মৃণাল ঘোষ:  ‌আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা • দেবাশিস চন্দ • আদম • ১২৫ টাকা
‌আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা— দেবাশিস চন্দ‌র দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। তাঁর প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছিল ১৯৯১ সালে। দেবাশিস একজন সাংবাদিক, লেখক, সম্পাদক। শিল্পকলা বিষয়ে তাঁর অনুধ্যানও সুপরিচিত। এ সমস্ত নানা কাজের মধ্যেও তাঁর মগ্নতার অনেকটাই কবিতায় সমর্পিত। তাঁর কবিতার মধ্যে সৌন্দর্যের পাশাপাশি সন্তর্পণে কাজ করে এক প্রতিবাদী চেতনা।
‘‌আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা’— এই শিরোনামটির মধ্যেই সুপ্ত আছে এবং পরিস্ফুট হয়েছে তাঁর কবিতার দর্শন;‌ এবং জীবনদর্শনও। প্রাণিমাত্রেরই আশ্রয়ের প্রয়োজন। আশ্রয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের আত্মপরিচয়। এই আশ্রয়ের সঙ্কট শুধু আজ নয়, অনাদি কাল থেকেই মানুষকে তাড়িত করে আসছে। তাকে ক্রমাগত বিপন্ন করছে। ১৯৪৩–‌এর মন্বন্তর, সাতচল্লিশের দেশভাগ, উদ্বাস্তুর মিছিল, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে আদিবাসীদের উৎখাত হওয়া, আজকে রোহিঙ্গাদের সমস্যা, সিরিয়ার সঙ্কট— এসবই তো আমাদের বারবার বুঝিয়ে দেয়, কেমন করে হয়ে ওঠে ‘‌আশ্রয় এক আশ্চর্য ঠাট্টা’!‌ প্রচ্ছদে মোটা রেখায় আঁকা যোগেন চৌধুরীর মানব বা মানবীর বিপন্ন দৃষ্টি সেই সঙ্কটেরই প্রতীক হয়ে ওঠে।
জীবনের এই গভীরতম সমস্যাই হয়ে উঠেছে দেবাশিসের কবিতাগুলির কেন্দ্রীয় ধ্রুবপদ। আশ্রয়ের সঙ্গে কবি সম্পর্ককেও জড়িয়ে নিয়েছেন। বলেছেন, ‘‌সম্পর্কের বাঁধন বলে কিছু হয় না, সবই অলীক’‌, (‌‘‌বাড়ি বদল’‌)‌। সম্পর্ককে বাঁধে যে ধর্ম, তার প্রতি তিনি এই অমোঘ প্রশ্ন রেখেছেন— ‘‌ধর্ম মানে কি শুধু রক্তপাত, মৃত্যুর পাটিগণিত?‌’‌ (‌‘বিপন্ন পর্যটন’‌)‌। কবি লেখেন ‘‌ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানো ভয়ের পথ’‌ পেরিয়ে আসা শিশুটির মতো আশ্রয়হারা কোনও মানুষই জানে না ‘‌তার কী অপরাধ, কেনই বা সে স্বজনহারা।’‌ (‌‘স্বজনহারা’‌)‌। ভাবনার এই সংলগ্নতা বা c‌onsistency‌ তাঁর কবিতাগুলিকে একসূত্রে গেঁেথছে। তাঁর দর্শনকেও উন্মীলিত করেছে।
এরপর কবি প্রবেশ করেছেন সমস্ত দেশের বাস্তবের গভীরে। বলেছেন— ‘‌সর্বনাশের অন্ধ খেলায় মেতেছে নির্বাক স্বদেশ’‌। (‌‘‌হাওয়া–‌১’‌)‌। এঁকেছেন ভারতবর্ষের ছবি— ‘‌এক পা এগোলে অন্ধকার, এক পা পিছোলে অন্ধকার,/‌লাল, নীল, কালো, সবুজ, গৌরিক উল্লাস/‌ঢাকে আকাশ, কাঁটাঝোপে এঁফোড়–‌ওফোঁড়’‌, (‌‘‌ভারতবর্ষ’‌)‌। এই দর্শনের পাশাপাশি তাঁর বাকপ্রতিমা তৈরির স্বকীয়তাও আকৃষ্ট করে। দু–‌একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। ‘ভরা বর্ষার ডুবন্ত আকাশ, মুষলধারায় দুঃখপাত’‌ (‌‘‌করোটি–‌পাহাড়’‌)‌। অথবা ‘‌নিঃসঙ্গ চশমা, ধূসর কাচে/‌নীল চিঠি, শিকড়ে টান,/‌ভোরের সমুদ্রে পড়ে আছে/‌সিন্দুরচর্চিত ঠাকুরদালান’‌ (‌‌‘‌বিষাদের রং’‌)‌।‌‌‌‌‌‌ বাকপ্রতিমাই কবিতার প্রাণ। সব ক্ষেত্রে না হলেও অনেক কবিতাতেই দেবাশিস বাকপ্রতিমার ভিতর দর্শন বা সত্যের উন্মীলন ঘটাতে পারেন। কবি হিসেবে এখানেই তাঁর সার্থকতা। ■

জনপ্রিয়

Back To Top