শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়:
‌পান্তাভাতে • গুলজার • সম্পাদনা‌ সঞ্চারী মুখোপাধ্যায় • দে’‌জ পাবলিশিং • ১৯৯ টাকা ‌‌‌
খুব ঐশ্বর্যময় জীবন হলে বুঝি এমনই হয়!‌ রোজনামচার পাতা উল্টোলে, পুরনো দিনগুলো একটু নাড়াচাড়া করলেই ঝুরঝুরিয়ে খসে পড়ে স্মৃতির অজস্র মণিমুক্তো। গুলজার সাহেবের ‘‌পান্তা ভাতে’‌ এমনই একটি গদ্য সঙ্কলন। নামকরণে যতই তার আটপৌরে বিনয় থাক, কবি, গীতিকার, সংলাপ–লেখক এবং চিত্রপরিচালক গুলজারের এই ভণিতাহীন, আড়ম্বরমুক্ত স্মৃতিকথন চোখ ধঁাধিয়ে দেয় তার অতুল বৈভবে। কোনও লেখা খুশিতে মন ভরিয়ে দেয়, কোনওটা পড়ার পর বই মুড়ে একটু চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে হয়, আবার কোনও লেখা শেষ করেই আবার শুরু থেকে পড়ার ইচ্ছে হয়— এমনই অন্তর–ছোঁয়া।
অকালপ্রয়াত সঞ্জীবকুমার ওরফে হরি–র সঙ্গে নিজের হৃদ্যতার কথা লিখতে গিয়ে যেমন লিখেছেন, একবার এক পার্টিতে পৌঁছতে দেরি হয়েছিল। বলেছিলেন, শুটিং ছিল, তাই দেরি হল। ‌গুলজারের ‘‌মৌসম’‌, ‘‌আঁধী’‌, ‘‌কোশিশ’‌, ‘‌নমকীন’‌ ছবির হিরো হরি বলেছিল, তা কী করে হয়!‌ আমি অভিনয় করছি না মানে তোর সিনেমাও হচ্ছে না। আমি ছাড়া তোর আবার কীসের সিনেমা! গুলজার লেখাটা শেষ করছেন এই বলে— আমি কেমন মানুষ, যে হরি চলে যাওয়ার পরেও সিনেমা করতে পারলাম?‌
প্রাক্‌কথনে বাংলা ভাষা, আর রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভালবাসার কথা জানিয়েছেন গুলজার। জানিয়েছেন নিজের ‘‌বাঙালি স্ত্রী’র কথা, যঁাকে প্রেমপত্র লিখতে গিয়েই নাকি গুলজারের বাংলা আরও সপ্রতিভ হয়েছিল। এর পর স্মৃতির দেরাজ খুলে একটি একটি করে রং–ঝলমলে আঙরাখা বের করে এনে আটপৌরে এবং মজলিশি এক বাংলা ভাষার নিকনো উঠোনে, আন্তরিকতার উষ্ণ রোদে মেলে দেওয়া। তাদের ওম খাওয়ানো।
পড়তে পড়তে খেয়াল থাকে না, বইয়ের দু মলাটের মাঝে সার দিয়ে দঁাড়ানো মানুষগুলো প্রায় সবাই বাঙালি। অধুনা মুম্বই, তখনকার বম্বে শহরে যে–বিখ্যাত বাঙালিরা সফল হয়েছিলেন, প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। শুরু বিমল রায়–কে দিয়ে, যঁার কাছে গুলজারের সিনেমায় হাতেখড়ি। তার পর একে একে এসেছেন সলিল চৌধুরি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হেমন্ত সম্পর্কে লেখার শুরু করছেন এভাবে— ‘‌সাদা ধুতি আর শার্ট পরা একটা ভীষণ লম্বা লোক মার্সিডিজ চালিয়ে বম্বে শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ষাটের দশকে এমন কলার–তোলা বাঙালি দেখা যেত না।’‌ সে আমলের বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বাঙালিরা কোন উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, প্রতিটি স্মৃতিচারণের পরতে পরতে মিশে আছে সেই নস্টালজিক ন্যাপথলিন–গন্ধ। হেমন্তর মতোই কলার তুলে এসেছেন হৃষীকেশ মুখার্জি, বাসু ভট্টাচার্য, তরুণ মজুমদার। এ ছাড়া স্বমহিমায় আছেন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, পণ্ডিত রবিশঙ্করের মতো আন্তর্জাতিক বাঙালিরা, যঁারা নির্দিষ্ট কোনও দেশ–কালের সীমানায় আবদ্ধ নন। এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গেই তঁার ব্যক্তিগত বিনিময়ের কথা লিখেছেন গুলজার। ছোট ছোট কথার আঁচড়ে কী অবিকল এঁকেছেন চরিত্রগুলোকে। সত্যজিতের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিতে যেমন উজ্জ্বল সত্যজিতের ইংরেজি উচ্চারণ। এবং উর্দুও। বিমল রায় তঁাকে চিরকাল ‘‌গোলজার’‌ বলে ডেকে গেছেন, আর সত্যজিৎ গুলজারের নামের মধ্যে ইংরেজি ‘‌জেড’‌ অক্ষরটির উচ্চারণেও নিখুঁত‌। ছোট্ট কিন্তু অসামান্য এক শিক্ষার কথা বলেছেন— নিউ থিয়েটার্সে শশী কাপুর ও আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে সত্যজিৎ বলেছিলেন, ‘‌If we don't have money to spend on it, we have to spend our brain.‌’‌ এই মহার্ঘ শিক্ষা বাঙালি কতটা যত্ন করে মনে রেখেছে জানা নেই, কিন্তু মাথায় করে রেখেছেন গুলজার। নিজের সম্পর্কে যিনি বলেন, ‘‌আমি আসলে একজন বাঙালি, যে কিনা বাই চান্স জন্মে গিয়েছি একটা পঞ্জাবি পরিবারে।’‌
আরও অনেক বর্ণময় বাঙালি চরিত্র আছেন পান্তাভাতের স্বাদু টাকনা হয়ে। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, সমরেশ বসু, মহাশ্বেতা দেবী এবং অবশ্যই কিশোরকুমার আর রাহুল দেববর্মন। বইয়ের দীর্ঘতম এবং গভীরতম লেখাটি প্রিয় বন্ধু আরডি–কে নিয়ে, যার প্রতিটা অক্ষর চিনিয়ে দেয় কী অসম্ভব এক প্রতিভাধর এবং বিরল গোত্রের গুণী মানুষ ছিলেন আরডি। 
তবে খুব আফসোসও হয় পান্তাভাতে পড়তে গিয়ে। বিমল রায় ভেবেছিলেন কালকূটের ‘‌অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’‌ নিয়ে ছবি করবেন। বেশ খানিকটা কাজ হয়েও গিয়েছিল, যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গুলজার। ছবিটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। সত্যজিৎ রায় ভেবেছিলেন ‘‌গুপী গাইন বাঘা বাইন’‌ হিন্দিতে করবেন। আলোচনা হত গুলজারের সঙ্গে। সেটাও হয়নি।
হবে না আফসোস?‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top