দেবাশিস পাঠক:‘‌ডিসেম্বর ৬— মসজিদ ভেঙেছি।/‌ সুরাট কানপুর,/‌ বোম্বাই বন্দরে/‌ রক্তে হোলি খেলেছি।/‌ কয়েকদিন বিশ্রাম,/‌ টোটকা ওষুধ—/‌ আবার অসুখ, আবার নেশা/‌ বোম্বাই কলিকাতায় বিস্ফোরণ!‌.‌.‌.‌আমাদের ব্যাধি,/‌ আমাদের নেশা দেখে/‌ দক্ষিণেশ্বরের বারান্দায় ঝোলানো/‌ ক্যালেন্ডারের রামচন্দ্র হাসছে।/‌ গুরুদেব মন্দির থেকে নয়,/‌ মৌলবী মসজিদ থেকে নয়,/‌ কাছাকাছি শান্তিনিকেতন থেকে/‌ একটু শান্তিজল দাও।’‌
কোনও প্রতিষ্ঠিত পরিচিত কবি নয়। এই কাব্যিক দীর্ঘশ্বাস এক রাজনীতিকের। এবং কবি হিসেবেও তিনি বহুল প্রচারিত এবং সতত আলোচিত নন। তা বলে তাঁর কবিতা–প্রকাশ উচ্ছ্বাস নেহাত কম নয়।
তিনি সদ্যপ্রয়াত প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি। কবিতার নাম ‘‌শান্তিজল দাও’‌। কাব্যগ্রন্থের নাম ‘‌অযোধ্যা সায়াহ্নে’‌। ১৯৯৩–‌এর এপ্রিলে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ‌পত্রে স্পষ্ট লেখা, ‘‌ভাই বোন,/‌ বন্ধু স্বজন,/‌ সর্বোপরি ভারতবাসী যাঁরা/‌ সিপাহি বিদ্রোহ থেকে/‌ আগস্ট বিপ্লবের উত্তরাধিকারী—‌/‌ যাঁদের হারালাম/‌ ৬ই ডিসেম্বরের/‌ পর সর্বনাশের আগুনে,/‌ তাঁদের আত্মার শান্তিতে/‌ তাঁদেরই জন্য উৎসর্গীকৃত—’‌। এঁদের কথা ভেবেই কবি প্রিয়র প্রার্থনা, ‘‌‌ইতিহাসে আলো যেন জ্বলে/‌ মানুষের পরিচয়ে/‌ ধর্মের অস্তিত্ব রেখে/‌ ধর্মান্ধের যেন প্রায়শ্চিত্ত হয়।’‌
‘‌এখন মধ্যাহ্ন’‌ ‌কাব্যগ্রন্থেও আছে এরকম হতাশ উচ্চারণ, ‘‌‌বসুন্ধরা কেঁদে বলে আর কত অশ্রু নেব মর্ত্যের ঘাসে/‌ দাঙ্গার কারখানায় বারুদের দোকানদার হাসে/‌ রাবণের কাল শেষে রাক্ষসের অধ্যায় কি শেষ?‌’‌ কবিতার নাম ‘‌হে রাম’‌‌। ‘‌এখন মধ্যাহ্ন’‌র প্রকাশকাল এপ্রিল, ১৯৯২।
শুধু কাব্যিক আর্তি নয়, গদ্যেও সাবলীল ছিল প্রিয়র কলম। ‘‌অনেক রক্ত অনেক নাম’‌ আত্মজৈবনিক। তাতে ধরা আছে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার সময়কার অস্থির জলছবি। ‘‌টেকওভার’‌ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩–‌তে। কয়লাখনি জাতীয়করণ হওয়ার পর জিৎপুর কোলিয়ারিতে দুর্ঘটনা ঘটে। সেই পটভূমিতেই এই উপন্যাস। সেখানকার একটা লাইন, ‘‌.‌.‌. এত কালো এই মাটি যে লাল রক্তগুলোও শুকিয়ে কালো রঙের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে তখন আর কোনো চিহ্ন থাকে না খুনের।’‌ আবার, ‘‌মনের মানুষ’‌ (‌‌প্রকাশ ১৯৯৬)‌‌ একেবারে নিটোল উপন্যাস। প্রকাশ্য রাজনীতির রঙের ছিটেটুকু ছাড়াই। হাজারিবাগ থেকে হলং— এই তার ভৌগোলিক প্রসৃতি। সেখানে নায়ক অমিতাভ নায়িকা সুধার বিষয়ে মাসিকে চিঠি লেখে, ‘‌আমি বনের মধ্যেই মনের মানুষ পেয়েছি ডুয়ার্সের জঙ্গলে। আমার জন্য অন্য চেষ্টা আর কোরো না।’‌
এ কথা ঔপন্যাসিকের একেবারে নিজের কথাও হতে পারে। ১৯৯৪–‌এই তো দীপার সঙ্গে তিনি পরিণয়ের সুতোয় বাঁধা পড়েছেন।
এ ভাবেই জীবনে–রাজনীতিতে অঙ্গাঙ্গি প্রিয়র সাহিত্যসৃজন।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top