কৃষ্ণরূপ চক্রবর্তী: সারা দুনিয়ার সেরা গল্প • সম্পাদনা‌ মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায় • ন্যাশনাল বুক এজেন্সি • প্রতি খণ্ড ৩৫০ টাকা •‌ ২ খণ্ড একত্রে ৬০০ টাকা

গদ্যভাষা, কাহিনী–‌বয়ন, চরিত্র–‌নির্মাণ ও সামাজিক বাস্তবতা রক্ষার কারণে যদিও ছোটগল্প ও উপন্যাসকে বন্ধনীভুক্ত করে ‘‌কথাসাহিত্য’‌ নাম দেওয়া হয়, তবু শেষ পর্যন্ত ছোটগল্প আসলে লিরিক–‌কবিতা বা গীতিকবিতারই আত্মার আত্মীয়। কেন?‌ না, যে–‌ব্যঞ্জনার ভাষায় ছোটগল্প কথা বলে সেই ইঙ্গিতময় ভাষার চাবিকাঠি শুধুই কবিতার জানা আছে। আভাসে, ভঙ্গিতে সে তার অন্তর্গত কথাটিকে প্রকাশ করতে পারে, উপন্যাস তা সাধারণত পারে না। ফলে রচনার প্রতিটি শব্দ, এমনকি বর্ণও, যেমন কবিতায় তেমনি ছোটগল্পেও জরুরি— যা–‌কিনা উপন্যাসের অনিবার্য শর্ত নয়। তাই যেমন কবিতা তেমনি গল্পও অনুবাদে ততখানি ধরা দেয় না। একটি দেশের বা জাতির প্রকাশভঙ্গির ইঙ্গিতে ভঙ্গিতে অন্য দেশের সেই সূক্ষ্মতম আবেদন সম্পূর্ণভাবে ফোটে না, অনুবাদের স্তরান্তরের মধ্যপথে অনেকটাই হারিয়ে যায়— যেন ডাক–‌বিভাগের ভাষায় ‘‌লস্ট ইন ট্রানসিট’‌।
তা–‌বলে কি বিদেশি ছোটগল্প অনুবাদের মাধ্যমে পড়ব না?‌ শুধুই ডিকেন্সের ‘‌এ টেল অব টু সিটিজ’‌ বা তলস্তয়ের ‘‌রেজারেকশান’‌ বা ‘‌ওয়ার অ্যান্ড পিস’‌ বা দস্তয়েভস্কির ‘‌ব্রাদার্স কারামাজভ’‌ পড়ব আর আস্বাদ নেব না শেখভের ‘‌ওয়ার্ড নাম্বার সিক্স’‌ বা ‘‌কিস’‌ বা ‘‌লেডি উইথ দা ল্যাপডগ’‌ গল্পের?‌ তা কখনও হয়?‌ আমরা তো জানি–‌ই যে, উপন্যাসে যে–‌বস্তুভার আছে তাকে যেমন তুলনায় সহজে ভাষান্তরিত করা যায়, ছোটগল্পের হালকা ব্যঞ্জনাকে তা করা যাবে না। তবুও, একটি কথার দ্বিধা–থরোথরো চূড়ে ভর করেছিল যে সাতটি অমরাবতী— তাকেও নতুন ভাষার ব্যঞ্জনাময় আদরে যত্নে প্রকাশিত করতে হবে বই–কি!‌
সেই প্রায় অসাধ্যসাধনের কাজটিই করেছেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়— তাঁদের সম্পাদিত দুই খণ্ড ‘‌সারা দুনিয়ার সেরা গল্প’‌ বইয়ের মাধ্যমে। এই বইয়ের দুই খণ্ডে বত্রিশটি দেশের ছাপ্পান্নজন গল্পকারের গল্প— যেন ছাপ্পান্–‌ভোগের বৈচিত্র‌্যে। এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া সমস্ত মহাদেশের প্রায় সব প্রধান গল্পকারেরাই হাজির আন্তর্জাতিক সারস্বত ভোজের এই মহাসমারোহে।
এখানে যেমন আরজেনতিনা–‌র হুলিও কোর্তাজার, ইউএসএ–‌র (‌ও হেনরি নেই কেন?‌)‌‌ এডগার অ্যালেন পো বা হেমিংওয়ে, ইংল্যান্ডের চেস্টারটন, ইতালির পিরানদেল্লো, স্পেনের সেরভেনতেস, চীনের লু শ্যুন, চেক–‌এর কাফকা, জার্মানির টোমাস মান, ব্রেশ্‌ট, ফ্রান্সের মোপাসাঁ, নাইজেরিয়ার চিনুয়া আচেবের মতো শিক্ষিত বাঙালির কাছে চেনা মুখের দেখা মেলে তেমনি পাকিস্তানের গুলাম আব্বাস বা পর্তুগালের সারামাগুর মতো মুখ–‌চেনার স্বাক্ষরও পাই। বাংলাদেশের ওয়ালিউল্লা, ইলিয়াস বা হাসান আজিজুল হকের মতো পরমাত্মীয়ের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ডের প্রতিভার স্পর্শও পেয়ে ধন্য হই।
দ্বিতীয় খণ্ডেও পুশকিন, গোগোল, শেখভ, গোর্কি, নোডিন গোর্ডিমার প্রমুখ বিশ্ববরেণ্য ছোটগল্পকারের পাশাপাশি ভারতের থেকে রবীন্দ্রনাথ, প্রেমচন্দ, বিভূতিভূষণ, শিবরাম, সতীনাথ, মানিক, কিষণ চন্দর, ইসমৎ চুগতাই, মহাশ্বেতা দেবী ও বিজয়দান দেথার দেখা মেলে। সাদাত হোসেন সান্টো অবশ্য যেমন অবিভক্ত ভারতের তেমনি পাকিস্তানের।
এখানেই দু–‌একটি কথা। ভারত থেকে যাঁরা মনোনীত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে পরশুরাম, বনফুল, প্রেমেন্দ্র মিত্র নেই!‌‌ মহাশ্বেতা বা শিবরাম অপেক্ষা এঁরা গৌণ কীভাবে?‌ রবীন্দ্রনাথেরও যে–‌দুটি গল্প বাছাই করা হয়েছে সেই ‘‌পোস্ট মাস্টার’‌ ও ‘‌না–‌মঞ্জুর গল্প’‌‌ই কি তাঁর সেরা দুই সৃষ্টি। ‘‌নষ্টনীড়’‌, ‘‌শাস্তি’‌, ‘‌একরাত্রি’‌— এই সব গল্পকে সরিয়ে রেখে কি এই গল্পদুটি আসে?‌
অবশ্য ভিন্নরুচির্হিলোকাঃ। সম্পাদকদ্বয়ের মস্তিষ্কের তারে যেসব লেখক ও যেসব লেখা অনুরণন সৃষ্টি করেছে অন্য–‌অনেকের হৃদয়তন্ত্রীতে তারা হয়তো সেই সুর ধ্বনিত করে তুলতে পারেনি। অতএব বিশ্বসাথে যোগে যেথায় আমাদের বিহার সেখানে ‘‌আগে কহ আর’‌ বলে এগিয়ে না–‌গেলেই লোকসান।
বিদেশি গল্পের সূচনাতেই লেখকের স্বল্প–‌পরিচিতি ও অনুবাদকের নাম দেওয়া হয়েছে। তা হলে সেরভেনতেসের গল্পসূচনায় অনুবাদকের নাম নেই কেন?‌ যদি বলা হয় সম্পাদকরা অনুবাদ করলে তা দেওয়া হয়নি, সেকথাও গ্রাহ্য হবে না। হেমিংওয়ের অনুবাদকই তো তীর্থঙ্কর চট্টোপাধ্যায়!‌
যেসব দেশি–‌বিদেশি লেখকের গল্প সাজানো হয়েছে, তাঁদের বয়ঃক্রম অনুযায়ী সাজানো হলে ভাল হত বলে মনে হয়। তা ছাড়া লেখক–‌পরিচিতি বড্ড সামান্য। বিভিন্ন গল্পে এমন–‌সব আনুষঙ্গিক তথ্যাদি আছে, যাঁদের সম্পর্কে ফুটনোট নেই বললেই চলে। গল্পগুলির অনূদিত বাংলা নাম দেওয়া হয়েছে। মূল নাম বা ইংরেজি নাম পাশাপাশি থাকলে ভাল হত। ননী ভৌমিক, উৎপল দত্ত, মানবেন্দ্রবাবুর মতো আরও অনেক গুণী মানুষের হাতে পড়ে সঙ্কলনের গল্পগুলি এমন তরতাজা, স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক অবস্থায় রূপান্তিত হয়েছে যে অনুবাদ বলে মনেই হয় না। এবং যেহেতু ছোটগল্পের মতো মরমি শিল্প–‌মাধ্যম, ফলে বাচ্যার্থের পাশে ব্যঞ্জনাকেও সমান মর্যাদা দিয়েছেন অনুবাদকের দল। এবং সেইভাবেই দেশ–‌বিদেশের শিল্প–‌সামর্থ্যটিকে না–‌বলা বাণীর ঘন যামিনীতে বাঙ্ময় করে তুলেছেন এঁরা। সুগঠিত সুমুদ্রিত এই ৫০০ পাতার পেপারব্যাক বই দু’‌খানি সংরক্ষণযোগ্য।‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top