বারিদবরণ ঘোষ:
(‌মায়ের শৈশব •‌ নীহারিকা দাশগুপ্ত •‌ দে’জ •‌ ১৫০ টাকা‌)

 

এক–একটা নাম কিংবদন্তি হয়ে ওঠে নামধারীর জীবৎকালেই। স্বভাবতই তাঁর সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলও বিচিত্রচারী হয়। রবীন্দ্রনাথ যতই তর্জনী তুলুন— কবিরে খুঁজো না তাঁর জীবনচরিতে। আম–পাঠক বঙ্কিমকে আশ্রয় করে থাকবেন— কবির কাব্য বুঝিয়া লাভ আছে, কিন্তু কবিকে বুঝিয়া লাভ কম নাই।
ঘটনাচক্রে কবির জবানিতে নয়, তাঁর মায়ের জবানিতে যদি কবি–কথা পরিজ্ঞাত হয়— তা হলে কৌতূহলটা মেটে কেমন?‌ এর আগে আমরা পুত্র বা পুত্রস্থানীয়দের পিতা–মাতা বা তুল্য–তুল্যাদের স্মৃতিকথা পেয়েছি। কিন্তু খোদ জননী যখন পুত্র–গাথা রচনা করেন— যা প্রায় দুর্লভ, তখন যে–বিস্ময়— তার স্বাদ বোঝানো মুশকিল। এতখানাই মুশকিল যে, এমনতরো একখানা স্মৃতিকথা লিখতে নীহারিকা দাশগুপ্তের যথেষ্ট কুণ্ঠা এসে গিয়েছিল যুক্ত অধিকারীমশায় যখন বিশ্রুত অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের পবিত্র মাতাকে তাঁর পুত্রের কিশোরকালের একটি বিবরণী লিখে দিতে বলেছিলেন। এমনতরো প্রস্তাবে অলোকরঞ্জন পর্যন্ত রেগে কাঁই হয়ে গিয়েছিলেন। শেষে দু’‌জনকে যুক্ত করার সূত্রে যুক্ত অধিকারীর প্রস্তাব মেনে নিলেন অলোকরঞ্জন— মা তোমার শৈশবের কথা লেখো, তোমার শৈশব তো আমারও। শুনে ধন্দে পড়েছিলেন মা সেই বাউলি ধাঁধার মতো— ‘‌ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম!‌’‌ বইটা পড়তে পড়তে ঝাপসা ভাবটা কেটে গেল। মাত্র ক’‌বছর আগে প্রথমবার ছাপা বইটা পড়া হয়নি— ‘‌বুরবক’‌ মনে হচ্ছিল নিজেকে। বেটার লেট দ্যান নেভার বলে প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ দু’‌দিনের ব্যবধানে দু’‌বার করে পড়ে ফেললাম।
শিশুর শৈশববেলা মায়ের চেয়ে আর কে বেশি জানবেন— তিনি তো শুধু লালন করেন না, রচনা করেন। আবার আপন কালের থেকে তিনি স্বতন্ত্র, তাই ‘‌ওরে ভোঁদড় ফিরে চা’‌ ছড়ার বদলে পুত্র রবীন্দ্রনাথের শিশু, শিশু ভোলানাথের কবিতা পছন্দ করছেন। পোয়ে–মায়ে— দু’‌জনেই যে অন্য চরিত্রের!‌ ছেলে হইচই না করে চুপচাপ সব–কিছু দেখতে ভালবাসে, মাত্র একদিনে বর্ণপরিচয় প্রথম ভাগ শেষ করে, একটা শব্দ থেকে নানারকমের শব্দ বানায়। কত জায়গায় বাস— কখনও রিখিয়ায়— যেখানকার বাসিন্দারা দুর্গাঠাকুরকে দেখে মনসা ভেবে পুজো করে— মায়ের হাতে সাপ আছে তো— তাই তো মনসা (‌লোকসংস্কৃতির গবেষকেরা ভেবে দেখতে পারেন)‌। কখনও যান ওড়িশায় (‌খুব ভাল ওড়িয়া ভাষা ও গান জানেন নীহারিকাদেবী)‌। অলোকের সব ব্যাপারে আগ্রহ, খুব ভাল হত যদি পাঠ্যতালিকায় অঙ্কটা না থাকত। ওড়িশার রাজকণিকার বসে গাইছেন ঘন বরন–মদন–মোহনকু আর গাইছেন রবীন্দ্রনাথের ‘‌মাঝে মাঝে তব দেখা পাই.‌.‌.‌’‌। এমনি সাতভায়ায় থাকা, ছোটবেলায় পছন্দের না হলেও পুতুলের বিয়ে এ–সব নিয়ে সংসারটা চলে এল অলোককে ঘিরে শান্তিনিকেতনে। সরাসরি ক্লাস সিক্সে ভর্তি হল অলোক এখানে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ— অলোক যুদ্ধ নিয়ে এক কবিতা লিখে ফেলল— অলোকের কবিতার জগতে পা–ফেলা, তাই নিয়ে ঘরবসত করার এমন মাতৃমহিমান্বিত ইতিকথা আর কি কোথাও পড়তে পাব?‌ কারণ অলোক আলাদা। শান্তিনিকেতনে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁকে ‘‌বিউটিফুল’‌ শব্দটার বানান করতে বলা হয়েছিল। এই একটিই প্রশ্ন। ঠিক ঠিক উত্তর দিয়েছিল অলোক। এটা অলোকের মনে আছে হয়তো এখনও। কারণ তিনি বলেই থাকেন— ‘‌সুন্দরের বানান ভুল করব এটা কি কখনও সম্ভব হতে পারে?‌’‌ পাঠকের ইচ্ছে করছে না এমন মানুষের মা, প্রণাম করে নিতে! এমন মা বলেই তো তাঁর স্মৃতিকথা আসলে তাঁর শৈশবের সঙ্গে আপন মাধুরী মিশিয়ে দেওয়া। এ বই যে আসলে অলোকরঞ্জন ‘‌রচনা’‌সম্ভার— তা এই পাঠকের বুঝতে বাকি থাকে না। বলতে চাইছি অলোকরঞ্জনকে রচনার সম্ভার।
আর লেখিকার নিজের জীবন?‌ শান্তিনিকেতনে গান শেখার ইতিহাস?‌ খুঁতখুঁতে ইন্দিরা দেবীচৌধুরানীর কাছে এবং সব কাজ ছেড়ে শান্তিদেব ঘোষের কাছে গান শেখা। ‌এমন কথা কেউ শুনেছেন, শিল্পী নীলিমা বড়ুয়ার সঙ্গী ছিল একটি গোখরো সাপ!‌ যে মারা গেলে পাগল হয়ে নীলিমাদেবী শান্তিনিকেতন ছেড়ে দিলেন চিরতরে! চারুদির জীবন ও তাঁর আশ্রয়ে বাসের ইতিকথার সঙ্গে অলোকরঞ্জনের প্রথম ইংরেজি কবিতার তরজমা— কেমন করে দুটো জীবন পাশাপাশি চলমান। নীহারিকাদেবী মা তো, তাই অন্য সন্তানেরা অবহেলিত নন। প্রতিমাদেবীর পাশে অক্লেশে ঠাঁই পেয়েছেন মেজছেলে পিন্টু— পোকা ধরা যাঁর নেশা!‌ ছোটছেলে বুলবুল— যিনি কেবলই ছুটোছুটি করেন আর অলোক বসে থাকেন চুপচাপ।
সহসা ওঁদের কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁর আট বছরে ফিরে যান ভোরে আম কুড়োনোর শৈশবে। মামার বাড়ি ত্রিপুরায়, জায়গার নাম খোয়াই। ত্রিপুরাও মিশে যায় শান্তিনিকেতনে। বন্ধু হন সেখানকার রাজকুমারী। বয়স বাড়ে কুড়িতে। তার পরে চাকরির কথা— গান শেখানোর। এটা দিয়েই বইটার শুরু হয়েছিল, প্রায় শেষে তারই কথাপ্রসঙ্গে সুরসাগর হিমাংশু দত্ত। আবার অলোকরঞ্জনের কাছে এসেছেন নিজে মন্মথ সান্যাল— আনন্দবাজারের শারদ সংখ্যার কবিতা চাইতে। নীহারিকার অবস্থানও তো অলোকে। মাতা–পুত্র একই লোকে। একটা ‘‌লোক’‌কাহিনী পড়ছিলাম।
১৪০৮–এ প্রথমবার বেরোনোর পর এর পরিবর্ধিত সংস্করণ বেরোয় মাস দশেক আগে। তাতে রয়েছে নীহারিকার লেখা অন্যতর রচনা, নবেন্দু সেনের নেওয়া একটা সাক্ষাৎকার— যাতে তাঁর সঙ্গীতজীবন আরও বিস্তৃত করে বিবৃত, আছে এই বই নিয়ে আলোচনার দলিলও। এক শোভন পরিচ্ছদে এগুলো ঠাঁই পেয়েছে। তা পাক। আমাদের তো অলোকদর্শন হয়ে গেল। মাকে আবার প্রণাম। ■

জনপ্রিয়

Back To Top