তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: পথ চলাতেই আনন্দ • ‌বিজনকুমার ঘোষ • লালমাটি • ‌২০০ টাকা
বেশ কয়েক বছর পরে দেখা হল বিজনের সঙ্গে। পুরো সত্তর দশক এবং আশি‌র দশকের অক্টোবর, ১৯৮২ পর্যন্ত একসঙ্গে কাজ করেছি কলকাতার এক বড় সংবাদপত্র অফিসে। বিজন ছিল সাব–‌এডিটর, সমালোচক–রিপোর্টার। ‌একই হলঘরে প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকলে দু’‌সার টেবিলে দেখা যেত সে–যুগের সব বাঘা রিপোর্টারকে। আর মাঝের দরজা দিয়ে ঢুকলে কী চোখে পড়ত তা বিজনের কথাতে বললে সবাই বুঝতে পারবেন— ‘‌সন্তোষকুমার ঘোষ তখন ডাকসাইটে বার্তাসম্পাদক। নানান ডিপার্টমেন্ট থেকে লোক এনে ভরিয়ে দিলেন ডেস্ক। হয়ে গেল চাঁদের হাট!‌ কে নেই সেখানে?‌ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শেখর বসু, হিমানীশ গোস্বামী, সমর মিত্র, বিক্রমণ নায়ার প্রমুখ।...‌শ্যামল বললেন, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ডেস্ক।’‌ আমি বলব ষাট, সত্তর, আশির দশকের গোটা বাংলা সাহিত্য তখন ওই সাবিং ডেস্ক। বিজনও ওদেরই একজন ছিলেন।
রিটায়ার করেছেন প্রায় পৌনে দু’‌যুগ আগে। ওঁর মতো সদালাপী, সজ্জন, সদাহাস্যমুখ মানুষ খুব কম দেখেছি। ওঁর লেখায় রয়েছে তার স্পষ্ট ছাপ। কোথাও কোনও মালিন্য নেই, না ওঁর ব্যক্তিগত জীবন, না মানসিকতায়, না ওর লেখায়। লেখক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ছোট ভাই ধীরেন্দ্রনাথ সত্তর–আশি‌র দশকে ওই পত্রিকায় তিনশো থেকে তিনশো পঞ্চাশ শব্দের মধ্যে সপ্তাহে একটা কলম বাজার নিয়ে লিখতেন। অনবদ্য। তবে ১৯৯০ থেকে বিজন যখন ওই কলম লেখাই শুরু করলেন, তখন বাজার, সমসাময়িক সমাজ, বিস্মৃত মনীষীদের অবিস্মরণীয় সব ঘটনা যখন ছবির মতো ওঁর লেখায় ফুটে উঠতে লাগল, তখন থেকে মানুষ বিজন ছেড়ে লেখক বিজনের ভক্ত হয়ে পড়লাম। বড় কাগজ থেকে রিটায়ার করার পরও বিজনের কলম আজও সমান সচল। সেইসব লেখাই বাজারে এল বই আকারে। প্রথমে ‘‌বাজার সরকারের ডায়েরি’‌, তারপর ‘‌বহু বিচিত্র’‌, চলতি বছরে ‘‌পথ চলাতেই আনন্দ’।‌ বাজারের কথা, সবুজ শাক–‌সবজি, টম্যাটো, ডিম থেকে কখন চলে গেছেন সুচিত্রা সেনের পাবনায় জন্মভিটেয়, ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গৌরীকুঞ্জে, মাইহারে বাবা আলাউদ্দিনের পরিবারে যে ভারত সরকারের ভারতরত্ন থেকে শুরু করে সাত–‌সাতজন পদ্মপ্রাপক রয়েছেন, সেই সত্যে, তার পর বিবেকানন্দ পড়ে মুগ্ধ টলস্টয়ের মন্তব্য ‘‌অত্যন্ত প্রতিভাদীপ্ত রচনা’‌ ইত্যাদি। 
আগে ছিলাম বিজনের ব্যক্তিগত ব্যবহারে মুগ্ধ, পরে হলাম তাঁর গুণগ্রাহী। আর ‘‌পথ চলাতেই আনন্দ’‌ পড়ে নির্দ্বিধায় বলছি, বইটি সব বাঙালির মানসিক বৈকল্যের জন্যই হবে অবশ্যপাঠ্য। ৩৫ বছর আগে ১৯৮২–‌র অক্টোবরের পর এই ২০১৭–‌র জুলাই মাসে অর্থাৎ ৩৫ বছর পর আবার দেখা হল এই বইটির দয়ায়। না চাক্ষুষ সাক্ষাৎ হয়নি। হয়তো ভালই। এখন দেখা হলে তো দুটো ভাঙাচোরা দেহের সাক্ষাৎ হবে। লেখা তো দেহ নয়— বিজনের লেখা বিজনের মনের মতোই সুন্দর। সবুজ, সহজ, সতেজ এবং আনন্দ ও অজানা সব সত্য তথ্যে— যাকে কাহিনীই বলা যায়— সমুজ্জ্বল। এই বইটি আমাকে আবার দেখা করিয়ে দিল পুরনো সহকর্মীর সঙ্গে। ‘‌লালমাটি’‌র নিমাই গরাইকে ধন্যবাদ বইটি সুদৃশ্যভাবে প্রকাশ করার জন্য। কিছু সাল–তারিখ ভুল ছাপা হয়েছে, নিশ্চয়ই পরের সংস্করণে সংশোধিত হবে।‌‌‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top