সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়

আমরা পিনাকীদার কবিতা পড়ে বড় হয়েছি। ওঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় কৃত্তিবাস পত্রিকার দপ্তরে। তখন তো কবি পিনাকী ঠাকুরের কেবলই ভক্ত আমি। সদ্য লেখালেখি শুরু করেছি। সে সময়ে আদর্শ স্থানীয় এমন একজন মানুষকে সামনে থেকে দেখে, সামান্য কিছু কথা বলে কেমন একটা মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল। হয়ত সেই মুগ্ধতার জন্যই পিনাকীদাকে পরে একটু দূরবর্তী একটা আসনে বসিয়ে ফেলেছিলাম। আর তাই প্রচণ্ড ব্যক্তিগত স্তরে আলোচনার পরিসর হয়ত কোনওদিন ওঁর সঙ্গে তৈরি হয়নি আমার। 
যে কথা বলছিলাম, আমার তখন দু–একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। গড়িয়াহাটে কৃত্তিবাসের দপ্তরে গেছি কবিতা জমা দিতে। কৃত্তিবাসের অফিসটা খুঁজে পাওয়া একটা গোলমেলে ব্যাপার ছিল আমার জন্য। অফিসের ফোনে ফোন করলে পিনাকীদা ধরতেন, আমাকে রাস্তা চিনিয়ে দিলেন সেদিনও। গিয়ে দেখলাম, শান্ত, নম্র স্বভাবের একজন মানুষ বসে আছেন দপ্তরে। কবিতা পড়ে একজনের পাঠকের মনে কবির একধরণের চেহারা তৈরি হয়, পিনাকীদার লেখা পড়ে আর পিনাকীদাকে দেখে সেই চেহারা মিলত না ।  ওঁর কবিতার ভাষার চেয়ে ওঁর দৈনন্দিন, ওঁর ব্যবহার খুবই আলাদা। তাই কবিতার থেকে ফুটে ওঠা যে অবয়ব তার থেকে ব্যক্তি পিনাকী দা খুবই  অন্যরকম । 
পরে কৃত্তিবাসের  সঙ্গে যখন আমি যুক্ত হই তখন পিনাকীদার সঙ্গে দেখা হতে শুরু করল অনেক বেশি। তবে কবিতার  বিষয় নিয়ে কোনওদিন ওঁর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা আমি করিনি। তবে হ্যাঁ কৃত্তিবাসের আয়োজন করা একটা চৌমাথা,  যার বিষয় ছিল 'নব্বই নট আউট' সেইটার প্রশ্ন করা,  কথার সূত্র ধরে দেওয়া, রেকর্ড করা এইসবের ভার ছিল আমার আর অভিজিত দার(অভিজিৎ বেরা) ওপর। সেবারে অবশ্য কবিতাকে ঘিরে ওঁর ভাবনা, ওঁর বোধ এইসব প্রসঙ্গ এসেছিল সেই আড্ডায়।  আসলে কবিতার বাইরেও ওঁর  এই যে অর্থ বা খ্যাতির প্রতি উদাসীনতা তা  আমাকে নাড়া দিয়েছে বারবার।  আশ্চর্য লাগত ভাবতে, একটা লোক নিশ্চিত চাকরির মোহ কাটিয়ে কেবল মাত্র কবিতাকে নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সারাজীবন জুড়ে এত কষ্ট সহ্য করেছেন। পুঁজিবাদ ছুঁতেও পারেনি ওঁকে৷ আমাদের কবিতা যাপন যখন থেকে শুরু তখন থেকেই  অনেকে পিনাকীদার কবিতার ভক্ত। বইমেলার সময় যে কজন কবির বই কেনা মোটামুটি ঠিক করা থাকত আগে থাকতেই  তাঁদের মধ্যে পিনাকীদা অন্যতম। তাই কবি হিসাবে আমার মননে, চিন্তায় ওঁর উপস্থিতি অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। আর পিনাকী ঠাকুর তো শুধু নিজে লেখেননি, বরং অনেক বেশি করে অন্য লেখকদের উৎসাহও দিয়েছেন।তরুণদের।  বারবার করে বলেছেন, লেখো। আমার মনে আছে, মাঝে আমি অসুখে পড়েছিলাম। তখন পিনাকীদা ফোন করে বলেছিলেন, ‘‌তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো। শরীর ঠিক না থাকলে লেখা চালিয়ে যাবে কি করে?‌’‌ মানেটা স্পষ্ট। পিনাকীদা চাইতেন আমাদের মতো নতুনরা যাতে লেখে,  যাতে স্থান পায়। প্রথমদিকে কৃত্তিবাসে কবিতা দিয়ে আসতাম, পরের দিকে এমনও হয়েছে, পিনাকীদা ফোন করে বলেছেন গুচ্ছ কবিতা জমা দেওয়ার কথা। আর পিনাকী ঠাকুর এমন কথা বলছেন ভেবে একা একাই আনন্দ পেয়েছি খুব। আসলে এইগুলোই তো প্রাপ্তি। পিনাকী দা চাইতেন, চারিদিকে, সবাই, লিখুক, স্থান পাক তাঁদের সৃষ্টি।আর তাই তিনি ভরসা যোগানোর মতো করে লিখে যেতে পেরেছিলেন ‘‌আর কোনো ভগবান না থাকলেও আমরা রইলাম!’‌
 

জনপ্রিয়

Back To Top