পম্পা দেব: আসলে স্বাধীনতার আরেক নাম অন্ধকার। কত কত মানুষের অকারণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে পার হয়ে আসে যে আলো, তাকে গ্রহণ করতে হবে কিন্তু দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, বেদনা, চোখের জলের বিনিময়ে বরণ করে নিতে হবে জেনে হু হু করে ওঠে মন। দেশ শব্দের ভার বহন করতে পারার মধ্যে গৌরব যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মবলিদানের নিষ্ঠুরতা। দেশকে ভালবেসে শহিদ হওয়া আর দেশের নাগরিক হওয়ার জন্য অকারণে মানসম্মান, প্রাণবিসর্জন দেওয়ার মধ্যে সংশয়, মনখারাপ একইসঙ্গে বিরাজ করে। ১৯৭১–‌এর মুক্তিযুদ্ধ এই বার্তাই দিয়ে যায়, আজও।
উনিশশো পঞ্চাশ থেকে চৌষট্টির দাঙ্গা, মন্বন্তরে, অগুনতি মানুষ দেশ থেকে দেশান্তরের দিকে পালিয়েছেন, উচ্ছেদ হয়েছেন নিজ বাসভূমি থেকে। সাম্প্রদায়িক শব্দের জন্ম দেওয়া দেশভাগ। এরই ফলস্বরূপ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ আরও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নির্মম ইতিহাস তৈরি করল। ভারত ভাগ হয়ে হল পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান হল বাংলার পূর্বাংশ নিয়ে, আর পশ্চিম পাকিস্তান হল পাঞ্জাবের পশ্চিম অংশ  আর সিন্ধুপ্রদেশ, উত্তর–‌পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বেলুচিস্তান নিয়ে। আসলে ধর্ম নয়, ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে ভাগ হয়েছিল বাঙালি এবং অবাঙালি এই দুই জাতি। শরণার্থী আর রিফিউজি, এই নামে উঠে এল লক্ষ লক্ষ মানুষের হাহাকার, সীমান্তে কাঁটাতারের ওপারে–‌এপারে মানুষের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধিজীবী, ছাত্র–‌শিক্ষক, কৃষক–‌শ্রমিক, বাঙালি সেনা–‌আধাসেনাদের যৌথ সশস্ত্র সংগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিল। 
খানসেনাদের অত্যাচারে স্বামী ও স্বজনহারা নারী, পুরুষ, জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ফেলে প্রাণ  হাতে করে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে পালিয়েছেন। ‘‌শরণার্থী’‌ শিবিরে নাম লিখিয়েছেন, তাঁরা স্বপ্ন দেখেছেন মুক্তিযুদ্ধের শেষে নিজভূমে ফিরে যাওয়ার। মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী ও ভারতবর্ষের আধাসামরিক বাহিনীর যৌথ আক্রমণে শেষাবধি পরাজয় স্বীকার করেছে আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পর লাখো লাখো শরণার্থী ফিরে গেল দেশে। বাংলাদেশে। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আবার সেই অরাজকতা ফিরে এল।  আবার নিষ্ঠুর হত্যা, ধর্ষণ, লুঠপাট রাজাকার বাহিনীর। অবশেষে ১৯৭১–‌এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হল। ‘‌জয় বাংলা’‌ স্লোগানে মুখর হল স্বাধীনতার বাংলাদেশের আকাশ বাতাস জল মাটি। নির্যাতিতা নারীরা হারিয়েছেন তাঁদের আপনজন, স্বামী, সন্তান, প্রতিবেশী। নতুন সরকার আসার পর এঁদের ‘‌বীরাঙ্গনা’‌ উপাধিতে ভূষিত করা হল, যা কিনা এই নারীদের প্রকৃত অর্থে অসম্মান বলেই তাঁরা মনে করেন, কারণ বহুলাংশেই এই নারীদের কোনও যথার্থ পুনর্বাসন হয়নি। ভেঙে গেছে বিবাহ, প্রেম , সম্পর্ক এমনকী ধর্ষিতা নারীদের ফিরিয়ে নেয়নি তাঁদের সমাজ। সব হারিয়ে কী প্রাপ্তি হলো তাঁদের। ‘‌বীরাঙ্গনা’‌ তাই এক জলজ্যান্ত পরিহাস। যুদ্ধকালীন সময়ে খানসেনা ও রাজাকারদের হাতে অসম্মানিত, লাঞ্ছিত এবং সীমান্ত পার হয়ে এসে  ‘‌রিফিউজি’‌ বা শরণার্থী শিবিরে যে অসহনীয় দিনগুজরান, তার মূল্য দিতে পারেনি স্বাধীন বাংলাদেশ। এই বইটির পাতায় পাতায় নীরবে ঝরে পড়েছে তাঁদের অব্যক্ত যন্ত্রণা, ব্যথা, কষ্ট, অপমান, অভিমান। শুধু নীরবে সহ্য করে চলা নিস্তব্ধ জীবনের শেষ দিনের অপেক্ষারত কথামালা। তাঁদের লেখা, চিঠিপত্র, একেকটি দলিল। যার হিসেব মিলবে না সরকারিভাবে। শুধুমাত্র আত্মকথন নয়, অত্যাচারের তথ্যে ঠাসা এই বইটি থেকে ভেসে আসে মূলঘর, ডাকরা, কুমারখালি, ডাকরা কালীবাড়ি, বহিরাগত, ঝাঁপা গ্রাম, উত্তরচক, কপোতাক্ষ, খোলপোটুয়া, সাতক্ষীরা, আন্ধারমানিক প্রাইমারি স্কুল, রাঢ়িপাড়া, সমদে কাঠি, আদাজুড়ি, হজিরগাঙ, রায়মঙ্গল, কীর্তিপাশা, ঝালকাঠি, চিতলমারী, হরিমণ্ডপ, মনসামণ্ডপ , পিঠে পোঁতা গাছের গল্প, চৈত্র মাসে শিবের গাজন, মঘিয়ার বারুণী স্নান , ভাটিয়ালি, বিজয় সরকার, রসিক সরকারের গান, মাধব মোড়োল, আছে ছত্রে ছত্রে ‘‌বাস্তু ভিটা ছেড়ে তোমার চলেছ কোথায়,/‌ কোন দেশেতে নাও ভিড়াবা বলে দাও আমায়’‌... শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন , আসাদ চৌধুরি, জসীমউদ্দীন, নাসিমা সুলতানা প্রমুখের কবিতার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে–‌ছিটিয়ে রয়েছে বইটির পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়। প্রতিটি কবিতায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরিণাম, পরিণতি,  মানুষের হাহাকার, কান্নার কথা। ষোলোজন  নারীর আত্মকথনে সমৃদ্ধ এই বইটির সম্পাদনা করেছেন ঝর্ণা বসু। ঝর্ণা নিজেও এই অত্যাচারের সাক্ষী। দেশভাগ তাঁকেও দিয়েছে যন্ত্রণা। বাগেরহাট গার্লস কলেজের অধ্যাপিকা ঝর্ণা ১৯৭৮–‌এ দেশান্তরিত হন। বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের বাসিন্দা।  বইটিতে রয়েছে দুর্দান্ত সব আলোকচিত্র। কিশোর পারেখের তোলা। রঘু রাইয়ের তোলা ছবি প্রচ্ছদকে দিয়েছে বিশেষ মাত্রা। ‘‌ভাগফল ৭১: মেয়েদের কথা’‌ একটি অমূল্য সম্পদ। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের একটি জীবন্ত প্রতিলিপি, দলিল। জবানবন্দী। গবেষণাধর্মী এই বইটি মনোজ্ঞ পাঠকের কাছে অজানা তথ্যমূলক এক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে একথা অনস্বীকার্য। ‌■
ভাগফল ৭১ মেয়েদের কথা • সঙ্কলন ও সম্পাদনা ঝর্ণা বসু • আলোকচিত্র কিশোর পারেখ • ৯ঋকাল বুকস • ৪৫০ টাকা‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top