সিনেমার রাজনীতি
ধ্রুবজ্যোতি নন্দী
সিনেমার ঝরণাতলায় • সুরঞ্জন রায় • 
চারুপাঠ • ২০০ টাকা

চলচ্চিত্রকে একটি বিশুদ্ধ রাজনৈতিক উৎপাদন ভেবে নেওয়ার মধ্যে যদি কোনও ঝুঁকি থাকে, সুরঞ্জন রায় কোনও দোদুল্যমানতা ছাড়াই সে ঝুঁকি নিয়েছেন। সিনেমা দেখতে বসে বস্তুত তিনি নিজের বিশ্বাসে লীন হয়ে রাজনৈতিক দলিল পাঠ করেন এবং সেই আঙ্গিকেই বিশ্বসিনেমার কয়েকটি উজ্জ্বল প্রদর্শ সম্পর্কে তাঁর ভাবনা নথিবদ্ধ করেছেন ‘সিনেমার ঝরণাতলায়’ নিবন্ধগুচ্ছে। যেমন, আর্থার মিলারের ‘দ্য ম্যান অফ লা মাঞ্চা’ তাঁর কাছে ‘‌সেদিনের একনায়কতন্ত্রী সামন্ততান্ত্রিক শাসনের চাপে অসহায় শিল্পীর স্বাধীনতাহীনতার এক রেখাচিত্র। আমরা অনুভব করি, আজকের তথাকথিত গণতান্ত্রিক পৃথিবীতে পৌঁছে শিল্পীর অবস্থা হয়ে উঠেছে আরও শোচনীয়, আরও মর্মান্তিক।’‌ ত্রুফো সম্পর্কে তাঁর আপ্তবাক্য— ‘‌ধনবাদী ব্যবস্থার চাপে বিভ্রান্ত হয়েছেন ফ্রান্সের শিল্প (!)–সাহিত্যিকরা।... যে প্রতিবাদের শাণিত প্রকাশে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্বের নিপিড়ীত মানুষ, তার অভাবে ত্রুফোর শেষ দিকের ছবিতে দেখা গেল এইন্টারটেনমেন্টের সঙ্গে হাত মেলানো এক বিভ্রান্ত শিল্পীর মুখচ্ছবি।’‌ আন্দ্রে ওয়াইদা (সুরঞ্জনের কলমে হ্বাইদা) সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‌ইতিহাসের প্রবহমানতাকে তিনি দ্বন্দ্বতত্ত্বের আলোতেই দেখার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু জীবনের নির্যাসকে সমাজের কেন্দ্রে বিকশিত হয়ে উঠতে না–দেখে তিনি বেদনার্ত হয়েছেন।’‌
আর সত্যজিৎ রায়? সুরঞ্জন লিখেছেন, ‘‌‘‌কম্প্রাডোর বুর্জোয়াদের আধিপত্যে তখন সাধারণ মানুষের জীবনে ঘনিয়ে উঠেছে অন্ধকার। ঔপনিবেশিকোত্তর ভারতবর্ষের দিশাহীন মানুষের সংগ্রামবিমুখতা দুর্নীতিকেই সমাজের শেষ সত্য হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত করল। অর্থনীতির দুর্বিপাকে সমাজজীবনে যে ভ্রষ্টাচারের আবির্ভাব ঘটল ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’তে তার একটা সামান্য আভাস দেখা দিল, ‘জন অরণ্য’তে পৌঁছে তা হয়ে উঠল নির্মম, ভয়াবহ। অর্থনীতির মেধাবী ছাত্র সত্যজিৎ রায় তাঁর ছবিতে মার্ক্সীয় বীক্ষাকে অনুধাবন করলেন অতি সতর্কতার সঙ্গে, অতি ধীরে।”
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক গণ্ডির মধ্যে দাঁড়িয়ে এইভাবে শরচালনা করে গেছেন সুরঞ্জন। পরিধির প্রতি নিষ্ঠা অবিচল রাখতে পারলে দেখার মতো বটে সেই তীরন্দাজি। না–পারলে চলচ্চিত্র–কেন্দ্রিক তর্কটা শুরু থেকেই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। এদিকে, সাম্যবাদী তত্ত্বের বিকাশ নিয়ে এই বই যতটা মুখর, তার প্রাসঙ্গিকতার সঙ্কট নিয়ে ঠিক ততটাই মৌন। ধরে নিতে হবে বিদগ্ধ এবং সর্বজ্ঞ পাঠকের জন্যেই এ রচনা, কারণ বেশ কিছু উচিত ক্ষেত্রে নাম বা প্রসঙ্গের সঙ্গে পাঠককে বিশদে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দায়ও লেখকের কাছে বাহুল্য মনে হয়েছে।‌‌‌‌ ■

 

চিরকালীন সমকালীন
‌অভীক রায়
‌ক্রিকেট ইয়ারবুক ২০১৭ •‌ 
সম্পাদনা উৎপল গাঙ্গুলি •‌ দীপ •‌ ১০০ টাকা

বিশ্বের সব দেশেই ক্রিকেট ইয়ারবুক দেখা যায়। বাংলায় এরকম একটা বই হবে না কেন?‌ সেই ভাবনা থেকেই ক্রীড়া সাংবাদিক দেবাশিস দত্তর মাথায় এসেছিল বাংলায় ক্রিকেট ইয়ারবুক সৃষ্টির কথা। যেমন কথা তেমনই কাজ। ১৯৯৮–এ শুরু ক্রিকেট ইয়ারবুকের। পারও করে ফেলল ২০ বছর! এবং যত দিন গেছে, ক্রিকেটপ্রেমীদের ভালবাসাও বেড়েছে। বছর শুরু হলেই ক্রিকেটপ্রেমীরা অপেক্ষা করেন ইয়ারবুকের। প্রকাশিত হতে না হতেই হয়ে যায় নিঃশেষিত।
শুরুর দিকের কাজটা কিন্তু সহজ ছিল না। দেশ–বিদেশ থেকে বিভিন্ন লেখকদের লেখা জোগাড় করা, তার অনুবাদ, পাণ্ডুলিপি সংশোধন, সম্পাদনা করা, পাতা তৈরি করা— একটা নয়, হাজারো ঝামেলা জড়িয়ে। সেই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করার  চাপ। কিন্তু পাঠকের ভালবাসার কাছে সেসব তুচ্ছ। অসহ্য চাপ সহ্য করেও তাই প্রতি বছরই নির্দিষ্ট সময়ে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ক্রিকেট ইয়ারবুক। 
সময় পরিবর্তনশীল— এই আপ্তবাক্য মেনেই বইও পরিবর্তিত হয়েছে। এখন পুরো বই রঙিন, দুর্দান্ত আর্ট পেপারে ছাপা। এ বছর ২০ পেরোল। তাই লেখকরাও চেষ্টা করেছেন আরও ভাল লেখা দিয়ে পাঠককে সমৃদ্ধ করার।
২০১৭ বছরটা ছিল নিঃসন্দেহে বিরাট কোহলির। ভারত অধিনায়ককে নিয়ে অশোক দাশগুপ্ত লিখেছেন মর্মস্পর্শী লেখা। কোচ হিসেবে রবি শাস্ত্রীর দ্বিতীয় ইনিংস কেমন যাবে, তা ব্যাখ্যা করেছেন দেবাশিস দত্ত। ভারতের প্রখ্যাত ক্রিকেট–লিখিয়ে গৌতম ভট্টাচার্য, ক্লেটন মুর্জেলো, অনিলাভ চট্টোপাধ্যায়, দেবাশিস সেনরা লিখেছেন। এ ছাড়াও সুনীল গাভাসকার, সৌরভ গাঙ্গুলি, গোপাল বসু, রাজু মুখার্জির মতো দেশীয় প্রাক্তনরা যেমন রয়েছেন, তেমনই জেফ্রি আর্চার, জিওফ্রে বয়কট, এভার্টন উইকস, মাইকেল আথারটনের মতো প্রাক্তন কিংবদন্তিরাও রয়েছেন লেখকসূচিতে। রয়েছে ঝুলন গোস্বামী, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, অর্জুন রণতুঙ্গার সাক্ষাৎকার। অনুরাগীই হোন বা শখে দেখুন, ক্রিকেট ভালবাসলে এই বই আপনার কাছে রাখতেই হবে।‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ■

চেনা যাবে বঙ্কিমকে
সমীরকুমার ঘোষ 
বঙ্কিমী–‌গপ্পো •‌ অভয়চরণ দে •‌
বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ •‌ ১৫০ টাকা

তাঁকে দেখলে রীতিমতো রাশভারী মানুষ মনে হত। মনে হত হাসাহাসি বুঝি তাঁর ধাতে নেই। হওয়াটাই স্বাভাবিক। যেহেতু তিনি পেশায় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কিন্তু আদতে মানুষটি ছিলেন আদ্যন্ত রসিক। ব্যবহারিক জীবনে তাঁকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে নানা কাহিনী। দামোদর মুখোপাধ্যায় থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ, অনেকের সঙ্গেই কথোপকথনে উঠে এসেছে তাঁর স্বাভাবিক কৌতুকবোধ। ট্রেনে তাঁর সুন্দরী স্ত্রীর দিকে বারবার তাকানো যুবককে কৌতুকরসে নাকাল করার সুযোগও ছাড়েননি। বঙ্কিমের জীবনের এমন নানা কাহিনী একত্র করেছেন অভয়চরণ দে।
প্রথম জীবনে বঙ্কিমের জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর অগাধ আস্থা ছিল। ঠিকুজি, কোষ্ঠী বিচার সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল, অগাধ আস্থাও ছিল। কিন্তু পাত্র–‌পাত্রীর কোষ্ঠী বিচার করে মেয়ের দিয়ে দেওয়ার পরও ছোট মেয়ে উৎপলকুমারীর মৃত্যু হওয়ার পর তাঁর আস্থা চলে গিয়েছিল। ভ্রাতুষ্পুত্রকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‌জ্যোতিষ শাস্ত্রের উপর কিছুমাত্র বিশ্বাস করিবে না। আমি উহার অনেক পরীক্ষা করিয়া দেখিয়া এক্ষণে উহাতে বিশ্বাস পরিত্যাগ করেছি।’ এমনিতে মানুষটি ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির। ষাঁড়, গরু ইত্যাদি দেখলে দূরে সরে যেতেন। মই দিয়ে ছাদে উঠতে পারতেন না, রথের মেলায় বীভৎস মুখোশ দেখেও ভয় পেতেন। আপাতভাবে অনেকে তাঁকে অহঙ্কারী বলে মনে করতেন। কিন্তু সেটা ছিল তাঁর অবাঞ্ছিত লোকেদের অত্যাচারের হাত থেকে আত্মরক্ষার উপায়। না হলে তিনি ছিলেন বন্ধুবৎসল, আড্ডাবাজ এবং পরোপকারীও। অভয়বাবুর বহু শ্রমে যে তথ্যের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, তা পড়তে একটুও ক্লান্তি লাগে না। ■

এক বিরল রসভাণ্ড
তাপস গঙ্গোপাধ্যায়
বিরল প্রতিভা বিদ্যাসাগর • বিজনকুমার ঘোষ • তথাগত • ২৫০ টাকা

বিদ্যাসাগর যে শুধু বিরল নন, বিরলতম প্রতিভাধরদের অন্যতম, সে–কথা যেখানে স্বীকার করেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ও স্যার আশুতোষ, তখন সে–বিষয়ে কথা বলা থেকে বর্তমান আলোচক সম্পূর্ণ বিরত থাকবে, এ–নিশ্চয়তা পাঠক পাবেন। কিন্তু ৮৪ বছর বয়সি লেখক বিজনকুমারের বিরল কৃতিত্ব এই যে, তিনি সাধারণত যেভাবে মহাপুরুষ বা মনীষীদের জীবনী লেখা হয় সেই প্রচলিত পদ্ধতি সম্পূর্ণ বর্জন করে অনেকটা কুইজ কমপিটিশনে যেভাবে প্রশ্নাবলির উত্তর দেওয়া হয় সে ঢং মেনে বইটি লিখেছেন। মোট ৪৫টি প্রশ্নোত্তর অধ্যায়ে বিন্যস্ত এই বই। কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরি:‌ ‌(‌১)‌‌‌ অনন্য বিদ্যাসাগর— বিজনকুমার অনুমান করেছেন চার্চিলের ভাষায়, ভারতের সেই হাফ নেকেড মহাত্মা গান্ধী ধুতি–চাদর–চপ্পলে আসলে বিদ্যাসাগরের অনুসারী ছিলেন। স্যার আশুতোষ নিজে লিখেছেন ‘‌‘‌তিনি যদি ধুতি চাদর ও চটিজুতো পরিহিত হইয়া সর্বসমক্ষে যাতায়াত না করিতেন, তা হইলে আমরা, অন্তত আমি, আজ দেশী পোশাকের প্রতি অনুরক্ত হইতাম কি না সন্দেহ।’‌’‌
‌(‌২)‌‌‌ মেঘনাদ সাহার হেনস্তা— প্রথমত মনে রাখা দরকার, বিদ্যাসাগর প্রয়াত হন ১৮৯১ সালে আর মেঘনাদ সাহার জন্মই হয় ১৮৯৩–তে। কী কারণে বিদ্যাসাগরের ওপর বইতে এলেন মেঘনাদ?‌ উত্তর খুঁজতে হলে পড়তে হবে বইটি। বা, বিদ্যাসাগরের সঙ্গে পতিতাদের কী সম্পর্ক ছিল?‌ তার উত্তর মিলবে (‌৩)‌ পতিতা পল্লীতে অরন্ধন অধ্যায়ে।
সুখ এই বই পাঠে। সব বলে দিলে যেমন থ্রিলারের রস নষ্ট হয় দর্শকদের কাছে, তেমনি এই আশ্চর্য রসের খনির প্রতিটি কোণে আলো ফেলে রসিক পাঠককে বিজনকুমারের বিদ্যাসাগর–সাধনার মূল রসভাণ্ডের স্বাদ থেকে বঞ্চিত করব না। নিজে পড়ুন, অন্যকে পড়ান এই বই।‌‌‌‌‌ ■

জনপ্রিয়

Back To Top