দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী: এই ক’‌দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন বলছেন, সিদ্ধান্ত পরে হবে। এমন নয় যে হঠাৎ চীনের ওপর সদয় হয়েছেন ট্রাম্প সাহেব। আসল কারণটা হল, এখন এমন কোনও সিদ্ধান্ত হলে মার্কিন অর্থনীতির হাল খারাপ হতে পারে। এমনিতেই বিশ্ব জুড়ে শেয়ার বাজারের মন খারাপ। তার ওপর ইয়োরোপ–এশিয়ার কোনও দেশেই অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি ব্রিটেন জানিয়েছে, গত ত্রৈমাসিকে তাদের বৃদ্ধির হার ছিল নেগেটিভ। জার্মানির অবস্থাও তথৈবচ। পুরো ইয়োরোপ জুড়ে শিল্পের উৎপাদন বাড়ার চিহ্ন নেই। বরং ‌‌কমে যাচ্ছে। চীনে শিল্পের উৎপাদনের বৃদ্ধির হার ১৭ বছরের মধ্যে তলানিতে। ভারতের অবস্থা ততটা খারাপ নয়। কিন্তু গাড়ি শিল্পের মতো কয়েকটা ক্ষেত্রে হাল খুব খারাপ। সব মিলিয়ে যা পরিস্থিতি, তাতে ২০২০ সালের মধ্যেই বিশ্ব জুড়ে মন্দা আসতে পারে।
যদি মন্দা আসে, তাহলে সব থেকে ক্ষতি কিন্তু ভারতের হবে। ভারত এখন প্রায়শই বৃদ্ধির হিসেবে সব থেকে ওপরে থাকে। তবে কখনও কখনও চীন ফের নিজের পুরনো জায়গাটা দখল করে নেয়। আগামী দশকটা অবশ্যই ভারতের হওয়ার কথা। ওই সময়ের মধ্যে ৫ লক্ষ কোটি ডলারের গন্ডি পেরিয়ে ভারতের পৌঁছে যাওয়ার কথা ৬ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে। মন্দার সময় ভারত যদি বৃদ্ধির গতিতে সবার ওপরেও থাকে, কিন্তু সেই হার যদি হয় ৫ শতাংশ, তাহলেও কিন্তু অন্যদের থেকে ভারতের ক্ষতিই বেশি হবে। কারণ, আমরা এখন যে সব লক্ষ্য তাড়া করছি, আমেরিকা, জাপান বা চীন তা অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। ৫ লক্ষ কোটির গন্ডি ‌আমেরিকা পেরিয়েছে ৩০ বছর আগে, জাপান ২৩ বছর আর চীন ১০ বছর আগে। তারপর জার্মানি ও ব্রিটেনও সেই সীমা পেরিয়েছে। এখন মন্দা এলে লক্ষ্যপূরণে আমাদের ক্রমশই দেরি হতে থাকবে।
এই মুহূর্তে মন্দা ঠেকানোর সব থেকে বেশি দায় ট্রাম্প সাহেবেরই। কারণ, সামনের বছর মার্কিন দেশে ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ট্রাম্প হয়তো সুদের হার কমিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন। তাতে ভারতের কিছুটা লাভ হতে পারে। ভারত সুদের হার কমালেও সেই হার আমেরিকার থেকে বেশি। বন্ডের থেকে উপার্জনও বেশি। ফলে বিদেশি পরোক্ষ বিনিয়োগ আরও বেশি করে ভারতে আসতে পারে। এর মধ্যে চীন হংকংয়ে তার কুখ্যাত দমননীতি প্রয়োগ করতে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে। এর ফলে যদি আর একটা তিয়েনআনমেন স্কোয়্যার হয়, তা হলে বিশ্ব জুড়ে চীন–বিরোধী মনোভাব জোরদার হবে। তার ফলেও ভারতের একটা লাভ হতে পারে। চীনে যত অস্থিরতা বাড়বে, যত বেশি বলপ্রয়োগ ঘটবে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তত ভয় পেয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে চীনের বদলে ভারতের পণ্য কেনার ঝোঁকও বাড়তে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ নিতে হলে আমাদের দেশে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, রাজনৈতিক দিক থেকেও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন দরকার। 
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে অনৈক্যের ছবি বারবার ধরা পড়ছে, তা দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভাল বার্তা পৌঁছে দেবে না। রাষ্ট্রনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ ভাল না মন্দ, কড়া রাষ্ট্র তৈরি করা স্বাস্থ্যকর কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। যুগে যুগে পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় এই সংক্রান্ত ধ্যানধারণা চক্রবৎ পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্রিটেনে কখনও ক্লেমেন্ট অ্যাটলি এসেছেন, যিনি ভারত–‌সহ উপনিবেশগুলোকে মুক্ত করা দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। আবার অ্যাটলির ২৮ বছর পরে এসেছেন মার্গারেট থ্যাচার, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘‌আয়রন লেডি’‌ হিসেবে। এদেশে বিতর্ক বেশি, কারণ মনমোহন সিংয়ের মতো নরমপন্থীর পরেই ক্ষমতায় এসেছেন নরেন্দ্র মোদির মতো চরমপন্থী। ফলে ব্যক্তি–স্বাধীনতার পরিসর নিয়ে দ্বন্দ্ব বেধেছে। এই বিতর্ক চলুক। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসরে কিছুটা মতৈক্য যাতে তৈরি হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। আর সেজন্য সরকার পক্ষকেই উদ্যোগী হতে হয়। তা না হলে, দেশি বা বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর মনেই একটা অনিশ্চয়তা কাজ করবে। কারণ, দেশে বা যে কোনও রাজ্যে, পাঁচ বছর বাদে বাদে সরকার তো বদলে যেতেই পারে।
একই কথা প্রযোজ্য সামাজিক ক্ষেত্রেও। অন্যায়, অপরাধ ঘটবে। সারা পৃথিবীতেই ঘটে। কিন্তু তারপর সুবিচার হচ্ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। পেহলু খানের খুনের তদন্ত হয়েছে রাজস্থানে বিজেপি–র জমানায়। কিন্তু চার্জশিট জমা পড়েছে কংগ্রেস ওই রাজ্যে ক্ষমতায় আসার মাস চারেক পরে। অথচ এমন চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল যে আদালত সব অভিযুক্তকে ছেড়ে দিল। এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে?‌ কিছুদিন আগে কিছু বুদ্ধিজীবী মুসলমানের ওপর আক্রমণ–অবিচারের প্রসঙ্গ টেনে মোদিকে খোলা চিঠি লিখেছিলেন। তার জবাবে, অন্য কিছু বুদ্ধিজীবী পাল্টা চিঠি লিখে তাঁদের অভিযুক্ত করলেন অ–সমদৃষ্টি নিয়ে চলার কারণে। দু’‌পক্ষেরই চিঠি লেখার স্বাধীনতা আছে। কিন্তু সব মিলিয়ে এই বার্তাই তো গেল যে ভারতে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ভাল নয়। এভাবে যদি দেশের সাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয়, তাহলে তো বিদেশিরা ভয় পেয়ে যাবেন। 
স্বাধীনতার পর থেকে ’‌৮০ সাল পর্যন্ত ধর্ম ও জাতের নামে মারামারি ছিল ভয়ঙ্কর বেশি। তারপর নিম্নবর্গীয় মানুষের ওপর অত্যাচার কমেছে। বলা যায়, নিম্নবর্গের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নই সঙ্ঘর্ষের পরিধি অনেক ছোট করেছে। কিন্তু ধর্মীয় হানাহানি, আগের চেয়ে অনেক কম হলেও, এখনও আছে। ১৯৮৪ ও ২০০২–এর দাঙ্গা ছাড়াও ওই সময়কালের মধ্যেই নানা রাজ্যে ছোট–বড় দাঙ্গা হয়েছে। তারপর থেকে সাম্প্রদায়িক হানাহানি কিছুটা কমেছে। ২০০৮–এর পর সন্ত্রাসবাদী আক্রমণও কমেছে। মাওবাদী সন্ত্রাসও কমেছে। সব মিলিয়ে সামাজিক ক্ষেত্রে সঙ্ঘাত এখন অনেক কম। কিন্তু তার মধ্যেও কিছু দুষ্কৃতী ধর্ম বা গরুর নামে হিংস্র কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এইসব ঘটনা ঘটে চললে দেশের ভাবমূর্তি যে উজ্জ্বল হবে না, তা কে না জানেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারলে তার চেয়ে ভাল কিছু হতে পারে না। কিন্তু অন্ততপক্ষে সহাবস্থানের পরিবেশ তো বজায় রাখতেই হবে। তার জন্য রাষ্ট্রের দৃঢ়তা প্রয়োজন। কোনও দুষ্কৃতীই যে ধর্মের পরিচয়ের কারণে রেহাই পাবে না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ধর্মের কারণ কাউকে রেহাই দিলে পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেইসঙ্গে সব সম্প্রদায়কেই বুঝতে হবে, আগ্রাসী মনোভাব শুধু দেশেরই ক্ষতি করবে। দেশের ক্ষতি হলে নিজেদের এবং নিজেদের সন্তানদের ক্ষতি হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের দেশ এখন অনেক পরিণত। সামনে অনেক সুযোগ আছে। গত প্রায় ৩০ বছরের চেষ্টায় দেশের অর্থনীতি এখন অনেক, অনেক বেশি গতি পেয়েছে। মন্দা যদি আসে, তার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতাও এখন আমাদের অনেক বেশি। মনে রাখতে হবে, সঙ্ঘবদ্ধ দেশ মন্দার মোকাবিলা করতে পারবে অনেক বেশি দক্ষতার সঙ্গে। যত বেশি আমরা বিভক্ত হব, ততই আমরা পিছিয়ে পড়ব, ততই আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন করে তুলব। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top