পম্পা দেব: খড়কুটো • অংশুমান কর 
চারণ প্রকাশন • ৩৫ টাকা
যে গান রাতের • হিন্দোল ভট্টাচার্য সিগনেট • ১০০ টাকা
চার অক্ষরের কাঙাল 
সুমিতাভ ঘোষাল • কাগজের ঠোঙা 
৪০ টাকা
দুঃখী বাঘের থাবা আঁকা 
সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় • 
ইতিকথা পাবলিকেশন • ৬০ টাকা
গুডমর্নিং, কলকাতা • সুজিত দাস সোপান • ১৭০ টাকা
পঁচিশটি কবিতায় অংশুমান করের ‘‌খড়কুটো’‌। অংশুমানের কবিতাশৈলীতে আছে এমন রূপটান যাতে অনাবশ্যক মেদ নেই। নেই অতিকথন। তিনি জানেন কীভাবে প্রাত্যহিক জীবনের শব্দের ব্যবহার হয়ে উঠতে পারে জীবনের মহাকবিতা। সে–কবিতায় ধরা দেয় শিল্পবোধ থেকে প্রেম, বিপ্লব থেকে বেদনা। কবিতায় অসংখ্য প্রতীকী ফুটে ওঠে নানান মোটিফে। তার কাজ মুছে দেওয়া/ মানুষের, সভ্যতার/ যতকিছু ভুল/ যেপথে চলেছে সেনা/ যেপথে রক্তের দাগ/ সেই পথে ফুটেছে জারুল!’‌ অথবা ‘‌এই সন্ধ্যা/ ফুরিয়ে যাওয়া কবির কবিতার মতো।/ রাত্রি/ তার একমাত্র পাঠক, প্রেমিকা/ অপেক্ষায় আছে।’‌ অন্যতম শক্তিশালী কবি অংশুমান করের এই বইটি আগ্রহী পাঠক সংগ্রহ করতে পারেন।
যে কবিতা জানে বিদ্রোহ আর দেবীবোধনের পরবর্তী পর্যায়ে ঘট ভাঙার অভিসার, জানে শরীরের ভেতর ঈশ্বর ঈশ্বরীর জেগে ওঠার সুচারু গল্প। অন্ধকারের ভেতর যে মায়াবী চোখ জেগে থাকে অন্য রূপকথায়... ‘‌যেন আমি ভোরবেলা উঠে দেখি/প্রথম ট্রামের মতো কেউ এল তোমার সংসারে।’‌ ছাপ্পান্নটি কবিতা নিয়ে কবি হিন্দোল ভট্টাচার্যর ‘‌যে গান রাতের’ এক নগরজীবনের গোধূলি বেলায় শ্রান্ত মুখ থেকে দিগন্তবিস্তৃত আলোকবর্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনার কথা বলে। কবি জানেন কীভাবে সরল কথার কাছে ঋণী থাকে ভাষা। ‘‌যখন তোমাকে দেখি, তোমার চোখেই দেখি তোমাকে আমার’‌।
‘‌চার অক্ষরের কাঙাল’‌ আদতে একটি খুলে রাখা খাতা। একটি উন্মুক্ত ছাদ। যেখানে আপনমনে এসে দাঁড়ায় স্বগতোক্তির মতো ছায়াজন্ম। যৌনতা যেখানে শিল্পের ছলাকলা হতে হতে নারীচিহ্নের কাছে বিষাদবন্দনা। ছন্দে অথবা ছন্দের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এক চিরবালক মন আছে যা কৌতূহলী হয়ে ওঠে সময়ের কাছে, শরীরের কাছে, জন্মের কাছে, মৃত্যুরও কাছে। নাগরিক সচেতন এক জেহাদের স্বতন্ত্র সত্তাকে ধারণ করে এই কবিতা বইটি। আগ্রহী পাঠক কাগজের ঠোঙা প্রকাশনা থেকে সংগ্রহ করতে পারেন। ‘‌রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কিছু একটা করো/ ফি বছর বন্যা থামাও/ শক্তি দাও/ যশোং দেহি হেলমেট যেন খুলে রাখতে পারি’‌। কবি সুমিতাভ ঘোষাল সরল কবিতার ছলে অমোঘ চাবুক রেখেছেন কবিতার ছত্রে ছত্রে।
সৌভিক বন্দ্যোপাধ্যায় এমন একজন কবি যাঁর শব্দ–ব্যবহার থেকে বেরিয়ে আসে এক দুঃখী দিনের জাদুকর। পার্ক স্ট্রিট থেকে, সিমলা, দিল্লি থেকে আজারবাইজান যাঁর মননের অলিগলি ভেসে বেড়ায়। এক আরবান মেলাঙ্কলিয়া, নাগরিক বিষাদ বয়ে যায় তাঁর কবিতায়। ‘‌দুঃখী বাঘের থাবা আঁকা’‌ বইটির পাতায় পাতায় এইসব মেপলের দিনরাত্রি ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। যেখানে তীব্র ঠাট্টার ভেতর ভালবাসার অব্যক্ত রূপকথা জেগে আছে। ‘‌আমার শুধু একটাই কথা মনে হয়, অধ্যাপিকা—/ এই ইট–কাঠ–পাথরের জঙ্গলে/ সিরিয়াস চশমা খুলে রেখে,/ আপনিও হরিণ হয়ে যেতে পারেন’‌।
সুজিত দাসের ‘‌গুডমর্নিং, কলকাতা’‌র পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় হু–হু করে ওঠা মন আটকে যায়। বিষণ্ণতার সিন্ধু পেরিয়ে পাকদণ্ডী পাইনের বনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে গড়িয়ে পড়া গোধূলিবেলার দিকচক্রবাল আছে, আছে পাহাড়ি ঝোরার পাশে ফুটে থাকা গান্ধর্বী। এমন একটা মন আছে এই ছায়াকবিতা বা মায়াগদ্যের যার প্রতিটি অক্ষর থেকে, শব্দ থেকে ভেসে আসে নিঃসঙ্গ পরাগ, আকাঙ্ক্ষিত জোনাকি, ভালবাসা–কাতর এক আকাশ ইচ্ছে। যে ইচ্ছেরা সোহাগের ডানায় তুখোড় মেঘবালক হয়ে উঠতে পারে। কাবেরীদির শাড়ির আঁচলে নীলকণ্ঠ পাখি হয়ে উঠতে পারে আর হারিয়ে যাওয়া খোকাদার অপূর্ব ফিরে আসা হতে পারে। উত্তরবঙ্গের দামাল হাওয়া কলকাতা শহরে নেমে এসেছে এই বেলা। খরস্রোতা নদী বুঝি বেপরোয়া রাস্তা পারাপারের গল্প বলবে। ‘‌তবু ও জাদুশহর,/ তোমার জেব্রা ক্রসিং বরাবর রাস্তা পার হই যখন,/ শুধু আমার জন্য একটা গাড়িও স্লো হয় না কেন!‌’‌

জনপ্রিয়

Back To Top