শ্বেতা চক্রবর্তী: ‘‌মহাবিহঙ্গের পাখসাট’‌ কাব্যগ্রন্থটিতে বস্তুত কবি সুধীর দত্ত তাঁর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতা নিয়ে একটি কাব্যসংগ্রহ তৈরি করেছেন। বইটিতে কবি রসাত্মক কাব্যকে নিদারুণভাবে আঘাত করে সুতীব্র দার্শনিক জিজ্ঞাসায় স্থিত হয়েছেন। এমন আশ্চর্য পরাবিদ্যার উন্নয়নে প্রতি মুহূর্তে মার খায় আমাদের অপরাবিদ্যা;‌ যদিও অপরাবিদ্যাকে সত্যবিদ্যা বলে গ্রহণের প্রবণতা কোনও দার্শনিকের থাকতে পারে না।
‘‌পাখসাট’‌ কথাটি ‘‌পক্ষ বিধুনন’‌ অর্থে গৃহীত হয়। এই তিতির পাখির (‌‘‌তৈত্তিরীয়’‌ উপনিষদখ্যাত)‌ পাখার বিস্তার স্বর্গ, মর্ত্য এবং পাতালকে অধিকার করে তীক্ষ্ণ, ক্ষুরধার জিজ্ঞাসায় স্থিত হয়। ‘‌যুধিষ্ঠির’‌ কবিতায় স্বর্গের শান্তির মধ্যে কবি খুঁজে পেয়েছেন অশান্ত বিক্ষোভ। পঞ্চেন্দ্রিয়ের আর্তি এক বিপুল যন্ত্রণায় স্তব্ধ হতে চায় সেখানে। মানবপাখার এই অদ্ভুত নিয়তি গ্রাস করে রাখে যুধিষ্ঠিরকে। শেষে তিনি নির্বিকল্প মানুষের দিকেই তাঁর যাত্রা শেষ বলে বিবেচনা করেছেন। শৃঙ্গার, করুণ, মধুরের অনুপস্থিতি এই কবির কবিতায় পদে পদে। বরং অদ্ভুত রসের সমূহ প্লাবন কবির কবিতাকে পাঠযোগ্যতার অতীত কোনও মহাবিশ্বে বা মহাজাগতিকে নিক্ষেপ করে।
‘‌স্তনাগ্রের মতোই উদ্যত তোমার বর্শা’‌ বিদ্ধ করুক কামার্ত আত্মাকে, এ কথা যখন কবি বলেন, তখন অতীত ভবিষ্যৎ অতিক্রমী এক মহাজাগতিক বেদনাবোধে স্থিত হয় পাঠক। কবির আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মদর্শন তখন সত্যিই ‘‌ক্ষুরস্য ধারা নিশিতা দুরত্যয়া দুর্গং পথস্তৎ কবয়ো বদন্তি’‌। তবে কবির এই চিত্রকল্পে উল্লম্ফনজনিত একটি অনৌচিত্ত–‌দোষ ঘটেছে। কবির সীমাবদ্ধতাও এক্ষেত্রে প্রকট। আত্মাবদমনের চেষ্টায় আত্মছলনার ইঙ্গিত রয়ে যায়। এ কবির কবিতা তাই কোথাও কোথাও আত্মপ্রতার্য হয়ে ওঠে।
‘‌গরল’‌ কবিতায় কবির ভাষা অনেক সহজবোধ্য হয়ে আসে। ‘‌শিহর’‌ শব্দটির লৌকিক প্রচলন এবং কবির ভাবার্তি বা রূপার্তি বা কামার্তি যা–ই বলি না কেন, ‘‌নাভির নীচে গরল ফেটেছে’‌— শব্দবন্ধগুলিতে যেন সেই জ্ঞানদাসের রূপানুরাগ মর্মরিত দীর্ঘশ্বাসে জমে ওঠে। তবে নাছোড় ও গভীর তিক্ত বিবিক্তি কি কোনও অপরিচিত জীবনসংরাগের বাণীবাহক হয়?‌ কে জানে কবির অভীষ্ট ঠিক কী!‌ কবির মৌনকাম কখনও কখনও পাঠককে বিভ্রান্ত করে।
‘‌গুরু নিতম্ব ওই যে রমণীটি/‌ঝরনা বরাবর হাঁটছে/‌আমার অবসর, আমার প্রিয়সখী’‌— ‘‌নান্দনিক’‌ কবিতার এই বর্ণনায় কবি সুধীর তাঁর সুধীরীয় কাঠিন্য ত্যাগ করে শৃঙ্গারের পথে চলেন যখন, তখন সম্ভোগস্তর অতিক্রম করে কখনও বা বিপ্রলম্বের স্বেদবিন্দু কবিতার কপোলে, ললাটে, চিবুকে আমরা প্রত্যক্ষ করি। মেদহরণী বিষণ্ণতায় বাঁধা পড়ে যায় মহাবিহঙ্গের বিধুনন, আছড়ে পড়ার শব্দে মোহিত হয় যৌনতা, মথিত হয় বীণাপাণির নিথর পদ্মবন।
‘‌কবি ও কামুক’‌ কবিতায় লাস্য–‌পটীয়সী রমণীর সুপটু দু’‌হাতে, নখের আঁচড়ে, ঠোঁটের নিষিদ্ধতায় কবি সর্বভুক অগ্নির সর্বগ্রাসিতা এবং ব্রহ্মাস্বাদ সহোদরতা উপভোগ করে বস্তুত বারবার শরীরকে চালিত করেন আত্মার দিকে।
‘‌একাদশ বল্লী’‌ কবিতায় সুরা, শায়র ও নদীমুখ খুলে দেওয়া উদ্ভিন্ন প্রিয়তমার কাতরোক্তি সেই সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের অবরুদ্ধতাকে গ্রহণ ক‌রে চার মাথার মোড়ের রিকশা স্ট্যান্ডে আশ্চর্য সমাপতন লাভ করে।
সুধীর দত্তের কবিতা অলস দুপুরের অলসাবসরের কাব্যপাঠ নয়, কবি পাঠককে দাঁড় করিয়ে রাখেন, প্রতি মুহূর্তে চৈতন্যে ঘা মেরে জানিয়ে দেন, কাব্য বড় কঠিন বিষয়, সে হেলার নয়, খেলার নয়, সে জ্ঞানের, বোধের— সে শ্রোতব্য, মন্তব্য, নিদিধ্যাসিতব্য। সে চৈতন্যের উন্মুখ, দৃপ্ত, সারগর্ভ মহাসুন্দর, যাকে পাঠ করা যায়, করায়ত্ত করা যায় না;‌ যার জন্যে একজীবন যথেষ্ট নয়;‌ যে জননান্তর সৌহৃদানি;‌ মায়া বা মতিভ্রম যে;‌ যার শুরু নেই, শেষ নেই;‌ যে ব্রহ্মাতিরিক্ত ব্রহ্ম;‌ যার অনুভবই জীবনের সারসত্য, আত্মার আনন্দ, সুস্থতার স্মারক।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top