প্রচেত গুপ্ত: বাতিল চিত্রনাট্য • তরুণ মজুমদার •দে’‌জ পাবলিশিং • ২৫০ টাকা

‘‘‌আমি চিন্তা করে দেখলুম, পৃথিবীর উপকার করব ইচ্ছা থাকলেও কৃতকার্য হওয়া যায় না, কিন্তু তার বদলে যেটা করতে পারি সেইটা করে দেখালে অনেক সময় আপনিই পৃথিবীর উপকার হয়, নিদেন যা হোক একটা কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। আজকাল মনে হচ্ছে, যদি আমি আর কিছুই না করে ছোটো ছোটো গল্প লিখতে বসি তা হলে কতকটা মনের সুখে থাকি এবং কৃতকার্য হতে পারলে হয়তো পঁাচজন পাঠকেরও মনের সুখের কারণ হওয়া যায়।’‌’
এই উক্তি সবার জানা। ছিন্নপত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সবার জানা সত্ত্বেও আবার বললাম কেন?‌ তরুণ মজুমদারের ‘বাতিল চিত্রনাট্য’ বইটি‌‌ পড়বার পর ছোটগল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পরিচিত একজন মনে করিয়ে দিলেন। যাতে লিখতে গিয়ে ভুল না হয়ে যায়, বই খুলে দেখে নিলাম। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কিছু না করে যদি শুধুই ছোটগল্প লিখতেন কী হত? গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছবি, পত্রাবলী যদি না পেতাম?‌ যদি না পেতাম বিশ্বভারতী?‌ কী হত?‌ তরুণ মজুমদার মহাশয়ের বেলাতেই বা হতটা কী? যদি উনি সিনেমা পরিচালনা না‌ করে, বাঙালি দর্শকের কয়েক প্রজন্মকে বালিকাবধূ, পলাতক, ফুলেশ্বরী, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, সংসার সীমান্তে, গণদেবতা, দাদার কীর্তি–তে আপ্লুত না করে, যদি শুধু গল্পই লিখতেন? কী হত?‌ 
এ–জায়গা‌ সেই আলোচনার নয়। শুধু এইটুকু স্পর্ধা নিয়ে বলি, তরুণ মজুমদার ‘‌বাতিল চিত্রনাট্য’‌ গল্পের বইটিতে অন্য আর কিছুই নন, শুধুই একজন যথাযথ গল্পকার। গল্প এবং লেখকের যাবতীয় দোষ–গুণ নিয়েই সেখানে তাঁকে পাওয়া গেল। গোটা বই জুড়ে তিনি একজন লেখক। গল্পগুলো লিখে তিনি কতটা মনের সুখে থাকলেন, পৃথিবীর আদৌ কোনও উপকার করতে পারলেন কি না বলতে পারব না, তবে এটা বলতে পারি পঁাচ নয়, বহু পাঠকের মনের সুখের আয়োজন তিনি অবশ্যই করেছেন। কোনও গল্প পড়ে আনন্দে মন ভরে গেছে, কোনও গল্পে হয়েছে মন খারাপ। মন খারাপ হওয়াটাও ‘‌সুখ’ বইকি!‌ মানুষের দুঃখে মন খারাপ হলে নিজেকে ‘‌মানুষ’‌ ভেবে সুখই তো হয়। তাই না?‌ লেখক তরুণ মজুমদার বইয়ের তেইশটি গল্পে সেই আয়োজন করেছেন। ‘‌নীলসিন্ধু অভিযানে’‌ আমাদের ছুটিয়েছেন। থমকে দঁাড় করিয়েছেন ‘‌আপন’‌, ‘‌ময়ূরঝরণা’‌য়। ‘‌অদৃশ্য ডাকাতের গল্প’–‌এ হাসিয়েছেন, হাসিয়েছেন ‘‌চিল’‌ লিখে‌। মন খারাপ করিয়েছেন ‘‌সন্তোষবাবুর প্রবেশ ও প্রস্থান’‌–এ। ‘‌যাত্রপ্রসাদ’‌‌‌, ‘‌বাঁশবাগানের গল্প’‌–এ মন করে দিয়েছেন ভারী। ‘‌চানু দত্ত প্রপার্টি সাপ্লায়ার’‌ মন ভরিয়ে দেয়। ‘‌সব ভাল যার’–এ দিয়েছেন অনাবিল আনন্দ। 
লেখকের সব থেকে বড় মু্নশিয়ানা হল গল্পকে একই সঙ্গে তিনি সুখে–‌দুঃখে এঁকেছেন। হাসি মুখে কোনও গল্প পড়তে পড়তে কখন মন ভিজে উঠেছে জানতেও পারিনি। আবার উল্টোটাও। মন খারাপ করা গল্প শেষে গিয়ে মনকে আনন্দময় করে তুলেছে। ‌বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে কৌতুকে ভরা তরুণবাবুর লেখা।  এক–‌একটি চরিত্রকে এঁকেছেন মায়া দিয়ে।‌ গল্প শেষ হলে তাদের জন্য মন কেমন করেছে। অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। ‘‌সত্যমিথ্যা’‌, ‘‌তুচ্ছ মানুষ’‌, ‘‌প্রণাম’‌, ‘‌চোর’‌, ‘‌শিবু’‌, ‘‌শুভচিহ্ন’‌ একবার পড়লে ভুলবে কে?‌ কার আছে এমন বুকের পাটা, মনের জোর?‌ 
অনেকে বলেন, কোনও কোনও লেখক নাকি প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারেন। আমি বলি, এটা কোনও গুণের কথা নয়। প্রকৃতির নিখুঁত বর্ণনা অর্থহীন, যতক্ষণ না তা বাইরের বদলে কাহিনীর ভিতরকার রূপ, রস, গন্ধ হয়ে ওঠে। এই বইয়ের অন্তত পঁাচটি গল্পে তরুণ মজুমদার সেইভাবে প্রকৃতিকে এনেছেন। সেখানে প্রকৃতি ছাড়া গল্পটা সম্পূর্ণ হতই না। কী স্নিগ্ধ সেসব নদী, আকাশ, জল, বঁাশবন, বাংলার আলপথ, প্রান্তর!‌
তেইশটা গল্প নিয়ে তো আলোচনা করা যায় না, আমি বরং প্রথম গল্পটাকেই বেছে নিই।
বাঘকে পায়ের ছাপে, গর্জনে নিজেকে জানান দিতে হয়। বলতে হয়, আমি হাত কচলে, মাথা নত করে তোমাদের সব কথা মেনে নিতে আসিনি। তোমরা যে ঠিক নও, তোমরা যে ভুল এ কথা বলবার মতো সাহস আমার আছে। বড় লেখককেও সেই রাজকীয় পরিচয় দিতে হয়। তাঁকে পায়ের ছাপ ফেলতে হয়। দিতে হয় হুঙ্কার। তাঁর শক্তি থাকে কাহিনীর সততায়, সাহস থাকে নিজের বোধ–‌বুদ্ধি,  বিশ্বাসে। লেখার ভাষা, ফর্মে তিনি রেখে যান পায়ের ছাপ। আর হুঙ্কার থাকে সাহসে।
‘‌‌পলাশবুনির উপাখ্যান’‌ গল্পটিতে সেই গর্জন শুনিয়েছেন গল্পকার। বইয়ের প্রথম গল্প। লেখক হিসবে জাত চিনিয়েছেন। শুটিং নিয়ে লেখা ফিচার আমরা কম পড়িনি। কীভাবে লোকেশন বাছাই হয়, শুটিংয়ের সময় ছোট–‌বড় সব সুবিধে অসুবিধের কথা, শেষ পর্যন্ত কীভাবে কাজ শেষ হয়, সেসবের রোমাঞ্চকর ঘটনা সেখানে থাকে। একে বলে ‘‌শুটিংয়ের গল্প’‌। যদিও আর বেশিদিন ‘শুটিংয়ের গল্প’‌ লেখা হবে না। কারণ আজকাল শুটিং মানে তো ‘‌ভিএফএক্স’‌–এর কারিকুরি। ঘরে বসে কম্পিউটারে ভিস্যুয়াল গ্রাফিক্স। কিছুদিন পরে সিনেমা পরিচালকেরা হয়তো বই লিখবেন ‘একেই বলে ভিএফএক্স’‌!‌ ‘‌‌পলাশবুনির উপাখ্যান’‌ কোনও ‘‌শুটিংয়ের গল্প’ নয়, এই গল্পের মূল চরিত্রটিই হল ‘‌শুটিং’। গল্পের কাহিনী এক সিনেমা পরিচালকের লোকেশন খঁুজে বের করা এবং সেখানে গিয়ে ‌শুটিং করাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়েছে। স্নিগ্ধ কৌতুকে মাখা, মন ভাল করা একটি কাহিনী। তা হলে কোথায় এর গর্জন!‌ আছে। আছে শিল্পের যাবতীয় নিয়ম মেনে, আছে গল্পপাঠের আনন্দতে অঁাচড় না দিয়ে। ধর্মকে নিয়ে যারা ভাগাভাগির মিথ্যে খেলায় মাতে, গর্জন তাদের বিরুদ্ধে। তাই শেষ পর্যন্ত এই কাহিনী এক সত্যদর্শন, মনুষ্যত্ব উপলব্ধির আখ্যান হয়ে দঁাড়ায়। প্রথম গল্পেই লেখক তরুণ মজুমদার বুঝিয়ে ছেড়েছেন, এই বই শুরু করলে এক নিঃশ্বাসে পড়তে হবে। শুধু বিচ্ছিন্ন কয়েকটা গল্প নয়, ‘‌বাতিল চিত্রনাট্য’‌ একটা জার্নি। একটা পথচলা। মানুষকে জানার, ভালবাসার এক অন্বেষণ।
আবার ধার করে বলি, তরুণবাবু তাঁর এক–একটি গল্পের ক্ষুদ্র চিত্রপটের মধ্যে বিশাল ব্যাপ্ত মহাজীবনের ছায়া ফেলেছেন। তত্ত্ব থেকেছে, বিশ্বাস থেকেছে, কিন্তু গল্পের মাধুর্যকে তা কখনও ছাপিয়ে যায়নি। বাংলা ছোটগল্পে এই বইটি জরুরি এক সংযোজন।
পুনশ্চ:‌ একটু ব্যক্তিগত কথা বলি। আমি সামান্য লেখালেখির চেষ্টা করি। চিন্তন, মনন, ‘‌ইনটেলেকচুয়্যালন্‌’‌ পারি না, বুঝি না। সহজ সরল কথা গোদা ভাবে লিখি। ‘‌‌বাতিল চিত্রনাট্য’‌ গল্পের বইটি টেক্সট বইয়ের মতো দাগ দিয়ে পড়েছি। কীভাবে কাহিনী বুনতে হয়ে শেখবার চেষ্টা করেছি। আবার পড়ব। বারবার পড়ব।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top