সুধীর দত্ত: 
অনন্ত আর আশ্রম • জয় গোস্বামী • ‌ভালো বই • ৪০ টাকা
একজন কবির আত্ম‌জিজ্ঞাসা, তার দৈবী এষণা ও কল্পনাসামর্থ্য যে তাঁকে কোথায় পৌঁছে দিতে পারে জয় গোস্বামীর ‘অনন্ত আর আশ্রম’‌ তার আক্ষরিক প্রমাণ। ছোট্ট বইটির পরতে পরতে রয়েছে এক আশ্চর্য খোঁজ ও বিস্ময়, প্রাণপাত ও পরিশ্রম। এবং এক চোখ–‌খুলে থাকা অন্তর্দৃষ্টির সামনে উন্মোচিত ‘‌অনন্ত’‌ শব্দের নিগূঢ় রহস্য। ‘‌অনন্ত’‌?‌ অনন্ত কী?‌ কাকে বলে অনন্ত?‌ এই দার্শনিক প্রশ্নটি স্বতঃ উঠে আসে, তাঁকে আলোড়িত করে তার শোওয়ার ঘরের আলমারির গায়ে দাঁড় করানো একটি ছোট্ট বই, ‘‌অনন্ত আশ্রম’‌। এটি কবি বিভাস রায়চৌধুরির একটি কাব্যগ্রন্থ। মলাটের ‘‌অনন্ত’‌ কথাটিতে বারবার আটকে যায় চোখ। শব্দটি তিনি বহুবার ব্যবহার করেছেন কবিতায়, নিজের মাপমতো। এটি কি ‘‌শ্রবণসুন্দর একটি অলঙ্করণ মাত্র?‌’‌ শব্দটির ‘‌একটা আবছামতো আন্দাজ’‌ পেয়েছিলেন বিজ্ঞানী সোমক রায়চৌধুরির একটি লেখা থেকে। তা আরও পরিষ্কার হল তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর, যখন বুঝলেন দুটি নিউট্রন–তারা কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একজন মিশে যায় আরেকজনের ভিতর। ব্রহ্মাণ্ডের ভিতর দিয়ে ছুটতে শুরু করে বিপুল শক্তিপ্রবাহ। আলো। জয় দেখলেন আমাদের মহাকবি, জয়ের ঈশ্বর এই বিস্ফোরণকে বহু আগেই ধরেছেন তাঁর কবিতায় ‘‌.‌.‌.‌শূন্য হতে জ্যোতির তর্জনী/স্পর্শ দিল একপ্রান্তে স্তম্ভিত বিপুল অন্ধকারে’‌। আর একজন লিখলেন, ‘‌শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়’‌। তার স্মরণে এল আর্থার সি ক্লার্কের লেখা একটি উপন্যাসের কথা:‌ ‘‌200l, A SPACE ODDISSEY;‌ যেখানে নভোশ্চর ডেভিড বোম্যান এক তলহীন ‘‌অনন্ত’‌‌–এর মধ্যে ডুবে যেতে যেতে উচ্চারণ করলেন তাঁর শেষ বাক্য:‌ ‌‘‌OH MY ‌GOD! —ITS FULL OF STARS’‌‌। এ যেন কবির ‘‌প্রলয়তোরণ চূড়া হতে/অসংখ্য অপরিচিত জ্যোতিষ্কের নিঃশব্দতা মাঝে/‌মেলিনু নয়ন’‌–‌এর অনুভব। বিজ্ঞান, দর্শন, কাব্য এবং উপন্যাস মিলেমিশে যায় উপলব্ধির একত্বে। লয় হয় না কোনো কিছুরই। না দেহগত উপাদানপুঞ্জের, না আত্মার। মৃত্যু হয় না রবীন্দ্রনাথেরও। জয় গোস্বামী প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করেছিলেন, তাঁর কোনও কোনও উপাদান কীভাবে তাঁর রানাঘাটের অঙ্কের দিদিমণির মধ্যে বেঁচেছিল রূপান্তরিত হয়ে। আর ‘‌আশ্রম’‌কেও আশ্রমে নয়, জয় খুঁজে পেয়েছিলেন ‌জাগতিক জীবনে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া দু–‌একজন মানুষের একাকিত্বের মধ্যে। রচনাটি শেষ হয়েছে এক ব্যক্তিগত গভীর হাহাকারে:‌ ‘‘‌‌আজ আর কোথাও ‘‌অনন্ত’‌ নেই। কোথাও ‘‌আশ্রম’‌ নেই’‌’‌, কেননা সেই ‘‌আশ্রম’‌ ছেড়ে রানাঘাট লোকালে উঠে সে একদিন পৌঁছে গিয়েছিল মেফিস্টোফিলিসের হাত ধরতে, ১৫৮৮ সালে। আর পাঠক দেখেন, যে অন্ধকারকে এমনভাবে চিহ্নিত করতে পারে সে আলোতেই আছে।‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top