তাপস গঙ্গোপাধ্যায়:
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও বাঙালি সমাজ • জাহিরুল হাসান •‌ পূর্বা • ৩০০ টাকা • 
প্রথম প্রকাশ জানুয়ারি, ২০১৮

প্রকাশের সময় গোড়াতেই উল্লেখ করলাম একটি কারণে। সেটি হল প্রকাশের সময়ই বলে দিচ্ছে বইমেলায় পাঠকের, বিশেষ করে সিরাজ–‌গুণমুগ্ধ পাঠকদের হাতে বইটি তুলে দেওয়াই লেখক ও প্রকাশনা সংস্থার প্রাথমিক উদ্দেশ্য। জাহিরুল হাসান এর আগেও জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। ঘটনাচক্রে তাঁর প্রতিটি জীবনীগ্রন্থ রচিত হয়েছে বাঙালি মুসলমান লেখকদের নিয়ে এবং তাঁরা হলেন কাজী আবদুল ওদুদ, রেজাউল করিম, জসীমউদ্দীন এবং মুসলিম নারী রোকেয়া এবং তাঁর আগে ও পরে। এই অবধি লিখেই এই সমালোচক, না আলোচকের মনে হল আরে আমি কাদের মুসলমান লেখক বলছি!‌ এঁদের চেয়ে বড় ধর্মাধর্মের ঊর্ধ্বে বাঙালি অতীতে ক’‌জন ছিলেন বা আজও ক’‌জন আছেন?‌ আর বয়সে অনেক ছোট হলেও একসময় এই আলোচক সিরাজের সঙ্গে পাশাপাশি টেবিলে বসে খবরের কাগজে কাজ করেছে। টানা ১০ বছর। নিজের দাদা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের চেয়ে কোনও অংশে কোনওদিকে মানুষ হিসেবে খাটো ছিলেন না সিরাজদা। সিরাজদার মতো মুক্তচিন্তার বাঙালি লেখকের সাক্ষাৎ সারাজীবনে পেয়েছি কি?‌ মনে করতে পারছি না। তাই শুরুতেই জাহিরুলকে জানাই অকুণ্ঠ অভিনন্দন সিরাজদার মতো মানুষের জীবনীগ্রন্থ তিল তিল করে রচনার জন্য। এটি কোনও সামান্য জীবনীগ্রন্থ নয়, জীবনীসৌধ। এই গ্রন্থটির নির্মাণনৈপুণ্যের পরতে পরতে রয়েছে স্থাপত্যের পাথুরে দৃঢ়তা।
কেন স্থাপত্য?‌ কারণ স্থাপত্য নির্মাণে তরল আবেগের কোনও স্থান নেই। জাহিরুলও ভাষার ভাসমান ভেলায় সিরাজকে চাপাতে চাননি। তাই তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু, তারও আগে তাঁর ঠাকুর্দা ও বাবার আখ্যান টেনে এনেছেন সিরাজকে বোঝার জন্য। কেন একজন প্রকৃত লেখক কোন বই কখন লেখেন তার একটা পটভূমি থাকে। এ ব্যাপারটা বাংলা জীবনীগ্রন্থে প্রথম তুলে ধরেন প্রভাত মুখোপাধ্যায়, পরে প্রশান্ত পাল। তাঁদের দুজনের লেখার উদ্দিষ্ট ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এরপর যাঁদের রচিত জীবনীগ্রন্থ পড়ে উপকৃত হয়েছি তাঁরা হলেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন (‌আকবর)‌, ইন্দ্রমিত্র অর্থাৎ অরবিন্দ গুহ (‌করুণাসাগর বিদ্যাসাগর)‌, শ্রীঅজিতকুমার চক্রবর্তী (‌মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ)‌ আর গোলাম মুরশিদ (‌আশার ছলনে ভুলি)‌। আকবর পড়েছি বাংলা অনুবাদে। মূল ইংরেজিতে পড়েছি সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির জীবনী The Life and Letters of Raja Rammohun Roy‌, লেখিকা সোফিয়া ডবসন কোলেৎ।
হ্যাঁ, জাহিরুলের সিরাজ–‌জীবনীটিও এই বইগুলির সমপর্যায়ের। ওঁর লেখার পরতে পরতে সিরাজের জন্মভিটের মাটি, গ্রামের চেহারা, মহকুমা ও জেলার সার্বিক অবস্থা এবং রাজ্যের হালহকিকত সব সাজানো রয়েছে। আর প্রতি পরতে রয়েছে সেই পরতের মানুষজনের বৃত্তান্ত যা ছাড়া সিরাজকে বোঝা দুরূহ হয়ে পড়ত। সিরাজ শব্দটির মানে যে সিরাজ নিজেই জানতেন না, তা তাঁকে বলে দেন বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক সন্তোষকুমার ঘোষ তা সিরাজই অকপটে স্বীকার করেছেন। অথচ সিরাজ আরবি ও ফারসি ভাষায় রীতিমতো পণ্ডিত। তিনিই জানতেন না যে নামের কারণে তিনি নিজেই ‘‌প্রদীপ’‌। অর্থাৎ আলো।
জাহিরুল নিজের অজান্তেই সিরাজ–‌জীবনী লিখতে গিয়ে একটি অত্যুজ্জ্বল প্রদীপের কাহিনী রচনা করেছেন যা স্বাদে হায়দরাবাদি বিরিয়ানির সমতুল। এই বিরিয়ানির সঙ্গে কোনও কাবাব বা রোগন জুশের দরকার নেই। প্রয়োজন টক দই দিয়ে তৈরি খানিকটা রায়তা, হজমের জন্য।
খুব সঙ্গত কারণেই জাহিরুল সিরাজের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস অলীক মানুষের কথা বারবার বলেছেন। আমার মতে, স্বাধীনতার পরবর্তী ৭০ বছরে বাংলা ভাষায় যে ক’‌টি উপন্যাস প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার তার অন্যতম অলীক মানুষ। এত বাজে বই বিভিন্ন সময়ে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে কিন্তু সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘‌ঢোঁড়াইচরিতমানস’‌ এবং সিরাজের ‘‌অলীক মানুষ’‌কে দেওয়া হোক বলে ইংরেজিনবিশ বাঙালি লেখক–‌অধ্যাপকরা কখনও নোবেল কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠাননি। কেন?‌ স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ–‌এর চেয়ে যে ভাষায় মানুষ বেশি কথা বলে সেই বাংলার এই দুটি বই কেন নোবেল পায়নি?‌ সারা পৃথিবীতে, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, বরাকভ্যালি–সহ গোটা পৃথিবীতে আজ বাংলাভাষীর সংখ্যা ৩৫ কোটি। সংখ্যার দিক থেকে সব ভাষার মধ্যে পঞ্চম। স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ দুই ভাষার জনসংখ্যার যোগফল বড় জোর ৩০ কোটি। 
লেখার শেষে জাহিরুলের একটি ত্রুটির উল্লেখ না করে পারছি না। ‘‌লেখকের কথা’‌ থেকে ‘‌কৃতজ্ঞতা স্বীকার’‌ ১৫ পরিচ্ছদে বিন্যস্ত বইটিতে দুটি পাতা কি বের করা চলত না যাতে পাঠক একসঙ্গে পেতে পারত সিরাজের লেখা তাবৎ গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, মূল্যবান চিঠি ও কবিতার তালিকা?‌ ৬ পাতা জুড়ে জাহিরুল ছেপেছেন কোন কোন পত্রপত্রিকা ও বই পড়ে তিনি এই জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছেন। কোনও দরকার ছিল?‌‌‌ কারণ, প্রতি পরিচ্ছেদের শেষে তিনি তাঁর লেখার সূত্র তো আগেই তুলে ধরেছেন।‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ■

সেই চেনা মেজাজে সিরাজ।‌

জনপ্রিয়

Back To Top