পলাশ বরন পাল‌:
খুঁজি খুঁজি ব্যোমকেশ • সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী • 
দীপ প্রকাশন • ১৫০ টাকা

‌বইয়ের ভূমিকায় (‌যাকে বলা হয়েছে ‘‌উপক্রম’‌)‌ লেখক বলেছেন, বইটির নাম ‘‌ব্যোমকেশচরিত্র’‌‌ রাখার সাধ ছিল তাঁর। ভালই হয়েছে এ নাম রাখেননি শেষ পর্যন্ত। কেননা বইটি শুধুই গোয়েন্দা ব্যোমকেশের চরিত্র ও ইতিহাসবিশ্লেষণ নয়, তার সঙ্গে সঙ্গে ব্যোমকেশের স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানসলোকেও পরিভ্রমণ।
ইশকুলের সাহিত্যপাঠের পরীক্ষায় কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে দু’‌পাতা লেখার অভিজ্ঞতা আমাদের সকলেরই আছে। সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী যে সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে একখানা আস্ত বই লেখার পরিকল্পনা করবেন, সেটা তাঁর অসীম সাহসের পরিচয়। এবং শতখানেক পৃষ্ঠার সে বই যে কোথাও ঝুলে যায় না, আগাগোড়া পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, সেটা তাঁর অসাধারণ ক্ষমতার পরিচয়। অবশ্য সব পাঠকের কথা তো বলা সম্ভব নয়— আমি আমার কথা বলছি।
কী কী বিষয় আলোচিত হয়েছে বইয়ে, তার কিছু নমুনা দিলে হয়তো অন্য পাঠকও উৎসাহিত হতে পারেন বইটি পড়তে। ব্যোমকেশের জন্ম কত সালে, এটা একটা প্রশ্ন। নানা গল্প থেকে নানা কথার উল্লেখ করে সিদ্ধার্থ দেখিয়েছেন, ব্যোমকেশ মোটামুটি তার স্রষ্টার সমবয়েসি। এইবার তা হলে দ্বিতীয় প্রশ্ন উঠে আসছে— আর কোন কোন ব্যাপারে শরদিন্দুর সঙ্গে তার মিল?‌ শরদিন্দু কি নিজের আদলেই গড়ে তুলেছেন তাঁর গোয়েন্দাকে?‌ নাকি লেখক শরদিন্দুর সঙ্গে মিল লেখক অজিতের?‌ অজিত এবং ব্যোমকেশের সম্পর্ক কেমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে দু‌জনের বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে?‌ সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ এবং ভূতান্বেষী বরদার মোলাকাত হলে লেখক শরদিন্দুর পক্ষপাতের পাল্লা কি কারুর দিকে হেলে থাকে?‌ আরও নানা প্রসঙ্গ, মনোজ্ঞ আলোচনা।
সেই সঙ্গে শরদিন্দু সম্পর্কেও নানা প্রশ্ন। কেন শেষদিকের ব্যোমকেশ কাহিনীগুলো অজিতের বয়ানে বলতে চাননি তিনি?‌ কবে, কখন তিনি সাধুভাষা থেকে চলিত ভাষার আশ্রয় দিলেন, এবং কেন?‌ এই দুটো প্রশ্নের মধ্যে কি কোনও সম্পর্ক আছে?‌
আ‌রও আছে। ব্যোমকেশ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক মাঝে মাঝেই এনে ফেলেছেন অন্যান্য সাহিত্যিক গোয়েন্দাদের প্রসঙ্গ। এসেছে চেস্টারটনের ফাদার ব্রাউনের কথা, ডরোথি সেয়ার্সের বইয়ের কথা। এবং, অবশ্যই, শার্লক হোমস। হেমসের সঙ্গে ব্যোমকেশের সাদৃশ্য কোথায় আর বৈসাদৃশ্যই বা কোথায়, তা নিয়ে উপভোগ্য আলোচনা করেছেন সিদ্ধার্থ। সাদৃশ্যের কিছু কিছু ব্যাপার হয়তো সব পাঠকেরই চোখে পড়ে— যেমন হোমসের ওয়াটসনের মতো ব্যোমকেশের অজিত, এবং দু‌জনের একত্রে এক বাসায় বসবাস। পরবর্তী জীবনে ব্যোমকেশ সংসারী, শার্লক অকৃতদার— সেখানে প্রকট বৈসাদৃশ্য। কিন্তু সিদ্ধার্থ এমন অনেক প্রসঙ্গও উত্থাপন করেছেন যা সচরাচর আমরা চিন্তাও করি না। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে মনে ধরেছে দুই গোয়েন্দার নামের শেষাংশের মিল— ইংরেজি ‘‌lock'‌ ‌কথাটার একটা অর্থ ‘‌চুল’‌, অর্থাৎ ‘‌কেশ’‌। সিদ্ধার্থ বলেছেন, এ মিল ‘‌হয়তো আপতিক’‌। হয়তো, তবে নিশ্চিত করে কে বলতে পারে?‌
দু–‌একটি শব্দের ব্যবহার নিয়ে আমার মনে খটকা লেগেছে, যেমন ৩৩ পৃষ্ঠায় ‘‌অতিপ্রাকৃততে’‌ (‌আমি হলে লিখতাম ‘‌অতিপ্রাকৃতে’‌)‌ এবং ‘‌অতিপ্রাকৃত–‌র’‌ (‌হাইফেন কেন?‌)‌ শব্দে বিভক্তির ব্যবহার। তবে এসব ছোটখাটো ব্যাপার। বড় ব্যাপারটা হল, ‘‌খুঁজি খুঁজি ব্যোমকেশ’‌ বইটি আদ্যোপান্ত উপভোগ করেছি আমি, আশা করি অন্য পাঠকও করবেন।‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top