফল্যের স্বীকৃতি মিলেছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছ থেকে। তখনই দেখেছিলাম, মমতা ব্যানার্জি তাঁর ব্যক্তিসত্তা ছাপিয়ে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। এটা খুব কম রাজনীতিকের পক্ষেই সম্ভব। বিদেশি হোন কি অনাবাসী ভারতীয়, ভারতের একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে দেখেননি, দেখেছেন একজন ‘‌ওয়ার্ল্ড লিডার’‌ হিসেবে। এই প্রসঙ্গে আমার এক বাংলাদেশি বন্ধুর কথা বলি। রাজনীতি সচেতন সেই ভদ্রলোক বলছিলেন, ‘‌বাংলাদেশে মমতাদির বিশ্ব বাংলা কনসেপ্টটা দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। এই যে রাজ্যের গণ্ডি ছাপিয়ে, দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে, দলাদলির সঙ্কীর্ণতাকে ছাপিয়ে গ্লোবাল ভাবনা ভাবতে পারা, এটাকে আমরা সালাম জানাই।’‌‌ আমার মনে হয়েছে, এই যে কন্যাশ্রী বিশ্বের দরবারে সম্মানিত হয়ে এক ঝটকায় পশ্চিমবঙ্গকে স্থান করে দিল বিশ্বের মানচিত্রে, প্রচারের আলোয় আন্তর্জাতিক মিডিয়া আগ্রহী হল আমাদের রাজ্যের দিকে তাকাতে, এই ব্যাপারটাকে সুকৌশলে কাজে লাগালেন মুখ্যমন্ত্রী। সেটা আবার এমন একটা সময়ে যখন দরজায় কড়া নাড়ছে বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট। বিদেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের হাতে গরম আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ। এই সেদেনই কলকাতায় হইহই করে বিপুল সাফল্যের সঙ্গে হয়ে গেছে অনূর্ধ্ব–‌১৭ বিশ্বকাপ ফুটবল। আন্তর্জাতিক খেলার দুনিয়ায় সসম্মানে উত্তীর্ণ পশ্চিমবঙ্গ। বিশ্ব জুড়ে প্রশংসার বন্যা বয়েছে। সবার মুখে মুখে ওয়েস্ট বেঙ্গলের নাম।
জ্যোতি বসুর প্রিয় জায়গা ছিল লন্ডন। অনেকবার সরকারি সফরে গেছেন তিনি। তাঁর প্রবাসী বন্ধুদের সৌজন্যে দু–‌চারটি ব্যক্তিগত আড্ডার ছবি দেখার সুযোগ হয়েছিল। যাঁরা বলতেন জ্যোতিবাবু হাসতে জানেন না, তাঁরা দেখেছেন কিনা জানি না, সেইসব ছবিতে চায়ের আসরে রীতিমতো খোশমেজাজে তিনি। একটি ছবিতে তাঁর সামনে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকেও দেখেছিলাম। মমতা ব্যানার্জি অবশ্য নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ যেতে একেবারেই অনাগ্রহী। তার ওপর তিনি মানুষটাই সমষ্টির জন্য, তাঁর অবসর মানে আশপাশের সবাইকে নিয়ে গল্প কিংবা গান, আবৃত্তি। তাঁর বিদেশ সফরও নিতান্তই সীমিত। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর পাখির চোখ ছিল শুধুই রাজ্যের হাল ফেরানো। প্রথমদিকে তাই ভাবেননি বিদেশ যাওয়ার কথা। তারপর ঘর সামলে বিনিয়োগ টানার স্বার্থে বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতেই হল। সিঙ্গাপুর, লন্ডন, ঢাকা, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস। এর মধ্যে ২০১৬–‌র রোম আর ২০১৭–‌র লন্ডন সফরের মুখ্য কারণ তো মাদার টেরিজা আর সিস্টার নিবেদিতা। ভ্যাটিকানে মাদারের সন্তায়নের অনুষ্ঠান আর উইম্বলডনে নিবেদিতার বাড়িতে ব্লু প্লাক বসানোর উৎসবে সম্মানিত অতিথি ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। আমরা যারা প্রায়ই দিদির সফরসঙ্গী হই, তারা জানি, সরকারি টাকা যাতে এতটুকু অপচয় না হয়, সেদিকে কী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাঁর। অর্থ এবং সময় বাঁচাতে চেষ্টা করেন এক সফরে অনেক উদ্দেশ্য সাধনের।
অন্য অনেক দেশি–‌বিদেশি নেতার থেকে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে আলাদা, সেটা কিন্তু প্রথম দর্শনেই বুঝে যান বিদেশিরা। আর সেজন্যই বোধহয় বেশির ভাগ সময়েই সৌজন্যের শুষ্কতা পেরিয়ে আন্তরিকতার উষ্ণতায় ভরে ওঠে বাণিজ্য বৈঠক। দেশে হোক কি বিদেশে, দিদি নিজে সারাক্ষণ খোঁজ নেন সবাই খেয়েছে কিনা, কারও কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো। ঠিক সেই উষ্ণতাই ঝরে পড়ে তঁার ব্যবহারে যখন বিদেশের মাটিতে কোনও রাষ্ট্রনেতা বা শিল্পোদ্যোগীর মুখোমুখি হন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই সেই আন্তরিকতা ছঁুয়ে যায় অন্য প্রান্তের মানুষটিকে। এমন সব বৈঠক থেকেই এক্ষুনি রাজ্যে বিশাল বিনিয়োগ আসবে, এমন কথা কেউই বলবেন না। এর মধ্যে কোনও প্রয়াস ফল দেবে, কোনওটা নয়। আমরা জানি, বিনিয়োগের অঙ্ক এত সরল নয়। তার জমি তৈরি করাটা খুব কঠিন ব্যাপার। সেই কাজটা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করেন মমতা ব্যানার্জি এটুকু বলতে পারি। লন্ডনের সেন্ট জেমস কোর্টে ফিকি এবং ইউ কে ইন্ডিয়ান বিজনেস কাউন্সিলের ডাকা গোল টেবল বৈঠকে লন্ডনের শিল্পপতিদের বললেন মুখ্যমন্ত্রী, ‘‌বাংলার মানুষ অতিথিপরায়ণ। তাঁরা আপনাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। আমরা কিন্তু আপনাদের অপেক্ষায় থাকব।’‌ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান লর্ড ডেভিস থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা, সবাই আপ্লুত। তারপর এডিনবরাতে গিয়ে দেখা করলেন বিশ্বের সেরা ধনীদের একজন লক্ষ্মী মিত্তলের সঙ্গে। বাংলার প্রতি, কলকাতার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা আছে সেন্ট জেভিয়ার্সের প্রাক্তন ছাত্র মিত্তলের। দিদিকে তিনি বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। মিত্তল কথা দিয়েছিলেন, জানুয়ারিতে কলকাতায় বাণিজ্য সম্মেলনে আসবেন তিনি।
বিশিষ্ট বাঙালি শিল্পপতি পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জি তো জনে জনে বলেছিলেন দিদির থেকে সারপ্রাইজ গিফট পেয়ে তিনি অভিভূত। লন্ডনের হোটেলের ঘরে ঢুকে দেখেন, একটা ছোট্ট ব্যাগ। খুলে দেখেন, চমৎকার একটা সোয়েটার। লন্ডনের হাড়কঁাপানো ঠান্ডায় এটা কতখানি দরকার, শত ব্যস্ততার মধ্যেও মনে রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী, এই ব্যাপারটাই মুগ্ধ করেছে পূর্ণেন্দুবাবুকে। মিৎসুবিশির লগ্নি নিয়ে পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জির সঙ্গে বৈঠক যে কতখানি ফলপ্রসূ হয়েছে সেই খবর তো জেনেই গেছেন দেশের মানুষ। রাজ্যের বস্ত্রশিল্পে নতুন দিগন্ত আসতে চলেছে এর ফলে। বহু কর্মসংস্থানও হবে বলাই বাহুল্য। 
লন্ডনে যেমন, স্কটল্যান্ডেও তেমনি, শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে মমতা ব্যানার্জির প্রথম কথা, ‘‌বাংলায় আসুন। বাংলাকে দেখে যান। বুঝে যান। এখানকার মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। ওরা কী বলে শুনুন। তারপর বিনিয়োগের কথা ভাবুন। আমি প্রথমেই আপনাদের বিনিয়োগ করতে বলছি না। বাংলায় এসে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরুন। আমরা আপনাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।’‌ তঁার এই যে প্রতিবেশীসুলভ আন্তরিকতা, একে সাহেবরা বলছেন, ‘‌ইউনিক অ্যাপ্রোচ’‌, যা হাজার পরিসংখ্যান, কয়েকশো পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনকে টেক্কা দিতে পারে অনায়াসে। তঁার ‘‌এগিয়ে বাংলা’‌ ক্যাচ লাইনও খুব প্রশংসা পেয়েছে। বিদেশি শিল্পোদ্যোগীরা যত শুনেছেন কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সবুজ সাথীর সাফল্যের কথা, লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে বইপত্র–‌সাইকেল দেওয়ার কথা, দু’‌টাকা কেজি দরে প্রান্তিক মানুষকে চাল জোগানোর কথা, তত বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন। ‘‌গভর্নমেন্ট ফর দ্য পিপল’‌ যে শুধু সংবিধানের পাতায় লেখা কথা নয়, বাস্তবেও যে তার রূপায়ণ সম্ভব, সেটা করে দেখিয়েছে মমতা সরকার। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক অস্থিরতামুক্ত এই রাজ্যে পরিকাঠামো সম্পর্কে যে আশ্বাস তঁারা পেয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে, তা তাঁদের উৎসাহী করেছে বাংলা সম্পর্কে। 
এবারের বিজনেস সামিট–‌এর আকর্ষণ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে নবনির্মিত বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টার। ঝকঝকে উপনগরী নিউ টাউনের এই আন্তর্জাতিক মানের কনভেনশন সেন্টারে অত্যাধুনিক পরিকাঠামো রয়েছে। সারা পৃথিবী থেকে আসা বাণিজ্য প্রতিনিধিরা মুগ্ধ হবেন সন্দেহ নেই। জার্মানি থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন থেকে চীন, বহু দেশ থেকেই আসছেন সরকারি–‌বেসরকারি স্তরের শিল্প পরিচালক ও শিল্পোদ্যোগীরা। তঁাদের একটা বড় অংশই নীতি নির্ধারণের, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাখেন। তাই শুধু লগ্নি নয়, নানা ধরনের অংশীদারি ও যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনার দিকেও তাকিয়ে রয়েছে রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রীর স্লোগান ‘‌বেঙ্গল মিনস বিজনেস’‌ আলোড়ন ফেলেছে সারা দেশে। তঁার বক্তব্য, এই শিল্প সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলা গঠনের ব্লু প্রিন্ট তৈরি করব। ‘‌কাম টু বেঙ্গল, রাইড দ্য গ্রোথ।’‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top