হিরণ মিত্র: দুটি বিপরীত ধরনের বই হাতে এল।প্রথমটি চারুকলা, দ্বিতীয়টি বিজ্ঞাপন বা বাণিজ্যকলা।ওই দুটি জগতেই সামান্য ঘোরাফেরার তাগিদে একটা কৌতূহল তৈরি হয়।‌‌ ফাইন আর্টস, শিল্প–‌ইতিহাস যেমন টানে, তেমনি শহরে টিকে থাকার জন্য ছিল বিজ্ঞাপনকর্ম।  ‌আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলা:‌ ‌উন্মেষ পর্বে‌ অসীম রেজ কয়েকজন বিশিষ্ট শিল্পীকে যেমন প্রসঙ্গে এসেছেন, তেমনই আলোচনা করেছেন সাধারণ প্রেক্ষাপট। কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধিত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল, কারণ এটি এক ধরনের রেফারেন্স বই। সংক্ষিপ্ত পরিচয় করিয়ে দেওয়া। লেখকের মত খুব যে একটা ব্যক্ত হয়েছে তা নয়, অনেক উদ্ধৃতি দিয়ে উনি যুক্তি সাজিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাসের ধারা তাতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। রাজা রবি বর্মা, অবনীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, যামিনী রায় ও অমৃতা শের‌গিল— এঁরাই সেই বিশিষ্ট শিল্পী, যাঁরা আলোচনায় এসেছেন। রাজা রবি বর্মা ও অমৃতা শেরগিল— এই দু’‌জনের পাশ্চাত্য প্রভাবিত শিল্পীর মাঝে অন্যদের পেলাম।
লেখকের ভাষায়, ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইউরোপীয় একাডেমিক রীতিতে শিল্পশিক্ষা, নব্যবঙ্গীয় চিত্রকলায় ভারতশিল্পের পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা এবং আধুনিক ইউরোপীয় শিল্পকলার নানান পরীক্ষা–‌নিরীক্ষা যে ক’‌জন শিল্পীকে নতুন পথের সন্ধান দিয়েছেন.‌.‌.।‌’‌‌
অসীম রেজ শিল্পী নন, তাই শিল্পের ভাবনা, নানা খুঁটিনাটি ওঁর পক্ষে বোঝা বা জানা সম্ভব নয়। নানা শিল্প–‌সমালোচকদের দেখাকেই উনি গুরুত্ব দিয়েছেন, সেভাবেই তথ্য ও তত্ত্ব সাজিয়েছেন, বলা যায় একটা ধরতাই, তবুও শিল্পীদের কাজ, প্রভাব, চলন, দর্শন— সব কিছুকেই গুরুত্ব দিয়ে করেছেন সুখপাঠ্য আলোচনা। বাংলায় এই ধরনের বইয়ের যেমন প্রয়োজন, তেমন প্রচেষ্টা চোখে পড়েনি। বাঙালি শিল্পবিমুখ এবং চিত্রকলাকে অবজ্ঞার চোখেই দেখে। সংগ্রহে কোনও আগ্রহ নেই, অর্থের অজুহাত দিলেও মুদ্রিত বা রিপ্রোডাশন সংগ্রহেও আগ্রহী নয়। বিদেশি প্রিন্ট সাজাতে দেখেছি, কিন্তু আলোচ্য শিল্পীদের কাজ দেখিনি। যদিও বাঙালি তার সংস্কৃতি নিয়ে মেকি গর্ব করতে কখনও ভোলেনি। বিনামূল্যে শিল্প সংগ্রহে কারও কারও আগ্রহ দেখা গেছে। সেটুকুই বাঁচোয়া।
কয়েকটি ভুল যেমন, পাশ্চাত্য শিল্পচর্চা ও আধুনিকতার প্রবেশ–‌প্রবন্ধে ‘‌‌সুপারম্ল্যালটিজম’‌ লেখা হয়েছে, হবে ‘‌সুপ্রাম্যাটিজম’‌। অবনীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে ‘‌রাজেশ্বরী অধ্যাপক’‌— হবে ‘‌বাগেশ্বরী অধ্যাপক’‌। ফরাসি উচ্চারণে শিল্পীদের নামেও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। তবুও রেজমশাইকে ধন্যবাদ এমন পরিশ্রমী একটি কাজ করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। ললিতকলা আকাদেমি একসময় স্বল্পমূল্যে এই উল্লেখিত শিল্পীদের কাজের প্রতিলিপি বিক্রি করেছে। তা–ও বিশেষ কেউ সংগ্রহ করেনি। আশ্চর্য!‌
শিল্পীদের নিজস্ব ভাবনা, উক্তি যেমন গ্রন্থিত হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন কলা–‌আলোচকদের ভাবনাও লিপিবদ্ধ আছে। শুধু প্রাথমিক পরিচয় নয়, তার বিস্তৃতি, দর্শন ও গভীর অনুসন্ধিৎসার দিকে লেখক বারবার পাঠককে নিয়ে গেছেন। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্পরচনাকে দেখা, চর্চা করা, আঙ্গিক সম্বন্ধে জানকারি— সব দিকেই রেজমশাই নজর দিয়েছেন। ক্ষুদ্র পরিসরে এত কিছু তুলে ধরা মহৎ প্রচেষ্টা। ধন্যবাদ ওঁকে।
দ্বিতীয় বইটি রংগন চক্রবর্তীর ‘‌এক জীবন বিজ্ঞাপন’‌। খুবই সুখপাঠ্য। এতটাই যে, এক রাতে পড়ে শেষ করি— কৌতূহল, কৌতূহল। যে সময়ের কথা রংগন লিখেছে, আমিও ঘটনাচক্রে ওই সময় বিজ্ঞাপন জগতে মিশেছিলাম। আমার পরিধি খুবই সীমিত ও ক্ষুদ্র ছিল। আমি তো আঁকাআঁকির লোক। তেমন কল্কে পাওয়া কেউ নই। কিন্তু যে সব চরিত্র এই বইয়ে ভিড় করেছে তাঁরা অনেকেই আমার পরিচিত ও আত্মীয়। এই বিজ্ঞাপন জগতে আমার আগ্রহের কারণ শুধু অর্থ উপার্জন করা ছিল না, সামান্য অর্থই আমি পেয়েছি, কারণ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই আমাকে নানাভাবে ব্যবহার করেছে। অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছে। সেটা অন্য প্রসঙ্গ। আমার দেখার ও ভাবনার জগৎকে এই ব্যবহারিক শিল্প পরিবেশ অনেক বিস্তৃতি দিয়েছে, তাই সবই মুখ বুজে মেনে নিয়েছি। রংগন ভুলে গেছে। যে গ্রান্ট–‌এর উল্লেখ ও করেছে, সেখানে একটি বিজ্ঞাপনের খসড়া ও আর্টওয়ার্ক যাতে ওর কপির ভূমিকা ছিল, তা ওই সত্তরের শেষেই ঘটেছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রান্টে যাই। যে ডাক্তারের কথা বলা আছে, তিনি আমার বিশেষ পরিচিত ছিলেন।
রংগন খুবই দক্ষতার সঙ্গে বিজ্ঞাপনের কাঠামো, তার প্রয়োগ, নানা তত্ত্ব— সহজ, সরল এবং আত্মজৈবনিকতার ফাঁকে মাঝে মাঝেই এনে ফেলেছে। এক ধরনের শিক্ষণীয় প্রায় অগোছালোভাবে গভীর খবরাখবর একটার পর একটা এনেছে। যেন মনে হচ্ছে, নিজেকে শিক্ষিত করার ফাঁকে, পাঠককে পাশে পাশে রাখছে মর্যাদা দিয়ে। সেই অর্থে এই বইটি বিশেষ আগ্রহের দাবিদার। সেজন্য এই এক জীবন, শুধুমাত্র রংগনের ব্যক্তিগত, কর্মজীবনযাত্রা, তার সঙ্কট, তার ওঠাপড়া, বাঁক নেওয়াতেই আটকে থাকেনি, এক ধরনের সময়ের, বিজ্ঞাপন শিল্পের একসময়ের, আঙ্গিক ও প্রয়োগের পাঠ হয়ে উঠতে পেরেছে। প্রযুক্তি যত পাল্টে যাক, প্রয়োজন, প্রয়োগ যতই পাল্টে যাক, এই খবরগুলো প্রাথমিক ক্রিয়া বলেই বাতিল করা যাবে না। রাজনীতি, অর্থনীতি, ধনতন্ত্র, সমাজতত্ত্ব, তার সঙ্কট, নানা বিপর্যয়ের কাহিনী এনে বৈচিত্র‌্যময় প্রাসঙ্গিক ও ইতিহাসসচেতন করতে সাহায্য করেছে। রংগন চিরকালই সুলেখক। বড় প্রতিষ্ঠানে ওঁর নিয়মিত কলম আমাদের আকৃষ্ট করত। খুবই আগ্রহ ছিল, ২০০০–পরবর্তী সময়ের চিত্রপরিচালক, চিত্রনাট্য লিখিয়ে রংগনকে পাওয়ার। সেখানে সে হতাশ করেছে। কলম থামিয়ে দিয়েছে। অথবা বলা যায়, নিজেকে সংযত করেছে। সময়–‌সরণি নিয়ে বেশ কিছু সংশয় ও ধন্দ আছে আমার। সব ঠিকঠাক হয়েছে বলে মনে হয়নি। তবুও এত বৈচিত্র‌্য ও ঘটনার ঘনঘটা যাকে আমরা বলি, তাই রংগনের জীবন। ও এখন মুম্বইপ্রবাসী। যাইহোক, ‘‌এক জীবন বিজ্ঞাপন’‌ খুবই সংগ্রহযোগ্য একটি প্রয়োজনীয় বই, দলিল— যা ব্যক্তি রংগনকে পাশে সরিয়ে রাখে। শেষ ঘোষণাটিও খুবই কৌতূহলোদ্দীপক— ‘‌এই কাহিনি সম্পূর্ণভাবেই কল্পনানির্ভর। কোনও জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বস্তু, ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য সম্পূর্ণভাবেই কাকতালীয় ও অনভিপ্রেত— লেখক।’‌‌‌ ■

 

সখী, ভালোবাসা কারে কয়!‌ চিত্রী অমৃতা শেরগিল‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top