সৌম্যেন্দ্র ব্যানার্জি:২০০৮ সালে কলকাতায় চীনের কনসুলেট অফিস পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ–সহ ভারতের পূর্বাঞ্চল রাজ্যগুলির সঙ্গে চীনের আদান–প্রদান বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো মাঝেমধ্যে অল্প–স্বল্প জেগে–ওঠা সীমান্তসমস্যা শিক্ষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, বিনোদনের আদান–প্রদানে কখনওই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে না।
একদা দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে আত্মিক সংযোগ বৌদ্ধধর্মের মাধ্যমে স্বর্ণসূত্রে গ্রথিত হয়েছিল, তা নিরবছিন্ন ছিল ১৯৬২ সালের অনভিপ্রেত সীমান্ত সঙ্ঘর্ষের আগে পর্যন্ত। ২০০০ বছরেরও বেশি এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের মধ্যে বরং মৈত্রী ও মানবতার বাণীই বারংবার উচ্চারিত হয়েছে। ৭০ দশকের শেষ ভাগ থেকেই দু’‌পক্ষের প্রয়াস শুরু হয়েছে পুরনো বন্ধনের গরিমা ফিরিয়ে আনতে। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বর মাসে রাজীব গান্ধীর ঐতিহাসিক চীন সফর দু’‌দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পককে আরও ত্বরান্বিত করে।
পঞ্চম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েনই প্রথম চীন থেকে বাংলায় আসেন। সেই সময় তাম্রলিপ্ত— অধুনা মেদিনীপুরের তমলুক ছিল বিখ্যাত বন্দরনগরী ও বৌদ্ধচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। তিনি তাম্রলিপ্ততে দু’‌বছর বৌদ্ধচর্চার পাঠ নিয়ে সমুদ্রপথে সিংহল, অর্থাৎ শ্রীলঙ্কায় চলে যান। পরবর্তীতে হিউয়েন সাঙ, ই–চিঙ, চং তঙ, তাও লিনের মতো আরও অনেক চৈনিকভিক্ষু তাঁরই পথ অনুসরণ করেন। হিউয়েন সাঙ ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে নালন্দায় ছাত্র হয়ে এসে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধপণ্ডিত বঙ্গসন্তান শীলভদ্রের। ৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিভিন্ন জায়গা পরিভ্রমণের পর বাংলার তাম্রলিপ্ততে আসেন। 
মধ্যযুগে বাংলার স্বাধীন সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজমের সময় থেকেই চীনের সঙ্গে বাংলার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের উদ্যোগ শুরু হয়। বাংলার রাজধানী তখন পাণ্ডুয়া। ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে নবাব আজমের নির্দেশে বাংলা থেকে সর্বপ্রথম প্রতিনিধি দল চীনে যায়। অনুরূপভাবে ১৪১২ খ্রিস্টাব্দে চীন থেকে প্রথম প্রতিনিধি দল নবাবের দরবারে আসে। ১৪০৪ থেকে ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত, দীর্ঘ ৩৫ বছরে বাংলা থেকে মোট ১৪টি কূটনৈতিক দল চীনে যায় এবং চীন থেকে চারটি প্রতিনিধি দল বাংলা সফর করে। এই সময় বাংলার সঙ্গে চীনের আমদানি–রপ্তানি ব্যবসাও জমে ওঠে। বিপুল পরিমাণ চীনামাটির পাত্র, চীনা সিল্ক, ঘাসের তৈরি মাদুর চীন থেকে আমদানি হত। চীনে রপ্তানি করা হত সুতির বস্ত্র, বাংলার বিখ্যাত মসলিন, তিলের তেল, সুপারি, গোলমরিচ।
এরপর ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের অধীন হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষদিকে চীন থেকে আগত এক বণিক ইয়াং তাচাও যিনি ইংরেজদের কাছে আচিউ নামেই পরিচিত, বজবজে গড়ে তোলেন চিনির কল ও আখের খেত। সেই জন্য তিনি চীন থেকে নিয়ে আসেন বহু শ্রমিক। পরবর্তী কালে ব্রিটিশদের হাত ধরে বহু শ্রমিক কাজের সন্ধানে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করে। তা ছাড়াও চীনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সামাজিক অস্থিরতা ও চরম দারিদ্র‌্যের কারণে বৃহৎসংখ্যক মানুষ দক্ষিণ চীন থেকে কলকাতায় চলে আসেন। তঁারা বেশিরভাগই চর্মশিল্প, কাঠের আসবাবপত্র, পোর্সেলিন, রেস্তোরঁার মতো ব্যবসায় লিপ্ত থাকে। চৈনিক বাসিন্দাদের নিয়ে কলকাতার বুকে গড়ে ওঠে দেশের সর্ববৃহৎ চায়না টাউন।
১৮৭৫ সালে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চীন ভ্রমণে যান। প্রথমে তিনি হংকংয়ে কিছুদিন কাটিয়ে দক্ষিণ চীনের বাণিজ্যনগরী ক্যান্টন, অধুনা কৌয়াংচৌ শহরে যান। চীনযাত্রার আগে তিনি চৈনিক দর্শন নিয়ে কয়েকটি নিবন্ধ লেখেন তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। কলকাতার আরও এক উচ্চশিক্ষিত বাঙালি উদ্যোগপতি ভবনীপুরের ইন্দুমাধাব মল্লিকও ১৯১১ সালে চীন ভ্রমণে যান। বিংশ শতাব্দীর প্রথম থেকেই বাংলা ও চীনের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগসূত্র গড়ে উঠতে থাকে। ১৯০৮ সালে বঙ্গতনয়া তরু দত্তের ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় লেখা কবিতা চীনা ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির চারটি কবিতা চীনা ভাষায় প্রথম অনূদিত হয় এবং ক্রমেই চীনের এক বৃহৎ পাঠক সমাজে রবীন্দ্রসাহিত্য সমাদৃত হয়ে ওঠে।
বর্ণময় চীন সভ্যতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রবল আগ্রহ ছিল। ১৯২৪ ও ১৯২৯ সালে তিনি চীন ভ্রমণে যান। প্রথম চীন সফরের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‌আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবো, যদি আমার চিন ভ্রমণের ফলে ভারত ও চিনের চিরন্তন সম্বন্ধ পুনরায় নবজীবন লাভ করে।’‌ চীন ভ্রমণের সময় চীনের পণ্ডিত ও ছাত্র–ছাত্রীদের সঙ্গে কবির এক চিরস্থায়ী মণিকাঞ্চন সংযোগ ঘটে। গত শতাব্দীতে এই বাংলাই পেয়ে ছিল ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ চীন–গবেষক ও বিশ্বভারতীর প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক প্রবোধচন্দ্র বাগচীকে।
১৯৪২ সালে চিনের সর্বাধিনায়ক জেনারাল চিয়াং কাইশেক সস্ত্রীক কলকাতায় আসেন। ১৯৩৯ সালে চীনের প্রখ্যাত শিল্পী শুপেই হুং বিশ্বভারতীর কলাভবনের অতিথি–অধ্যাপক হিসেবে একবছরের জন্য আসেন। তঁার অঁাকা ছবি নিয়ে কবির উৎসাহে শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় চিত্র প্রর্দশনী হয়। গত এপ্রিলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীন সফরের সময় চিনের রাষ্ট্রপতিকে শুপেই হুংয়ের শান্তিনিকেতনে আঁকা দুটি ছবির রিপ্রিন্ট উপহার হিসেবে তুলে দেন। পঞ্চাশের দশকে ভারত–চীন মৈত্রীবন্ধনে এক নতুন জোয়ার আসে। ‘হিন্দি–চীনি ভাই ভাই’–এর সেই বিখ্যাত স্লোগানের রচয়িতা ছিলেন কলকাতারই হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। দুই দেশে তৈরি হয় ভারত–চীন মৈত্রী সঙ্ঘ। ১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভারত–চীন মৈত্রী সঙ্ঘ স্থাপিত হয়। হাওড়া, বর্ধমান এমনকী মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত তাদের নিজস্ব শাখা ছিল। সারা বছর ধরে চলত দু’‌দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ। পঞ্চাশের দশকে বাংলার বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনেতা তুলসী দাস লাহিড়ী আধুনিক চীনের মহান লেখক লু শ্যুনের লেখা বিখ্যাত ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় ‘নববর্ষ’ নামে একটি একাঙ্ক নাটিকা লেখেন। সঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে কলকাতা থেকে ত্রৈমাসিক ভারত–চীন পত্রিকাও প্রকাশিত হত।
সাংস্কৃতিক আদান–প্রদানের ভিত্তিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাস, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ডঃ প্রতাপচন্দ্র চন্দ্র, সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্কর–সহ অনেকে এই সময় চীন ভ্রমণ করেন। ১৯৫৭ সালে বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তম গ্রহণ করতে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই কলকাতা ও শান্তিনিকেতন সফর করেন। তিরিশের দশকে
কলকাতায় স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমিকায় এক চৈনিক ফেরিওয়ালার কাহিনী অলম্বনে ১৯৫৮ সালে মৃণাল সেনের পরিচালনায় তৈরি–হওয়া চলচ্চিত্র ‘নীল আকাশের নীচে’ আজও বাঙালিমননে অক্ষয়।‌

জনপ্রিয়

Back To Top