সিদ্ধার্থ জোয়ারদার: এনআরএস–‌এ কুকুরছানা হত্যাকাণ্ডের খবরটি জেনে প্রথমে বেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। রক্তক্ষরণ হচ্ছিল ভেতরে‌। বিবেক বারবার বলছিল, ‘‌...‌I solemnly swear to use my scientific knowledge and skills for the benefit of society through the protection of animal health, the relief of animal suffering...‌’‌
আমার স্থির বিশ্বাস সমস্ত প্রাণী–‌চিকিৎসকের একই অবস্থা হয়েছিল। কারণ তারা প্রত্যেকে স্নাতক হওয়ার শর্ত হিসেবে এই শপথই তো নিয়েছে!‌ 
সে–সময় অনেকেই নার্সিং ছাত্রী দুটির অপরাধ চিহ্নিতকরণের আলোচনায় মেতেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা কুমন্তব্যের ঝড়। চলছে অনৈতিক ও অনভিপ্রেত তর্ক–‌বিতর্ক। এমনকী ব্যক্তিগত আক্রমণ, তাদের পেশাকে জড়িয়ে বিষোদ্গার। কুকুরছানাগুলোকে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনাটিতে প্রাণী চিকিৎসক‌ হিসেবে যেমন কষ্ট পেয়েছি, তেমন‌ সেই ঘটনার জেরে কিছু মানুষের অমানবিক আচরণ ও মন্তব্যে বিস্মিত হয়েছি। প্রাণীগুলোর ওপর করা একটি অপরাধের প্রেক্ষিতে ক্রোধ প্রশমনের অছিলায় সমষ্টিগত অন্যায়। এমনকী আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার ঝোঁক।
মানুষ ও প্রাণীর সহবাস ও নির্ভরতা আজকের নয়। বেশ কয়েক হাজার বছরের পুরনো। ভারতবর্ষে প্রাণীপালনের প্রচলন হয় সভ্যতার আদিকালে খ্রিঃ পূঃ ৬০০০ থেকে ৪০০০— এই সময়কালে। সিন্ধু সভ্যতার সময়কালে (‌খ্রিঃ পূঃ ২৫০০)‌ হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোয় মানুষ ও প্রাণীর সখ্যের পরিচয় মেলে পুরাতাত্ত্বিক নানা নিদর্শনে। প্রাণীপালন যে মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি ছিল, তার বহু প্রমাণ মিলেছে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে। দেহ থাকলেই অসুখ–‌বিসুখ থাকবে— আর রোগবালাই থাকলে তার উপশমে চিকিৎসার প্রকরণও থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষাব্যবস্থা চালু না থাকলেও অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতার গুণে সে সময় প্রাণী চিকিৎসার কাজ করা হত। পরবর্তিকালে অর্থাৎ প্রাক–‌বৈদিক যুগে (‌খ্রিঃ পূঃ ২৩৫০)‌ শালিহোত্রা ও বৈদিক যুগের মাঝামাঝি (‌খ্রিঃ পূঃ ১০০০)‌ পলকপ্য প্রাণী চিকিৎসক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। প্রাণী চিকিৎসার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে (‌খ্রিঃ পূঃ ৩০০)‌। এই সময়ে পৃথক প্রাণী চিকিৎসাশালা (‌হাসপাতাল)‌ তৈরি করা হয়। হাসপাতালে বহির্বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বিভাগে রোগী (‌প্রাণী)‌দের জন্যও ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ পশু ও পাখিদের কষ্ট লাঘবের জন্য মানুষ ছিল যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ও যত্নবান। সারা বিশ্বে প্রাণী কল্যাণ ও প্রাণী চিকিৎসা নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা চললেও এটি কার্যকরী রূপ পেল পৃথক প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মধ্য দিয়ে। সেটা আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে ১৭৬১ সালে ফ্রান্সের লিয়েন শহরে। মানুষ ‘‌পশু’‌কে ‘‌প্রাণী’‌র মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি করল প্রাণীদের ওপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে নানা আইন। নীতিনিষ্ঠ প্রাণী চিকিৎসার সঙ্গে প্রাণী কল্যাণের কথা মাথায় রেখে গড়ে উঠল আইন বিষয়ক শাস্ত্র— ‘‌জুরিসপ্রুডেন্স’‌। আজ প্রাণী চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিটি ছাত্রের এটি আবশ্যিক পাঠ্যবিষয়। সাম্প্রতিক কুকুরছানা–কাণ্ডে বহু আলোচিত ৪২৯, ২০১ ধারা এবং ১১ (‌১)‌ এর এল উপধারা তো এই শাস্ত্রেরই অঙ্গ।
প্রাণীর প্রতি মানুষের অত্যাচার ও অন্যায় কার্যকলাপ ক্রুয়েল্টি টু অ্যানিম্যাল অ্যাক্ট, ১৯৬০–‌এ বিস্তারিতভাবে বলা আছে। আপনি কি জানেন, বাড়িতে পোষা কুকুরকে ঠিকমতো খাওয়া ও পরিচর্যা না করা, বেশিক্ষণ চেন দিয়ে বেঁধে রাখা অথবা তাদের স্বাচ্ছন্দ্যের খেয়াল না করাটা আইনত অপরাধ?‌ আজ এই সমস্ত আইনের ব্যাপক প্রচারের যে গুরুত্ব রয়েছে, তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে। ‘‌অপরাধী’‌ চিহ্নিত করে যাদের শাস্তিবিধানের জন্য দাবি করা হচ্ছে, কুকুরছানা–হত্যা যে আইনত অপরাধ, তা তারা জানে তো?‌ আমরা যদি সত্যিই প্রাণীদের ভাল চাই, তবে প্রাণী কল্যাণের উদ্দেশ্যে তৈরি আইনসমূহের প্রচারের ব্যাপারেও সক্রিয়তা প্রয়োজন। স্বীকার করে নেওয়া ভাল, এ ব্যাপারে আমাদের সকলের ঘাটতি আছে।
প্রাণী ও মানুষের সখ্য গড়ে উঠেছে কিছুটা পারস্পরিক দেওয়া–‌নেওয়ার ওপর ভিত্তি করে। প্রাণী শুধুমাত্র যে সাহচর্য ও চিত্তবিনোদনের উপাদান নয়, সেটা বেশ বোঝা যায় যখন মানুষ প্রাণী উৎপাদিত দেহজ আকর নিজেদের জন্য কাজে লাগায়। দুধ, ডিম, মাংস, উল, চামড়া, হাড় এমনকী কায়িক শ্রম আমরা প্রাণীদের কাছ থেকে আদায় করি। বিনিময়ে খাদ্য ও বাসস্থান দিয়ে আমরা তাদের বেঁচে থাকার রসদ জোগাই। পারস্পরিক এই দেওয়া–‌নেওয়ার সম্পর্কের মাঝে আবেগ যে একেবারে অনুপস্থিত, তা বলার জো নেই। এমনকী গৃহপালিত প্রাণীটিকে অনেক সময়ে পারিবারিক সদস্য হয়ে উঠতেও দেখা গেছে। আমিষ মানুষ উদরপূর্তির জন্য যে মাছ, মুরগি ও প্রাণী হত্যা করে, তা মোটেই উল্লাস করার জন্য নয়। তা তাদের পুষ্টি ও স্বাদের প্রয়োজন মেটাতে। অবশ্য এ কথা ঠিক সেখানে সব সময় মানবিক প্রাণী হত্যার বৈধ নীতি মেনে চলা হয় না। হয় না সম্ভবত এ ব্যাপারে অজ্ঞতার জন্য। এটাকে প্রাণী বিজ্ঞানের প্রচারের দুর্বলতা বলাই যায়।
প্রাণী ও মানুষের সখ্যের নেতিবাচক দিকও আছে। বস্তুত এই নিবিড়তার কল্যাণে বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে কিছু রোগজীবাণুর। তাদের অনভিপ্রেত উপস্থিতি এই সম্পর্ককে কোনও কোনও সময়ে বিষময় করে তুলছে। প্রাণী থেকে মানুষে ও মানুষ থেকে প্রাণীতে এরা রোগের চলাচলকে ত্বরান্বিত করে। পরিভাষায়, এদের জুনোটিক রোগ বা ‘‌জুনোসিস’‌ বলে। জলাতঙ্ক, যক্ষ্মা, অ্যানথ্রাক্স, ব্রুসোলোসিস এ ধরনের রোগ। কুকুর থেকে ভাইরাসজনিত জলাতঙ্ক (‌রেবিস)‌ রোগ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, পরজীবী ও ছত্রাকঘটিত রোগ মানুষে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তাই এই ব্যাপারে সচেতনতা ও সাবধানতা অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রাণী ও মানুষের আন্তঃসম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে, মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশ সংক্রামক রোগ কোনও না কোনওভাবে প্রাণীদের থেকে চলে আসছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানুষ ও প্রাণিস্বাস্থ্য সম্পর্কিত দুটি সংস্থা— ডব্লু এইচ ও এবং ও আই ই এই ঐকমত্যে পৌঁছেছে যে, বিশ্বের স্বাস্থ্যের ভাবনা সামগ্রিকভাবে একটিই হওয়া উচিত। যেহেতু প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী, এক কথায় প্রতিটি জীবই প্রকৃতি নামক একটি পরিবারের সদস্য, তাই একের সুস্বাস্থ্য, অপরের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক দূষণ বা বিপর্যয় যেমন মানুষের অস্বাস্থ্যের কারণ হতে পারে, তেমনি প্রাণী–‌অপুষ্টি ও তার রোগব্যাধি মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটাতে পারে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিভিন্ন মঞ্চে তাই এক স্বাস্থ্যভাবনা অর্থাৎ ‘‌ওয়ান হেল্‌থ কনসেপ্ট’‌ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে প্রাণীদের ওপর নির্যাতন ও খুনের ঘটনা কিন্তু প্রায় নিত্য‌নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের এই তথাকথিত সভ্য সমাজে। এই অপরাধকে প্রতিহত করতে প্রয়োজন আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তা না হলে অপরাধী চিহ্নিতকরণ ও শাস্তিবিধানের মধ্যেই আমাদের সক্রিয়তা আটকে থাকবে। সংবেদনশীল প্রতিটি নাগরিকের মধ্যে প্রাণীদের প্রতি সহমর্মিতার বীজ উপ্ত করতে হবে। আমাদের চারপাশের প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী যে প্রকৃতি নামক একটি পরিবারের সদস্য;‌ আর তাই আমাদের আপন, এই ভাবনায় জারিত করতে হবে প্রতিটি শিশুকে। স্কুলের সিলেবাসে তাই চাই উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের পাঠ— ‘‌এক স্বাস্থ্যভাবনা’‌। সঙ্গে চলুক প্রাণী কল্যাণ বিষয়ক আইনের প্রাথমিক চর্চা। আলাদাভাবে নিজেদের পশুপ্রেমিক হিসেবে পরিচিতি না দিয়ে প্রতিটি নাগরিকই তখন হয়ে উঠবেন পশু (‌পড়ুন প্রাণীমিত্র)‌।
জনবিস্ফোরণ আমাদের জীবনে বেশিরভাগ সমস্যার জন্য দায়ী। আমাদের চারপাশের প্রাণীদের সংখ্যাবৃদ্ধি কোনও কোনও সময়ে আমাদের সমস্যায় ফেলে বইকি!‌ তখন প্রয়োজনভিত্তিক প্রাণিসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হতে পারে। তবে সেই উদ্যোগ হতে হবে মানবিক ও বিজ্ঞাননির্ভর। পথকুকুরদের নির্বীজকরণ এমনই একটি পদ্ধতি। বর্তমানে পুরসভাগুলো দক্ষতার সঙ্গে এই কাজটি করে চলেছে। চাইব এই বিপুল কর্মযজ্ঞে আরও গতি আসুক। প্রতিটি নাগরিকের উচিত তাদের এই কর্মোদ্যোগে শামিল হওয়া ও সাধ্যমতো সাহায্য করা। প্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের দ্বন্দ্বে যবনিকা পড়ুক— এটাই সময়ের দাবি।
(‌‌লেখক পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক)‌‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top