ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: তিন দিন বাদেই বাজেট। নরেন্দ্র মোদি সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট, কারণ ২০১৯ সালের মে মাসে ভোট হলে মাস তিনেকের খরচের সংস্থান ছাড়া ফেব্রুয়ারির বাজেটে আর কিছুই করার সুযোগ থাকে না। অতএব মোদি সরকারের নিত্যকর্মে ভোট–‌কেন্দ্রিকতার কথা মাথায় রেখে প্রত্যাশার কেন্দ্রে একটি জনমোহিনী বাজেট, যা শাসক দলকে সুবিধে করে দেবে ভোটের প্রচারে। প্রত্যাশার কথা যা শোনা যাচ্ছে, তাতে প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতো শোনাচ্ছে কৃষি এবং বিভিন্ন গ্রামীণ যোজনার বরাদ্দ বহুলাংশে বাড়ানোর সম্ভাবনা। না, কৃষি ক্ষেত্রেই দেশের ৪৮.৯% মানুষ কাজ করেন বলে নয়, কৃষিজ উৎপাদন থেকেই জিডিপি–‌র ১৭–‌১৮% পাওয়া যায় বলে নয়, কৃষির বৃদ্ধিহার আগের বছরের ৪.৯% থেকে ২০১৭–‌১৮ সালে ২.১%–‌এ নেমে এসেছে বলে নয়, দেশ জুড়ে চাষির আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে নয়, মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে চাষিদের বিক্ষোভে গুলি চালিয়ে ৫ জনকে মেরে ফেলা হয়েছে বলেও নয়। একটিমাত্র কারণে কৃষি এবং গ্রামীণ ক্ষেত্র এবার অরুণ জেটলির বিশেষ মনোযোগ পাবেই পাবে। সেই কারণটি হল, গুজরাটের গ্রামীণ ক্ষেত্র বিজেপি–‌র থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার হিসেব সে রাজ্যের বিধানসভা ভোটের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠা। ফসল বিমা যোজনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নাম জুড়ে দেওয়ার চমক দিয়ে মোদি সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন, ৫ বছরের মধ্যে কৃষকের আয় দ্বিগুণ হবেই হবে। অথচ, বাস্তবে ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিল করে মোদি ভারতের নগদ–‌নির্ভর কৃষি অর্থনীতির চাকা এমন কাদায় ফেলে দিয়েছেন যে, এক বছর পার করেও শুনতে হল, গুজরাট ভোটে বিজেপি–‌র এমন নাজেহাল হওয়ার কারণ পাস নয়, কাপাস। পাস মানে পাতিদার অনামত আন্দোলন সমিতি, যার নেতা হার্দিক প্যাটেল কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিলেন নরেব্দ্র মোদি–‌অমিত শাহর। আর, কাপাস মানে তুলো চাষিরা, নোটবন্দির অভিঘাতে ফসলের ন্যায্য দাম না–‌পেয়ে যাঁরা ফুঁসছিলেন।
সুতরাং, দেশের বিপুল সংখ্যক কৃষিনির্ভর মানুষের মন জয়ের লক্ষ্যে কৃষি ক্ষেত্রে সোচ্চার কিছু ঘোষণা এই বাজেটে অবশ্যই থাকবে। তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হবে কৃষির বৃদ্ধি হার বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতির বৃদ্ধি হার বাড়ানোর সঙ্কল্প। বেশ কিছু কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যও বাড়ানোর প্রস্তাবও প্রায় অবধারিত। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগে যে সুপারিশ রূপায়ণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মোদি, সেই স্বামীনাথন–‌সুপারিশ মেনে কৃষককে চাষের প্রকৃত খরচের সঙ্গে ৫০% লাভ জুড়ে ফসলের দাম নির্ধারণ করা হবে, বাজেটে এমন ঘোষণার কিন্তু কোনও সম্ভাবনাই নেই। ক’‌দিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে স্বয়ং স্বামীনাথনকে বলতে শুনলাম, গত ৪ বছরে সরকারের পক্ষ থেকে কেউই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
গ্রামীণ ক্ষেত্রে সত্যিকারের লাভজনক কোনও কিছু করার পথে মোদির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠছে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাঁর অবাধ প্রশ্রয়। একদিকে বিভাজনের এই রাজনীতিই মোদির তুরুপের তাস। অন্যদিকে গোহত্যা নিষিদ্ধ করার অনিবার্য ফল হিসেবে দেশ জুড়ে গরু পালন হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়সাধ্য। গোরক্ষকদের তাণ্ডবের ভয়ে গরু তো দূরস্থান, গো–‌বলয়ের মধ্যে দিয়ে মোষের মাংস পরিবহণও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত ঝুঁকিপ্রবণ। ফলে দুধ দেওয়া বন্ধ করা গরু–‌মোষ বিক্রি করে চাষির কাছে যে টাকাটা আসত, সেটা দেশের বেশির ভাগ রাজ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রাজিল আর অস্ট্রেলিয়ার পর ভারত মোষের মাংসের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেব বলছে, এক উত্তরপ্রদেশ থেকেই ২০১৫–‌১৬ সালে গরু–‌মোষের মাংস রপ্তানি হয়েছে ১১,৩৫০ কোটি টাকার। এখন দ্রুত কমছে সেই রপ্তানি এবং সংশ্লিষ্ট মহলের হিসেব বলছে, সারা দেশের ক্ষতির অঙ্কটা ২২,০০০ কোটি ছাড়াতে পারে। কীভাবে সেই ক্ষতি মেটাবেন মোদি–‌জেটলিরা? নান্যঃ পন্থা। গ্রামীণ ক্ষেত্রের উন্নতির লক্ষ্যে বাজেটে যত বড় বড় ঘোষণাই থাকুক, ধর্মকে কেন্দ্রে রেখে যে রাজনৈতিক আদর্শের ধ্বজা তুলে চলছে এই সরকার, তাতে সে কাজটা প্রায় অসম্ভব। ‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top