সুদীপ বসু:

‌দুর্গামঙ্গল • সম্পাদনা দেবায়ন চৌধুরী • দে’জ পাবলিশিং •
৩০০ টাকা

‘‌প্রাচীনেরা দুর্গাকে যে–চক্ষে দেখিতেন, সে–চক্ষু আমরা হারাইয়াছি। তাঁরা যে–ভাবে দুর্গাপূজা করিতেন, আমাদের পক্ষে তাহা সম্ভব নহে। অথচ এই পূজার সময়ে আমাদের মনটাও কেমন কেমন করিয়া উঠে!... প্রাণ নাচিয়া উঠে!...প্রতিমা–পূজা
বাঙ্গলার বিশেষত্ব।’‌ ভাবব্যাকুল ওই কথাগুলি বলেছেন ‘বাঙ্গালীর প্রতিমা–পূজা ও দুর্গোৎসব’‌ রচনায় বিপিনচন্দ্র পাল (নারায়ণ পত্রিকা কার্তিক ১৩২২)। বিপিনচন্দ্রের এই লেখায় জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি–যুক্ত দুর্গাপুজোর
বিবর্তনের যে–রূপরেখা আছে তা সম্প্রতি পেলাম দেবায়ন চৌধুরী সম্পাদিত ‘দুর্গামঙ্গল’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থের দুই মলাটে আছে পঁচিশটি নানা স্বাদ ও ভাবনার লেখা। প্রবন্ধ, গদ্য, কবিতা, আখ্যান— এই চারটি পর্বে গ্রন্থটি বিন্যস্ত। দুর্গাপুজোর তাত্ত্বিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদির ভিত্তিতে যেমন প্রবন্ধগুলি
লিখিত, তেমনি স্মৃতির সরণি বেয়েও উঠে এসেছে দুর্গাপুজো। কয়েকটি লেখা পুরনো পত্রিকা থেকে পুনর্মুদ্রিত। রূপনারায়ণ ঘোষ, দ্বিজ রামচন্দ্র প্রমুখ সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিদের রচিত দুর্গামঙ্গল কাব্যনামটির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে
আলোচ্য গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে তা বোঝাই যায়। এ–ও ঠিক যে এখানে পুরাতন চিন্তা ছাপিয়ে নবভাষ্যের উদ্যোগ আছে।
এই গ্রন্থের প্রথমে আছে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির ‘শ্রীশ্রীদুর্গা’
রচনাটি। দুর্গাপুজোর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করে যোগেশচন্দ্র জানিয়েছিলেন— ‘‌দুর্গা কে? ইহার ত্রিবিধ উত্তর পাইয়াছি। আধ্যাত্মিক অর্থে দুর্গা বিশ্বরূপা মহাশক্তি। পঞ্চভূতের মধ্যে দুর্গা অগ্নিরূপা। ইহা আধিভৌতিক অর্থ। দুর্গা রুদ্রদেবের শক্তি। ইহা আধিদৈবিক অর্থ।’‌ অর্ঘ্যদীপ্ত কর, অর্জুনদেব সেনশর্মা,
সনৎকুমার নস্কর, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, নির্মাল্যকুমার ঘোষ, শুভাশিস চৌধুরী, কৌষিকী দাশগুপ্ত, অঞ্জন সেন, বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ বসু, সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপঙ্কর ঘোষ প্রমুখের নানা ভাবনার লেখাও উল্লেখযোগ্য।
প্রসঙ্গত, মন্দিরগাত্রে চিত্রিত বাংলার দুর্গা আর ভারতের দুর্গামূর্তির তুল্যমূল্য বিচার করেছেন শ্রীলা বসু। টেরাকোটা ভাস্কর্যে দুর্গামূর্তি কীভাবে রূপায়িত হয়েছেন, তার পরিচয় এখানে পাই। রামযাত্রার বিশিষ্ট পরিচালক, অভিনেতা এবং
দলপতি মোহন দাসের স্মৃতি থেকে ‘অকাল বোধন’ পালার কিয়দংশ শ্যামল বেরার প্রবন্ধে উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যাত হয়েছে।
কোচবিহার বয়েজ ক্লাবের উদ্যোগে এই সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থে সেখানকার দুর্গাপুজোর বিশেষ ছবিও আছে। কিংবদন্তি অনুসারে কোচবিহারে রক্তবর্ণা দশভুজা দুর্গামূর্তির পুজোর প্রচলন করেছিলেন রাজা বিশ্বসিংহ মতান্তরে তাঁর পুত্র রাজা নরনারায়ণ। সেই পুজোর বিস্তৃত বিবরণ আছে জীবনকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের রচনায়। আর আদিম জনজাতির বৃক্ষপুজোর সঙ্গে দুর্গাপুজোর সম্পর্ক দেখিয়েছেন বার্ণিক রায়। কোচবিহার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো–কেন্দ্রিক বর্ণময় আখ্যানসমূহের ব্যাখ্যা–সহ
রাজবাড়ির সেকালের পুজোর আচার ব্যাখ্যা করেছেন স্বপনকুমার রায়। রাজ–অনুগ্রহে মার্কণ্ডেয় পুরাণের চণ্ডী অধ্যায়ের দেবীমাহাত্ম্য অংশের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন
কবি বৈদ্যনাথ। কোচবিহার রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত এই পুঁথি সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখেছেন নৃপেন্দ্রনাথ পাল।
কোচবিহারের রাজনগরনিবাসী এবং একালের অন্যতম কথাকার অমিয়ভূষণ মজুমদার বলিষ্ঠভাবে জানিয়েছেন তাঁর কালের সমাজমানসিকতা— ‘‌তখন নরবলি হত না। মানুষকে, সে অপরাধী প্রমাণিত হলেও, পিটিয়ে মারা হত না; টাকার অভাবে
মেয়েদের বিয়ে দিতে বাপের চোখে জল আসত, কিন্তু মেয়েদের পুড়িয়ে ঝুলিয়ে মারাটাকে চালু করা যায় নি। তখনো নিজেকে হিন্দু বলতে এত লজ্জা করত না। ...তখনো বারোয়ারী হত, সর্বজনীন শুরু হয়নি, কিন্তু ইয়ার বলতে শুধু ইয়ারকির
উৎস বোঝাত না, বন্ধুবান্ধবও বোঝাত।’‌ অমিয়ভূষণের মুক্তমনের পরিচয় পাওয়ার জন্য এই লেখাটি পড়া আমাদের সবারই পক্ষে জরুরি। রাজনগরকন্যা মণিদীপা নন্দী বিশ্বাসের ছোটবেলার দুর্গাপুজো কিংবা পবিত্র সরকারের বিজয়াদশমী পালন বড়ই স্মৃতিমেদুর। কোচবিহারের উল্টোদিকে আছে বরেন্দু মণ্ডলের ছেলেবেলায় দেখা সুন্দরবনের সাতজেলিয়ার দুর্গাপুজো।
বলা বাহুল্য ‘দুর্গামঙ্গল’ গ্রন্থের ছাপাই–বাঁধাই–কাগজ উচ্চমানের। এই বইয়ের প্রথম ও চতুর্থ প্রচ্ছদ গণেশ পাইন ও নন্দলাল বসুর দুর্গামূর্তির‌ অলঙ্করণে সজ্জিত। এ হল গ্রন্থের বিশেষ গৌরব। আমাদেরও।‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top