ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: মধ্যবিত্তকে কাঁচকলা দেখানোর ফল হাতেনাতে দেখিয়ে দিল শেয়ার বাজার। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সুদের হার ক্রমাগত কমতে থাকায় মধ্যবিত্ত ক্রমশ ঝুঁকছিল শেয়ারে বিনিয়োগে। কিন্তু বৃহস্পতিবার পেশ করা কেন্দ্রীয় বাজেটে অরুণ জেটলি দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভে কর বসানোর সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডের ডিভিডেন্ডের ওপর ১০% কর চাপিয়ে শেয়ারের আকর্ষণকেও অনেকটা নিষ্প্রভ করে তুললেন। তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে মাসের পর মাস ঊর্ধ্বগতিতে ছুটতে থাকা শেয়ার সূচক বিএসই শুক্রবার এক ধাক্কায় ৮৪০ পয়েন্ট, অর্থাৎ প্রায় ২.৩% নেমে গিয়ে বুঝিয়ে দিল, শেয়ার বাজার বাজেটকে কোন চোখে দেখছে। নিফটি নামল ২৫০ পয়েন্টেরও বেশি। শুধু সেনসেক্স সূচকের হিসেবেই লোপাট হয়ে গেল বিনিয়োগকারীদের সাড়ে ৪ লক্ষ কোটি টাকা!‌ ২০১৬–‌র নভেম্বরে নোট বাতিলের পর এমন বিপর্যয় আর দেখেনি শেয়ার বাজার। সরকারি নির্দেশে এলআইসি বা স্টেট ব্যাঙ্কের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিপুল হারে শেয়ার কিনতে নেমে পড়লেও বাজার এখনই চাঙ্গা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতের এই নিষ্প্রভ বাজার থেকে লগ্নি সরিয়ে নিতেই পারেন।    
বস্তুত, আঘাত যে শুধু এক জায়গায় করা হয়েছে তা তো নয়, করা হয়েছে চার জায়গায়। ৪০,০০০ টাকার স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ফিরিয়ে এনে জেটলি আয়করে সামান্য যা ছাড় দিয়েছেন, তা কেড়েও নিয়েছেন আয়করের ওপর সেস ১% বাড়িয়ে। বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাজেটে মধ্যবিত্তের জন্যে কিছু নেই। শেয়ার বাজারের প্রত্যাশা প্রথম ধাক্কা খেল সেখানে। দ্বিতীয় আঘাত এল আর্থিক ঘাটতির জায়গায়।

ভোটের দিকে তাকিয়ে করা বাজেটে ঘাটতি সাধারণত বেড়েই থাকে। তা বলে আগামী অর্থবর্ষে ৩.৩% ঘাটতির জন্যে তৈরি ছিল না বাজার। লক্ষ্যই যদি ৩.৩ শতাংশের মতো চড়া তারে বাঁধা থাকে, তাহলে সত্যিকারের ঘাটতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! এদিকে পেট্রল–‌ডিজেলের দামও কমানো হল না। পেট্রল–‌ডিজেলের চড়া দাম, তার সঙ্গে বিশাল ঘাটতি— জোড়া ধাক্কায় মুদ্রাস্ফীতি চড়তে শুরু করবেই। তার মানে বাড়বে সুদের হার। ঝুঁকি নিয়ে শেয়ার বাজারে লগ্নি এড়িয়ে টাকা ঢুকবে ঝুঁকিহীন বন্ড, ফিক্সড ডিপোজিট, রেকারিং ডিপোজিটের মতো নিরাপদ আশ্রয়ে। আশঙ্কায় কেঁপে উঠলেও শেয়ার বাজার একটু স্বস্তি পেয়েছিল ২৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করা বাণিজ্যিক সংস্থার করের হার ৩০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নেমে আসায়। কিন্তু সেই সাময়িক স্বস্তি ঘুচে গিয়ে স্তম্ভিত শেয়ার বাজার তৃতীয় আঘাতটা পেল বাজেট বক্তৃতার একেবারে শেষ পর্বে, দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভে ১০% কর চাপায়। লোকে বলে, বিজেপি–‌র সরকার আর কিছু বুঝুক না–‌বুঝুক, শেয়ার বাজারটা খুব ভাল বোঝে। সুতরাং শেয়ার বাজারে সুদিনের সুখ ধ্বংস করার মতো কিছু করা সম্ভবই নয় এই সরকারের পক্ষে। কিন্তু সেটাই যখন ঘটল, ঘনিয়ে উঠল হতাশার মেঘ। শেষ পর্যন্ত বাজার ধরাশায়ী করে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট হল চতুর্থ আঘাত। ইক্যুইটি মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর ১০% কর। মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের টাকা যখন হু হু করে ঢুকছে মিউচুয়াল ফান্ডে, তখন সেখানেও কোপ মারলেন জেটলি। অনেকখানি আকর্ষণ হারাল মিউচুয়াল ফান্ড, যা সম্প্রতি একটা বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল শেয়ার বাজারের উজ্জ্বলতার। চড়, লাথি, কিল, ঘুসি— চার গোদা আঘাতের ধাক্কায় শেয়ার বাজার এখন কাহিল। কবে আবার সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াবে, বলা মুশকিল।

জনপ্রিয়

Back To Top