কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী:
(বহুরূপে ভাষা [‌প্রয়োগের বাংলা, ব্যবহারের বাংলা]‌ • সঙ্কলন ও সম্পাদনা শ্যামশ্রী বিশ্বাস সেনগুপ্ত • প্রতিভাস • চার খণ্ড • 
প্রতিটি ২৭৫ টাকা)

মজবুত সুগঠিত চারখানি বই সম্পাদকের দপ্তর থেকে আমার কাছে আসতেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে হতচকিত ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। কারণ স্কুল–জীবন থেকেই অঙ্ক এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্বকে সচেতন ও সর্বতোভাবে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করেছি।
পরে পাতা উল্টে বুঝতে পারি, যাচ্চলে, এ তো ভুরু–কুঁচকোনো গোঁফ–বাগানো গুরুগম্ভীর সেই ভাষা নয়— বরং এ হল ভাষা–ভাষা খেলা, যা–কিনা শেষ পর্যন্ত এক–একটি রম্যরচনা–সম। আর যেমন ওই গদ্য–পদ্যের চৌকাঠ–ডিঙোনো শিল্পমাধ্যমটির প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ, তেমনি না–গুরু না–লঘু এই মনোভঙ্গিটির প্রতিও আমার তীব্র টান।
তবে ভাষা মানে তো শুধু ব্যাকরণ নয়, সে তো পরে মানুষ তৈরি করেছে, আসলে তো ভাষা মানে মনের প্রকাশভঙ্গি, ইঙ্গিতে–ভঙ্গিতেও যে–ভাষা প্রকাশিত হয়ে চলেছে প্রতি মুহূর্তে। যেমন ‘‌সুভা’‌ গল্পের নামচরিত্রটির মধ্যে:‌ ‘‌সুভার কথা ছিল না, কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল— এবং তাহার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতো কাঁপিয়া উঠিত। কথায় আমরা যে–ভাব প্রকাশ করি, সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো.‌.‌. কিন্তু কালো চোখকে কিছু তর্জমা করিতে হয় না— মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে, ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত হয়, কখনো মুদ্রিত হয়.‌.‌.‌ যাহার অন্য ভাষা নাই, তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর.‌.‌.‌। .‌.‌.‌ প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। .‌.‌.‌ নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর, সমস্ত মিশিয়া’‌ সুভার ভাষা তৈরি করেছিল। আমরা সেই ভাষা হারিয়ে কৃত্রিম নির্মিত ভাষার অ আ ক খ–তে নিজেদের অনুবাদ করে প্রকাশ করি। ফলে ইঙ্গিতে, ভঙ্গিতে, সঙ্গীতের সুরে নিজেদের ভাষাকে মেলাতে পারি না। দিনানুদৈনিকতার সেই কেজোঘেমো উচ্চারণকেও বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করে শ্যামশ্রী বিশ্বাস সেনগুপ্ত একটা কাজের কাজ করেছেন। আমরা মনে যা ভাবি, মুখে তা বলি না। আবার মুখে যা বলি, কাজে তা করি না। এই যে ভাষা–গোপনের ভাষা তারও বহু বিচিত্র স্তর–পরম্পরা। বিষয় ভাগ করে দিয়ে বিভিন্ন লেখককে দিয়ে সম্পাদক সেই জরুরি ভাবপ্রকাশকেও তাঁর বিস্তারিত পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করেছেন এই চার খণ্ডে।
এই চার খণ্ডের সূচনায় চারখানি মূল্যবান ভূমিকা লিখেছেন যথাক্রমে পবিত্র সরকার, উজ্জ্বলকুমার মজুমদার, নবনীতা দেবসেন ও শঙ্খ ঘোষ। প্রথম খণ্ডে ‘‌সমালোচনার ভাষা’‌ (‌উজ্জ্বলকুমার মজুমদার), ‘‌আ মরি বাংলা ভাষা’‌ (‌বাণী বসু)‌, ‘‌ম্যাজিকের ভাষা’‌ (‌পি সি সরকার, জুনিয়র)‌, আড্ডার ভাষা (‌অরুণ ঘোষ), ‘‌প্রবাসী বাঙালির ভাষা’‌ (‌বিপ্লব চক্রবর্তী)‌, এফ এম–এর ভাষা (‌কৃষ্ণশর্বরী দাশগুপ্ত), অশ্লীল ভাষা (‌নকুলচন্দ্র বাইন), খবরের ভাষা (‌নন্দিনী বন্দ্যোপাধ্যায়)‌, প্রেমের ভাষা (‌বিপ্লবকুমার ঘোষ)‌, ঝগড়ার ভাষা (‌অনামিকা মণ্ডল)‌ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ রয়েছে, যা চেহারায় ছোট কিন্তু চরিত্রে নয়। এর মধ্যে ‘‌প্রবাসী বাঙালির ভাষা’‌ প্রবন্ধে প্রবাসী বাঙালি লেখকদের ভাষা–বৈচিত্র‌্য এবং ‘‌‌আড্ডার ভাষা’‌ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসুর বিখ্যাত রম্যরচনাটি ছাড়াও পরশুরামের ‘‌লম্বকর্ণ’, ‘‌চিকিৎসা সঙ্কট’‌, ‘‌দক্ষিণরায়’‌ প্রভৃতি গল্পে আড্ডার ভাষা প্রসঙ্গ উল্লেখিত হলে ভাল হত।
দ্বিতীয় খণ্ডে পবিত্র সরকারের ‘‌নৈঃশব্দ্যের ভাষা’‌। বিষয়ের গভীরতা ও প্রকাশের বিস্তারে প্রথমেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শঙ্খ ঘোষের প্রাসঙ্গিক বইটির উল্লেখ করেছেন লেখক। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থের কথাও মনে পড়ে ‘‌হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’‌। এই তথ্যের গুরুত্বে ও তদতিরিক্ত‌ ভাবনার সম্ভারে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘‌তৃতীয় লিঙ্গের ভাষা’‌ প্রবন্ধটি সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। তাঁর ‘‌হলদে গোলাপ’‌ নামে উপন্যাসটি পাঠককে পড়তে বলব। মানস মজুমদারের ‘‌দেহকেন্দ্রিক ভাষা’‌ ও পিনাকেশ সরকারের ‘ছাত্র পড়ানোর ভাষা’‌ অধ্যাপকোচিত জ্ঞানগর্ভ দুটি প্রবন্ধ। শ্রাবণী পালের ‘‌হারিয়ে যাওয়া বাংলা ভাষা’‌ ও শোভন তরফদারের ‘‌বিজ্ঞাপনের ভাষা’‌ পড়ে মনে হল যে, এ নিয়ে তাঁরা নিশ্চয় পরবর্তী কালে বিস্তারিত গবেষণা করবেন। ক্লাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের ইঙ্গিতপূর্ণ খবরের ঝুলির ওপর অমিতাভ দাসের প্রবন্ধটি চিন্তার উদ্দীপক। ঋতম মুখোপাধ্যায়ের ‘‌অন্তর্জালের ভাষা’‌ও পাঠকের অলস ভাবনাকে উসকে দেয়। সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটি প্রবন্ধ তৃতীয় খণ্ডের প্রথম দুই রচনা:‌ রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌মনকেমনের ভাষা’‌ ও জয়া মিত্রের ‘‌কারাগারের ভাষা’‌। তবু কোথায় যেন বিষয়দুটির অন্তর্গূঢ় মিল আমাদের আলোড়িত করে। না বলা বাণীর ঘন যামিনীকে স্পর্শ করেছে অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ‘‌না বলা ভাষা’‌ নামে ছোট্ট রচনাটি। সফিউন্নিসার ‘‌মুসলিম ঘরোয়া ভাষা’‌ পড়ে মনে হল, এত অল্প কথায় এত বড় বিষয়কে শুধু ছোঁয়াই যায়। সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌প্রত্যাখ্যানের ভাষা’‌য় চন্দরার ‘‌মরণ’‌ আছে, কিন্তু ‘‌চারু কহিল, না থাক’‌ নেই। তারাশঙ্করের ‘‌না’‌ যে আসলে শেষ পর্যন্ত গ্রহণের ‘‌হ্যাঁ’‌, সেই বার্তাও থাকতে পারত।
চতুর্থ খণ্ডের সবথেকে মনকাড়া প্রবন্ধ জয়ন্ত দে–র ‘‌ভয়ের ভাষা’‌, যা লেখকের ‘ভয়! ভয়!’ উপন্যাসটিকে মনে পড়ায়। এ ছাড়া সুভাষ ভট্টাচার্যের ‘‌শিষ্টাচারের ভাষা’, শিবাজিপ্রতিমের ‘‌জোটের ভাষা’‌, দেবারতি মিত্রের ‘‌স্মৃতিচারণের ভাষা’‌ প্রবন্ধগুলি অবশ্যপাঠ্য।
পবিত্র সরকার তাঁর ভূমিকায় ভাষাতত্ত্বের মূল কথায় প্রবন্ধের উদ্বোধন করেই প্রাণীর জান্তব ভাষার সঙ্গে মানুষের জটিল মনের ভাষা–বৈচিত্র‌্যের তফাত উল্লেখ করেছেন। তার পর শিল্পের ভাষার চিরন্তনতায় প্রবেশ করেছেন। উজ্জ্বলকুমার তাঁর দ্বিতীয় খণ্ডের ভূমিকায় ধরতে চেয়েছেন এযাবৎ ব্যবহৃত ভাষার নিরিখে কীভাবে ব্যাকরণ রচিত হয় এবং সেই নির্মাণকে ডিঙিয়ে কীভাবে নতুন ভাষা জন্ম নেয়, সেই প্রসঙ্গ। তৃতীয় খণ্ডের ভূমিকায় নবনীতা দেবসেন ওই খণ্ডের বত্রিশটি প্রবন্ধের বিষয়–বৈচিত্র‌্যকে ব্যাখ্যা করেছেন। সবথেকে গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রচনাটি বোধ করি শঙ্খ ঘোষের লেখা। একেবারে গোড়ায় বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থের তফাত ধরার পর ভাষায় স্বরের স্তর নিয়ে তিনি ভেবেছেন ও আমাদের ভাবিয়েছেন। কিন্তু কথ্য ভাষার এই বিভিন্ন ঝোঁককে কথাসাহিত্যিক কীভাবে তাঁর লেখায় প্রাণ দেন, সে–প্রসঙ্গে যাননি। হাল আমলের বাংলা ভাষার সংক্ষেপীকরণের দৃষ্টান্তগুলি চমকপ্রদ। আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক বাংলা ভাষার উদাহরণ রূপে বাঙাল ভাষার বৈচিত্র‌্যকে সরস ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন শঙ্খবাবু। তবে ‘‌মেয়েদের ভাষা’‌র ওপর প্রবন্ধের অনুপস্থিতি নিয়ে তাঁর অনুযোগকে মেনে নিতে পারলাম না। গ্রিয়ারসনের যুগ পেরিয়ে যেখানে বাঙালি এসে আজ হাজির হয়েছে, সেখানে ছেলে ও মেয়ের ভাষায় আর কোনও পার্থক্য আছে কি?‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top