রাজীব ঘোষ: ‘‌বড় অবজ্ঞার পর্ব্বতভার ঠেলিয়া বঙ্গভাষাকে উঠিতে হইতেছে। ...‌আমাদের শাসন–‌কর্তারা যদি বঙ্গসাহিত্যের আদর জানিতেন, তাহা হইলে বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র ও মাইকেল peerage ‌পাইতেন ও রবীন্দ্রনাথ knight ‌উপাধিতে ভূষিত হইতেন। দ্বিতীয়তঃ, আমাদের দেশের রাজা মহারাজাদের মধ্যে অধিকাংশই বাঙ্গলা ভাষা সম্যক জানেন না ও তাহার আদর করেন না। তাঁহাদের সজ্জিত প্রাসাদের প্রশস্ত পাঠাগারে যথামূল্য আলমারিগুলি অপঠিত ইংরেজি গ্রন্থের ও মাসিক পত্রিকার উজ্জ্বল সমাবেশ সগর্ব্বে বক্ষে ধারণ করিতেছে। কিন্তু বাঙ্গালা গ্রন্থ ও মাসিক পত্রিকা তাঁহাদের চরণ–‌প্রান্তেও স্থান পায় না।’‌
‘‌দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রতিষ্ঠিত ভারতবর্ষ’‌ পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যার ‘‌সূচনা’‌ তুলে ধরলাম। আজও কী প্রাসঙ্গিক!‌ ‘‌অবজ্ঞার পর্ব্বতভার’‌ আরও ভারী হয়ে চেপে বসেছে বাংলা ভাষার বুকে। পত্রিকা প্রকাশের আগেই সম্পাদক দ্বিজেন্দ্রলাল প্রয়াত, হাল ধরেছেন অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ এবং জলধর সেন। তাঁরা সেদিন লিখেছিলেন, ‘‌‌অগ্নি জ্বলিয়াছে আর ভয় নাই। আমরা আজ কল্পনায় বঙ্গসাহিত্যের সেই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ দেখিতে পাইতেছি। যেদিন এই উপেক্ষিত বঙ্গভাষা পৃথিবীর সমক্ষে সগর্ব্বে নিজের আসন গ্রহণ করিবে, সেদিন এই সাহিত্যের ঝঙ্কার সমস্ত ভারতবর্ষ উৎকর্ণ হইয়া শুনিবে, আর এই মাসিক পত্রিকার নামকরণ সার্থক হইবে...‌’‌  পড়ছি ‘‌ভারতবর্ষ গল্প সম্ভার’‌— নিছক একটি গল্প–সঙ্কলন নয়, বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের মিনে করা একটি পর্বকেই দু’‌মলাটে বেঁধেছেন সম্পাদক কমল চৌধুরি। বইটি প্রকাশ করে ‘‌পত্রভারতী’‌ বাংলা সাহিত্যের সেবায় তাঁদের ভূমিকাকে আরও প্রোজ্জ্বল করলেন সন্দেহাতীতভাবে। শরৎচন্দ্র, মানিক, তারাশঙ্কর, সুবোধ ঘোষ, বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত— ওই মিনের বুকে এই সব মণিমাণিক্যের জড়োয়া। দ্বিজেন্দ্রলাল লিখতে পারেননি, কিন্তু দিলীপকুমার রায় গল্প লিখেছেন। নাম ‘‌চাকর’‌। ভাষার কী চমৎকার চলন, লিখছেন:‌ ‘‘‌‌যোগেন্দ্র সম্প্রতি স্ত্রৈণতা–‌নিবারণী–‌সভার সপ্তম অধিবেশনে সভাপতি হয়েছিলেন। জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, ‘‌বড় বউ head strong ‌হওয়াটা হচ্ছে unpardonable‌— তোমরা বোঝ না তো কিছুই, কেবল sentiment ‌দিয়ে moved ‌হও‌— সংসারে একটা বিশৃঙ্খলা‌—’‌‌’‌ সাধুভাষা থেকে চলিত গদ্যে রূপান্তরের তেপান্তর পাড়ি দেওয়া ওই অর্ধশতকের গল্পগুলি চমকে দেবে। চমকে দেবে ফর্ম, দৃশ্যময়তা। সেই সময়ের নির্মম ছবি। দিব্যেন্দু পালিতের ‘‌মাছ’‌ থেকে:‌ ‘‌কসাইপাড়ার আনাচে কানাচে বাসা বেঁধেছে বাস্তুহারার দল— সরকারের কৃপণ মুঠির দাক্ষিণ্যে গড়ে উঠেছে উদ্বাস্তু কলোনি। প্রেতের মতো নিঃশব্দে কথা বলে এখানকার মানুষগুলো, ছায়ার মতো সন্তর্পণে রোগা রোগা পা ফেলে ঘোরাফেরা করে অন্ধকারের বুকে। টিমটিমে প্রদীপের জ্যোতিগুলো যেন তাদের ক্ষীণায়ু প্রাণের পরমায়ু নিয়ে জ্বলে আর নেভে।’‌
যেন নিখাদ একটি সিনেমা, ক্যামেরার ওপারে সত্যজিৎ, ঋত্বিক কিংবা মৃণাল!‌ পঞ্চাশ বছরের অবিস্মরণীয় ৩১টি গল্প সত্যিই সাহিত্যসাগর। ডুব দিলেই পুণ্য। ■
ভারতবর্ষ গল্পসম্ভার • সম্পাদনা কমল চৌধুরী • পত্রভারতী • ৪৯৯ টাকা

জনপ্রিয়

Back To Top