শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়: আপনার প্রথম ছবি ‘‌ইয়াং টোয়েরলেস’‌ কি দেখার সুযোগ পাবেন কলকাতার দর্শকরা?‌
প্রশ্নটা শুনে ফল্‌কার শ্লোয়েনডর্ফ একটু থমকালেন। একটু ভাবলেন। তার পর বললেন, ‘‌না। ওটা থাকছে না।’
কোন ছবিগুলো বাছলেন তা হলে?‌ কীভাবে বাছলেন?‌
হাসলেন শ্লোয়েনডর্ফ। ‌‘‌আসলে যদি গোটা তিরিশেক ছবি কারও তৈরি করা হয়ে গিয়ে থাকে, আর তার মধ্যে কুড়িটা ছবিই নিজের বেশ পছন্দসই হয়, তা হলে তার থেকে সাতটা বেছে নেওয়া বেশ শক্ত। অবশ্যই ‘‌টিন ড্রাম’‌ থাকছে। ওটাকে আমার ‘‌সিগনেচার ছবি’‌ বলা যায়। সব শিল্পীরই এমন অন্তত একটা কাজ থাকে, যেটা তঁাকে চিনিয়ে দেয়। বেটোফেন বললে যেমন ‘‌ওড টু জয়’‌, বা পিকাসো বললে ‘‌গুয়ের্নিকা’‌, তেমন আমার ‘‌টিন ড্রাম’‌। এবং এই প্রথম ছবিটা তার পূর্ণাঙ্গ চেহারায় দেখা যাবে। মানে প্রথমবার চূড়ান্ত সম্পাদনার পর ছবিটা যে চেহারায় ছিল। যেভাবে গুয়েন্টার গ্রাস সেটা দেখেছিলেন। সাত বছর আগে কাজটা আবার নতুন করে শেষ করেছি। গতবার কান উৎসবে যদিও কুড়ি মিনিট ছেঁটে ছবিটা দেখানো হল। সেটা অবশ্য সময় সংক্ষেপ করতে, অন্য কোনও কারণে নয়। কিন্তু এবার পুরো ছবিটা দেখা যাবে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ভারতেও এই প্রথম। সে হিসেবে প্রিমিয়ারই বলা যায়।’‌
১৯৭৯ সালে এই ছবির জন্যই সেরা পরিচালকের অস্কার পেয়েছিলেন ফল্‌কার শ্লোয়েনডর্ফ। অবশ্য টিন ড্রাম–এর চিত্রস্বত্ব দিতে প্রথমে নারাজ ছিলেন গুয়েন্টার গ্রাস। বিস্তর ঘুরিয়েছিলেন। পরে গ্রাসই হয়ে ওঠেন শ্লোয়েনডর্ফের বন্ধু, ‘‌মেন্টর’‌। ওই অস্কার পাওয়ার বছরেই প্রথমবার ভারতে আসেন শ্লোয়েনডর্ফ। যদিও সেন্সরশিপের কঁাচিতে কচুকাটা হয়েছিল তঁার সাধের ‘‌টিন ড্রাম’‌। ভারতে কী দেখানো যায়, আর কী দেখানো যায় না— সেই ‘‌ঠেকে শেখা’‌টা খুব সুখকর ছিল না তঁার জন্যে। এবার টিন ড্রাম ছাড়াও থাকছে আর্থার মিলারের নাটক ‘‌ডেথ অফ এ সেল্‌সম্যান’‌ নিয়ে ছবি। শ্লোয়েনডর্ফের নির্দেশনায় ডাস্টিন হফম্যান আর জন ম্যালকোভিচের তুখোড় অভিনয়। মার্গারেট অ্যাটউড–এর উপন্যাস নিয়ে ‘‌হ্যান্ডমেইড’‌স টেল’‌ এবং নিজের সবচেয়ে পছন্দের ‘‌হোমোফাবে’‌। আছে ফরাসি ছবি ‘‌ডিপ্লোমেসি’‌। আর যে সিনেমা রীতিমতো হইচই ফেলেছিল, সেই ‘দ্য ‌সার্কেল অফ ডিসিট’‌, যার পুরো শুটিংটা হয়েছিল লেবাননের বেইরুটে, গৃহযুদ্ধ চলার সময়! যুযুধান নানা পক্ষের গেরিলা যোদ্ধারা যে ছবির আসল হিরো। ভয়ঙ্কর ব্যাপার তো!‌ শুটিং করলেন কী করে!‌ মুচকি হাসলেন। ‘‌আসলে গৃহযুদ্ধ মানে তো লন্ডভন্ড একটা ব্যাপার।‌ যখন আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে, সভ্য সমাজ ছিন্নভিন্ন। তখন কয়েকটা লোক ক্যামেরা নিয়ে কী করছে, কেউ খেয়াল করে না।’‌
উনিশশো ষাটের দশকের শেষ, সত্তরের দশকের শুরুতে জার্মানির যে নব্য সিনেমা আন্দোলন, তার প্রতিনিধিত্ব করেন ফল্‌কার শ্লোয়েনডর্ফ। ভের্নার হ্যারৎসগ, ভিম ভেন্ডার্স, রাইনার ফাসবিন্ডার–এর সঙ্গে উচ্চারিত হয় তঁার নাম। তঁারই বাছাই সাতটা ছবি এবারের কলকাতা উৎসবে। প্রথম ছবি ‘‌ইয়াং টোয়েরলেস’ সেই তালিকায় নেই। তাও ছবিটার কথা আবার তুলতে হল, স্রেফ তার বিষয়বস্তুর কারণে। অস্ট্রিয়ার এক আধাসামরিক বোর্ডিং স্কুলে এক ছাত্র সহপাঠী এবং সহআবাসিকদের নিয়মিত নিগ্রহের শিকার হয়। আরেকটি ছাত্র দূর থেকে আগ্রহ নিয়ে সেটা দেখে কিন্তু কোনও প্রতিবাদ করে না। একসময় আত্মগ্লানিতে ভুগতে শুরু করে এই ‘নীরব ‌দর্শক’‌ ছেলেটি, সময়, সুযোগ থাকতে কেন কিছু করেনি, সেকথা ভেবে। কান চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত ছবিটি আলোড়ন তুলেছিল, কারণ দর্শকরা নির্ভুল বুঝতে পেরেছিলেন, সামরিক নিয়মে বঁাধা ওই আবাসিক স্কুলের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জার্মানির সাদৃশ্য। যখন ইহুদি সহনাগরিকদের অত্যাচারিত হতে দেখেও বহু জার্মান নীরব দর্শক হয়ে থেকেছিলেন।
আপনার কি মনে হয় না, আজকের ভারতে এই ছবি দেখানোর প্রয়োজন ছিল?‌ যখন সমাজের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখে!‌ যখন ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিপন্ন। 
জবাব দিতে এক সেকেন্ডও নিলেন না শ্লোয়েনডর্ফ। ‘‌শুধু ভারতে নয়, বিশ্বের সর্বত্র এটা ঘটছে। আমাদের জার্মানিতে ২৫ শতাংশ লোক জাতীয়তাবাদীদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে। দেশপ্রেমিকদের নয়, জাতীয়তাবাদীদের। যারা জনজীবনের সঙ্গে কোনওভাবে যুক্ত নয়। কাজেই সময় এসেছে সমাজের ঘুরে দঁাড়ানোর, প্রতিরোধ করার। যা হচ্ছে, হচ্ছে— ভেবে নিশ্চিন্তে বসে থাকার সময় আর নেই। ঠিক যেভাবে বিশ্ব পরিবেশ নিয়ে আর নিরুদ্বেগ থাকা যায় না। লড়তে হবে। কৃষকের জন্যে লড়তে হবে, গাছ বঁাচাতে লড়তে হবে, সমাজের বহুত্ব রক্ষা করতে, সর্বোপরি সমাজে সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে লড়তে হবে। নিষ্ক্রিয়, নিশ্চেষ্ট বসে থাকার সময় এটা নয়। রাজনীতি করব কি না, নীতিগত অবস্থান নেব কি না, পরিবেশকে রক্ষা করব কি না— এই ভাবনাটাই এখন বিলাসিতা, যা আমাদের আর সাজে না। বরং আমার মনে হয়, মানবসভ্যতার, আমাদের অস্তিত্বরক্ষার শেষ লড়াইটা শুরু করেছি আমরা। শেষ দৌড়। এখন শিল্পীদের আরও বেশি সোচ্চার হওয়ার সময়। সমস্যার থেকে, বাস্তবের থেকে তারা মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না!‌’‌
কলকাতায় এই প্রথমবার, কিন্তু কলকাতার দু’‌জনের সঙ্গে বহুদিনের আত্মীয়তা ফল্‌কার শ্লোয়েনডর্ফের। একজন মৃণাল সেন। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে আলাপ থেকে গভীর সখ্য। বহু আড্ডা দিয়েছেন দুজনে। আর অন্যজন ‘‌অপু ট্রিলজি’‌–র সত্যজিৎ রায়। যদিও ব্যক্তিগতভাবে বেশি পছন্দের ছবি ‘‌জলসাঘর’‌। সাক্ষাতে কথা হয়নি কোনওদিন?‌ ‘‌না না। তবে দেখেছি অনেকবার। মিনার–সম ব্যক্তিত্ব। একবার হাত মিলিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ওই হাতটা আর কোনওদিন ধোবো না!‌’‌ হা হা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ৮০ বছরের যুবকের মুখ।   
ছবি:‌ শরণ্য চট্টোপাধ্যায়, গোয়েটে ইনস্টিটিউট, কলকাতা

জনপ্রিয়

Back To Top