অনির্বাণ মজুমদার: সহজ সত্যি কথাটা শুরুতে বলে নেওয়া ভাল। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাস নিয়ে বই খুঁজে পাওয়াটাই দুষ্কর। যতই এটা ‘‌গুগল সার্চ’‌–‌এর যুগ হোক, সবজান্তা এই বস্তুটিও এখানে ডাহা ফেল। নভি কাপাডিয়ার ‘‌বেয়ারফুট টু বুটস:‌ দ্য মেনি লাইভস অফ ইন্ডিয়ান ফুটবল’‌ সে বিচারে এক কথায় অমূল্য। এটা এমন একটা খেলার দলিল, এ দেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা সাফল্য সত্ত্বেও যা জনপ্রিয়তা বা প্রচার এবং প্রসারে একেবারেই দাগ কাটতে পারেনি।
এখন কর্পোরেট জগত ভারতে ফুটবল প্রসারের দায়িত্বটা নিজেরাই কাঁধে তুলে নিয়েছে। তবু এ প্রজন্মের ভারতবাসী রাত জেগে মেসি, রোনাল্ডোদের গিলতে এবং তাদের নানাবিধ কীর্তিকলাপ (‌মাঠে এবং মাঠের বাইরে)‌ নিয়ে খোঁজখবর রাখতে এবং চর্চা করতে গর্ব বোধ করে। এমনকী আবেগের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও বেশ মোটা টাকা খরচ করে বুক ফুলিয়ে বিদেশী ক্লাবগুলোর জার্সি গায়ে চাপানোটা এই প্রজন্মের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। পাশের বাড়ির অর্ণব মণ্ডল, রহিম আলিদের না চিনতে পারা এবং নেইমার, আগুয়েরোদের ডায়েট চার্ট গড়গড় করে বলে ফেলতে পারাটা এখন সোশ্যাল স্ট্যাটাস। এমনকী ব্রিউস্টার, ফোডেন, পাউলিনহোরাও এখন অনায়াসে এ দেশের ড্রয়িংরুমে হইহই করে ঢুকে পড়ছে। 
কিন্তু পাঁচ এবং ছয়ের দশকে ভারতীয় ফুটবল যে বিশ্বমানের খুব কাছাকাছি একটা উচ্চতায় পৌঁছেছিল, সে তথ্য এ প্রজন্মের কাছে অজানা। তার জন্য তারা নির্দোষ। এই বই আমাদের টাইম মেশিনে চাপিয়ে সেই দুনিয়ায় নিয়ে যায়, যেখানে না গেলে চাক্ষুষ করা যাবে না, গত দেড়শ বছরে ভারতীয় ফুটবলের বিবর্তন। নিজের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান এবং সর্বোপরি ঝরঝরে সহজ গদ্যের মাধ্যমেই পাঠককে সেই টাইম মেশিনে চাপানোর কাজটা করেছেন কাপাডিয়া।‌
সাংবাদিক, ধারাভাষ্যকার, লিখিয়ে এবং প্রেমিক হিসেবে কাপাডিয়া প্রায় ৬০ বছর ধরে ভারতীয় ফুটবলকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তারই ফসল এই ৩২৩ পাতার বই, যার পড়তে গিয়ে একই রকম ভাবে ভয়, বিস্ময়, আনন্দ, উত্তেজনা তৈরি হয়। ১৯৬৫ সালে মোহনবাগান–‌অন্ধ্র পুলিস ডুরান্ড কাপ সেমিফাইনালের বর্ণনা পড়লে মনে হয়, এই বুঝি আম্বেদকার স্টেডিয়াম (‌তৎকালীন দিল্লি গেট স্টেডিয়াম)‌ থেকে বেরলাম।‌
১৯১১–‌র আইএফএ শিল্ডে মোহনবাগান, ১৯৩৭ সালের রোভার্স কাপে বাঙ্গালোর মুসলিমস, ১৯৪০–‌এর ডুরান্ড কাপে মহমেডান স্পোর্টিংকে ভারতীয় ফুটবল পেয়েছিল। ১৯৬২–‌র জাকার্তা এশিয়ান গেমসে পি কে ব্যানার্জি, চুনী গোস্বামী, তুলসীদাস বলরাম, জার্নেল সিংরা সোনা জেতার পর ভারতীয় ফুটবলের নাম হয়েছিল ‘‌ব্রাজিল অফ এশিয়া’‌। বিশ্বের ক্লাব ফুটবলে সেরা পঞ্চাশটি দ্বৈরথে ইস্টবেঙ্গল–‌মোহনবাগান জায়গা করে নিয়েছিল। কীভাবে একটা সময় ফুটবলের জোয়ারে ভেসেছিল কলকাতা, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, চেন্নাই, পাঞ্জাব, কীভাবে একটা উন্নয়নশীল দেশের কর্মীশ্রেণির জনমানসে প্রভাব ফেলেছিল এই জয়, এই বইয়ে রয়েছে তার বর্ণনা। কিন্তু তবু কেন ভারতীয় ফুটবল বঞ্চনার গল্প হিসেবেই থেকে গেল, কেন বিভিন্ন সরকার এই বিপুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে পারল না, কর্পোরেট জগত বিনিয়োগে অনিচ্ছুক হল, আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে উঠল না, মজবুত ইউথ ডেভলপমেন্ট সিস্টেম তৈরি করা গেল না, সেটাও বোঝা যাবে কাপাডিয়ার লেখায়। 
এই বই নিজেই প্রশ্ন তোলে, ভারতীয় ফুটবল কি সত্যিই ‘‌বেয়ার ফুট’‌‌ থেকে ‘বুটস’‌ হয়েছে?‌‌‌ ■

 

আমাদের ফুটবলের আইকন।
 

জনপ্রিয়

Back To Top